শান্তিপুরের বাবলা অদ্বৈত পাট: শ্রী অদ্বৈত আচার্যের লীলাভূমি ও ভ্রমণ গাইড

RAJU BISWAS
0
শান্তিপুরের বাবলা অদ্বৈত পাট: শ্রী অদ্বৈত আচার্যের লীলাভূমি ও ভ্রমণ গাইড
শান্তিপুর অদ্বৈত পাট মন্দিরের নাটমন্দির - lalpecha.in
সামনের নাটমন্দির
📜
🏛️

শান্তিপুর মহিমা: এক ঐতিহাসিক পরিক্রমা

নদীয়া জেলার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

বাংলার ইতিহাসে নদীয়া জেলা মানেই আধ্যাত্মিকতা ও ইতিহাসের এক অনন্য মিলনস্থল। এই জেলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শহর হলো শান্তিপুর। কলকাতা থেকে মাত্র ৫৮ মাইল দূরে, গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি যেমন বৈষ্ণব ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ পীঠস্থান, তেমনি এর শিল্প ও সংস্কৃতি আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

প্রায় ৮০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জনপদ তার নিজস্ব ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। বর্তমান নিবন্ধে আমরা শান্তিপুরের বাবলা গ্রামের ‘অদ্বৈত পাট’-এর প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করব এবং বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম প্রাণপুরুষ শ্রী অদ্বৈত আচার্যের লীলাভূমি সম্পর্কে নিগূঢ় তথ্য জানব।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: নবদ্বীপ ও মায়াপুর পরিদর্শনে আসা পর্যটকদের জন্য একটি বিশেষ এক দিনের ভ্রমণ নির্দেশিকা এই নিবন্ধের শেষ অংশে সংযুক্ত করা হয়েছে।
মাধবেন্দ্রপুরী মন্দির শান্তিপুর নদীয়া
মাধবেন্দ্রপুরী মন্দির

শান্তিপুরের নামরহস্য ও সুপ্রাচীন কালরেখা

শান্তিপুর কত প্রাচীন তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন হলেও, অন্তত আটশ বছর আগে থেকেই এটি একটি সমৃদ্ধ নগরী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই শহরের নাম নিয়ে দুটি জনপ্রিয় জনশ্রুতি রয়েছে:

  • মুনি শান্তর আবাস: প্রাচীনকালে 'শান্ত' নামক এক জনৈক মুনির বাসস্থান ছিল এখানে, যা থেকে 'শান্তপুর' বা 'শান্তিপুর' নামের উৎপত্তি।
  • শান্তিপ্রিয় মানুষের মিলনস্থল: গঙ্গার তীরে অবস্থিত হওয়ার কারণে মানুষ তাদের বৃদ্ধ পিতামাতাকে এখানে নিয়ে আসতেন। যারা রোগমুক্ত হয়ে ফিরে যেতেন না, তারা এখানেই শান্তিতে জীবনযাপন করতেন, যা থেকে শহরের নাম শান্তিপুর হয়।

একসময় গঙ্গা নদী এই শহরের তিন দিক দিয়ে প্রবাহিত হতো, যা বর্তমানে শহর থেকে দূরে পশ্চিম দিকে সরে গিয়েছে।

শ্রী অদ্বৈত মন্দির শান্তিপুর নদীয়া
আম্রকুঞ্জ থেকে মন্দিরে প্রবেশপথ।

শ্রী অদ্বৈত আচার্য: বৈষ্ণব ধর্মের আলোকবর্তিকা

শান্তিপুরের আধ্যাত্মিক প্রাণপুরুষ হলেন শ্রী অদ্বৈত আচার্য। ১৪৩৪ খ্রিস্টাব্দে শ্রীহট্টের (সিলেট) লাউড় পরগণার নবগ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা কুবের আচার্য ছিলেন রাজার সভাপণ্ডিত এবং মাতা লাভা দেবী।

  • শিক্ষা ও উপাধি: মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি শান্তিপুরে শাস্ত্র অধ্যয়ন করতে আসেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল কমলাক্ষ বা কমলাক্ষ ভট্টাচার্য। শান্তিপুরের পূর্ণবাটী গ্রামে বসবাসকারী পণ্ডিত শাস্তবেদান্তবাগীশের কাছে বেদচতুষ্টয় অধ্যয়ন করে তিনি 'অদ্বৈত আচার্য' ও 'বেদ পঞ্চানন' উপাধিতে ভূষিত হন।
  • আশ্রম স্থাপন: শিক্ষা সম্পূর্ণ করার পর অদ্বৈত আচার্য শান্তিপুরের দক্ষিণ দিকে গঙ্গার তীরে “উপকারিকা” নামে কুটিরে স্থায়ীভাবে আশ্রীয় নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সুরধুনি বা গঙ্গা নদীর তীরে বাবলার আম্রকুঞ্জে দীক্ষাদানের উদ্দেশ্যে তিনি আর একটি কুটির নির্মাণ করেন। এই স্থানটিই আজ অদ্বৈত-পাট নামে সুপরিচিত।
শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু ছবি শান্তিপুর
চৈতন্য মহাপ্রভু

চৈতন্য অবতারের কারণ

বৈষ্ণব গ্রন্থ অনুসারে, অদ্বৈত আচার্যের কঠোর তপস্যা এবং ভক্তির আবেশে তুষ্ট হয়েই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নবদ্বীপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। শ্রীচৈতন্য ভাগবতে বলা হয়েছে—

"অদ্বৈতের কারণে চৈতন্য অবতার।
সেই প্রভু কহিয়াছেন বার বার।।"

বৈষ্ণব জগতে শ্রীচৈতন্য ও নিত্যানন্দের পরেই অদ্বৈতাচার্যের স্থান নির্দিষ্ট। অদ্বৈতের বয়স যখন ৫২ বৎসর সেই সময়ে চৈতন্যদেবের জন্ম হয়। শ্রীচৈতন্যদেব বহুবার শান্তিপুরে অদ্বৈতাচার্যের আশ্রয়ে পদার্পণ করিয়াছিলেন।

শ্রী বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী বিগ্রহ শান্তিপুর
শান্তিপুরে অবস্থিত শ্রী বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর বিগ্রহ

তিনি ১২৫ বছর জীবিত ছিলেন এবং শান্তিপুরেই তাঁর দেহত্যাগ ঘটে। তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র অচ্যুতানন্দ আজন্ম সংসার বিরাগী ছিলেন। অদ্বৈতের বংশধরগণ এখনও শান্তিপুরে বাস করিতেছেন। সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ "অদ্বৈত প্রকাশ" প্রণেতা ঈশান নাগর ৫ বৎসর বয়স হইতে অদ্বৈত আচার্যের নিকট শান্তিপুরে মানুষ হন।

শান্তিপুর বাবলার ঐতিহাসিক দৃশ্য

বাবলার অদ্বৈত পাট: ঐতিহাসিক গুরুত্ব

শান্তিপুরের অদূরে বাবলা গ্রামে অবস্থিত অদ্বৈত আচার্যের এই ‘শ্রীপাট’ বৈষ্ণবদের কাছে পরম পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত। কথিত আছে, এখানেই শ্রীঅদ্বৈত আচার্য কঠোর তপস্যা ও ভগবানের আরাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। জনশ্রুতি অনুসারে এই পবিত্র স্থানেই শচীমাতা অলৌকিকভাবে গৌরাঙ্গসুন্দরকে গর্ভে ধারণ করেন।

চৈতন্য নিত্যানন্দ ও অদ্বৈত আচার্য মিলনস্থল
তিন প্রভুর বিশ্রাম স্থান
  • মহামিলন: বাবলা শ্রীপাটে গৌরাঙ্গ, নিত্যানন্দ এবং অদ্বৈতাচার্যের মহামিলন ঘটে। গৌরাঙ্গ এখানে 'বিদ্যাসাগর' উপাধি লাভ করেন।
  • বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী: আধুনিক যুগের মহাপুরুষ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী শান্তিপুরের এই অদ্বৈত বংশেই জন্মগ্রহণ করেন।
  • বার্ষিক উৎসব: গৌর পূর্ণিমা ও শ্রী অদ্বৈত আচার্যের তিরোভাব তিথি উপলক্ষে এখানে বিরাট উৎসব হয়।
জাতীয় সড়ক ১২ শান্তিপুর যাওয়ার রাস্তা
NH 12 (National Highway 12)

🚶‍♂️পর্যটকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

মন্দিরের প্রসঙ্গে দর্শকদের অবগতির জন্য জানানো হচ্ছে—শিশুদের মুখে অন্নপ্রসাদ দিতে চাইলে অন্তত দুই দিন আগে যোগাযোগ করতে হবে, না হলে প্রসাদ দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। মন্দিরের ভেতরে কেউ দান করতে চাইলে শ্রী শ্রী অদ্বৈত পাঠের বিল বক্সে অথবা মন্দির প্রাঙ্গণের দান বাক্সে দান করবেন; কারও হাতে সরাসরি দান করবেন না। মন্দির সংক্রান্ত যেকোনো প্রয়োজনে বর্তমান সেবাইত ও অদ্বৈত প্রভুর বংশধর শ্রী প্রণাথ গোস্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। যোগাযোগ নম্বর: ৯২৩২৭৭৫০৫০।

একই দিনে আপনি মায়াপুর ও বাবলা—এই দুই পবিত্র স্থানই ভ্রমণ করতে পারেন। যদি আপনি রানাঘাট দিক থেকে গাড়িতে আসেন, তবে জাতীয় সড়ক (NH 12) ধরে মায়াপুর বা নবদ্বীপ যাওয়ার পথে রাস্তার পাশেই পড়বে এই বাবলা গ্রাম। আমবাগানে ঘেরা, শান্ত পরিবেশে অবস্থিত এই তীর্থস্থানটি একেবারেই পারিবারিক ও নিরিবিলি। দর্শনার্থীদের জন্য প্রতিদিন সকাল ৫:০০টা থেকে দুপুর ১২:৩০টা এবং বিকেল ৩:০০টা থেকে সন্ধ্যা ৭:০০টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে বিশেষ তিথি, উৎসব বা পরিস্থিতি অনুযায়ী এই সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে।

শিয়ালদহ থেকে শান্তিপুর লোকাল ট্রেনে এলে, আপনাকে শান্তিপুর বা ফুলিয়া স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে লোকাল প্যাসেঞ্জার অটো, টোটো বা রিকশায় সহজেই বাবলায় পৌঁছানো যায়।

শান্তিপুর ভ্রমণের সেরা সময় হলো রাস উৎসবের সময় (নভেম্বর মাস)। তবে বছরের যেকোনো সময়েই আপনি অদ্বৈত পাট বা বাবলার এই শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশ উপভোগ করতে এখানে আসতে পারেন।

ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন
Abhikaron
WWW.LALPECHA.IN Verified Profile

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to ensure you get the best experience on our website. Learn More
Ok, Go it!