গোমিরা নাচের মুখোশ: ঐতিহ্য, উপাসনা এবং লোকসংস্কৃতির গল্প।

Raju
0
বাংলার গমিরা নৃত্য - Gomira Dance of Bengal

Gomira Dance: The Ancient Folk Dance of Bengal

গমিরা নৃত্য: বাংলার প্রাচীন লোকসংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন

পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম আকর্ষণ হলো মুখোশ নৃত্য। এটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং গ্রামীণ জীবনের রীতি, আচার এবং ধর্মীয় ভাবনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নানা ধরনের মুখোশ নৃত্য প্রচলিত রয়েছে। এগুলি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ইতিহাস এবং বিশ্বাসের প্রতিফলন।

বিশ্বব্যাপী মুখোশ নাচের প্রচলন আছে বিভিন্ন জায়গায়। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা এবং ধ্রুপদী হেলেনিক ও রোমান সভ্যতায় মুখোশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি বর্তমানে চীন, জাপান, ভারত এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে মুখোশ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। দেশজুড়ে বিভিন্ন উপজাতি এখনও মুখোশ ব্যবহার করে টোটেম (Totem) হিসেবে এবং মুখোশধারী নাচগুলি আচার হিসেবে পালন করে থাকেন।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মুখোশধারী নৃত্যের ঐতিহ্য

ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে বৈচিত্র্যময় মুখোশ নাচের ঐতিহ্য লক্ষ্য করা যায়। নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেওয়া হলো:

রাজ্য / অঞ্চল মুখোশের ধরন / নৃত্যের নাম
উত্তরাখণ্ড রামমন মুখোশ
লাদাখ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মুখোশ
আসাম মাজুলির সত্রীয় মুখোশ ও ভাওনা মুখোশ
পশ্চিমবঙ্গ ছৌ মুখোশ ও গমিরা মুখোশ

বাংলার এই লোকসংস্কৃতি শুধু একটি নাচ নয়, এটি আমাদের শেকড়ের পরিচয়। পরবর্তী অংশে আমরা আলোচনা করব গমিরা নৃত্যের বিশেষত্ব এবং এর নির্মাণ শৈলী নিয়ে।

পশ্চিমবঙ্গের ছৌ নৃত্য - Chhau Dance of West Bengal

চিত্র: পশ্চিমবঙ্গের ছৌ মুখোশ

পশ্চিমবঙ্গের বৈচিত্র্যময় মুখোশ সংস্কৃতি

পশ্চিমবঙ্গের মুখোশধারী নাচের কথা বললেই প্রথমে 'ছৌ' নাচের নাম মাথায় আসে। তবে ছৌ ছাড়াও এই রাজ্যে আরও বেশ কিছু অত্যন্ত প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ নাচের ঐতিহ্য রয়েছে। এই নাচগুলো এবং তাদের মুখোশগুলো স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • 🎭 বাঁকুড়া জেলায়:   রাবণকাটা মুখোশ
  • 🎭 মালদা জেলায়:   গম্ভীরা মুখোশ
  • 🎭 উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরে:   গোমিরা মুখোশ
  • 🎭 দার্জিলিংয়ে:   বাগপা মুখোশ ইত্যাদি।

গমিরা নৃত্য: দিনাজপুর অঞ্চলের প্রাণস্পন্দন

আজ আমরা আলোচনা করছি গোমিরা নৃত্য নিয়ে। গোমিরা দিনাজপুরের একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য। এই নৃত্যে শিল্পীরা বিভিন্ন দেব-দেবীর মুখোশ পরে নাচ পরিবেশন করেন। মূলত দেবতাকে তুষ্ট করতে এবং গ্রাম থেকে অশুভ শক্তি তাড়ানোর উদ্দেশ্যেই গ্রামবাসীরা এই নৃত্যের আয়োজন করে থাকেন।

গোমিরা রাতের দৃশ্য - Gomira Dance Night Scene

চিত্র: গোমিরা রাতের দৃশ্য

গোমিরা নাচ কি?

গোমিরা আঞ্চলিক ভাষায় ‘মুখা খেল’ নামে পরিচিত। 'গোমিরা' শব্দটি মূলত ‘গ্রাম চণ্ডী’ বা গ্রাম দেবতা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এই নৃত্য মূলত গ্রাম দেবতার উপাসনার জন্য অনুষ্ঠিত হয়। মাঠের ফসল তোলার সময় শিল্পীরা অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে এবং देवताओं আশীর্বাদ ও শুভ শক্তির আহ্বান জানাতে এই আরাধনা করেন।

গোমিরা নৃত্য পরিবেশনা - Gomira Dance Performance

চিত্র: গোমিরা নৃত্য

গবেষক শিশির মজুমদারের মতে, 'গোমিরা' একটি 'বোড়ো' শব্দ। উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর ভৌগোলিক অঞ্চলে রাজবংশী দেশি-পলি সমাজ এই গোমিরা বা মুখা খেলার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। এই নাচের নামকরণ সম্ভবত 'গামার' গাছ থেকে হয়েছে, কারণ এই গাছের কাঠ দিয়েই চমৎকার সব মুখোশ তৈরি করা হয়। লোকমুখে এর উৎপত্তি নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত থাকলেও, এর সঠিক লিখিত ইতিহাস আজও এক গবেষণার বিষয়।

অশুভ শক্তি বিনাশের নাচ - Vanquishing Evil Spirit

চিত্র: অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে

গোমিরার বিশেষ দুটি রূপ

ঐতিহ্যগতভাবে গোমিরা বা মুখা খেল-এর প্রধানত দুটি বিশেষ রূপ লক্ষ্য করা যায়:

১. গোমিরা নৃত্য: গোমিরা একটি ঐতিহ্যবাহী মুখোশধারী নৃত্য, যা মূলত দেবতা উপাসনা এবং সাংসারিক মঙ্গল কামনার উদ্দেশ্যে পরিবেশিত হয়। এই নাচের মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতীকী যুদ্ধ দেখানো হয় এবং দেবতাদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয়।

গোমিরা রাতের দৃশ্য - Gomira Dance Tradition

চিত্র: গোমিরা রাতের দৃশ্য

২. রাম-বনবাস রূপ: রাম-বনবাস গোমিরা নৃত্যের একটি বিশেষ রূপ, যা রামায়ণের বাণ কাণ্ডকে চিত্রিত করে। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, ঈশ্বর মনুষ্য রূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, যাতে তিনি মানুষের মঙ্গল সাধন করতে পারেন এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে তাঁদের সহায়তা করতে পারেন।

রাম-বনবাস গোমিরা নৃত্য - Ram Banabas Gomira

চিত্র: গোমিরা শিল্পীদের বিশেষ পোশাক

👥 গোমিরা শিল্পীরা কোথায় থাকেন?

গোমিরা নর্তকীদের প্রধানত পশ্চিমবঙ্গের দুটি জেলায় দেখা যায় - উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর

  • 📍 উত্তর দিনাজপুরে: শিল্পীরা কালিয়াগঞ্জ ব্লকের চন্দোল, কৃষ্ণবাটি এবং ভেলাইতে, সেইসাথে ইটাহার ব্লকের থিলবিল এবং গোয়ালগাঁওয়ে কেন্দ্রীভূত।
বিশ্রামরত গোমিরা শিল্পী - Gomira Artists Resting

চিত্র: গোমিরা শিল্পীরা বিশ্রাম করছে একটি দোকানে

📍 দক্ষিণ দিনাজপুরে: কুশমন্ডি ব্লকের অধীন মহিষবাথান এবং খাগড়াইলের পাশাপাশি হরিরামপুর ব্লকের চাকলা, যমুনা এবং বরোগ্রামেও গোমিরা পরিবেশনকারীদের দেখতে পাবেন।

গোমিরা শিল্পীদের পরিবহন - Gomira Artists Travel

চিত্র: গোমিরা নৃত্য শিল্পীদের পরিবহন

কখন গোমিরা নৃত্য পরিবেশিত হয়?

'গোমিরা' নৃত্যের জন্য কোনো পূর্ব-নির্ধারিত দিনপঞ্জি উল্লেখ নেই। মাঠের ফসল কাটার মরসুমে 'অশুভ শক্তি' তাড়াতে ও সাংসারিক মঙ্গল কামনায় গ্রামাঞ্চলে গোমিরা আয়োজন করা হয়। সাধারণত, এটি 'চৈত্র সংক্রান্তি' বা চৈত্র মাসের শেষ দিকে শুরু হয়। তবে বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য এবং আষাঢ় মাস জুড়ে বিভিন্ন মেলা ও উৎসবের মধ্যে নৃত্যশিল্পীরা এটি পরিবেশন করেন।

গোমিরা নাচ উৎসব - Gomira Dance Festival

চিত্র: গোমিরা নাচ

এই নাচের প্রধান দুটি চরিত্র হলো 'বুড়া-বুড়ি', যাদের মূলত শিব ও পার্বতীর রূপ হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশেষ করে কুশমণ্ডির রাজবংশী সম্প্রদায় এই কাঠের মুখোশকে উপাসনার প্রতীক হিসেবে দেখে। গ্রামবাসীরা তাদের মনোবাসনা পূরণের জন্য গ্রাম দেবতার কাছে প্রার্থনা করে এবং একটি গোমিরা মুখোশ উৎসর্গ করার মানসিক বা মানত করেন।

গোমিরা মুখোশ উপাসনা - Gomira Mask Worship

চিত্র: গোমিরা মুখোশ উপাসনা

গোমিরা নাচের মুখোশ তৈরি: একটি শৈল্পিক যাত্রা

গোমিরা নাচের প্রধান আকর্ষণ হলো এর অনন্য কাঠের মুখোশ। এই মুখোশগুলি সাধারণত একটি একক কাঠের খণ্ড থেকে খোদাই করে তৈরি করা হয়। একটি বড় ও মোটা কাঠের খণ্ডে হাতুড়ি এবং বাটালি ব্যবহার করে নিপুণভাবে কাঙ্ক্ষিত দেব-দেবীর রূপ দেওয়া হয়।

  • 🪓 ব্যবহৃত কাঠ: ঐতিহ্যগতভাবে গামারি, নিম বা স্থানীয় কাঠ ব্যবহৃত হয়। তবে স্থায়িত্ব ও খোদাইয়ের সুবিধার জন্য 'গামার' কাঠই সবচেয়ে জনপ্রিয়।
  • ⚖️ ওজন: এই কাঠের মুখোশগুলির ওজন সাধারণত ২ থেকে ৩ কিলোগ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে।
  • 🎨 বিকল্প মাধ্যম: বর্তমানে কাঠের পাশাপাশি অনেক সময় কাগজ এবং 'শোলা' দিয়েও হালকা ওজনের গোমিরা মুখোশ তৈরি করা হয়।
গোমিরা মুখোশ তৈরির পদ্ধতি - Mask Making Process

চিত্র: শিল্পীরা নিজেই মুখোশ তৈরি করেন

মহিষবাথান সমবায় সমিতি ও বিশ্বায়ন

দক্ষিণ দিনাজপুরের মহিষবাথান গ্রামীণ হস্তশিল্প সমবায় সমিতি এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শুরুতে মাত্র ২৭ জন শিল্পী নিয়ে শুরু হলেও, বর্তমানে এখানে ৫০০-এর বেশি শিল্পী কাজ করছেন। তাঁদের নিপুণ হাতের কাজ করা মুখোশ আজ দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও খ্যাতি অর্জন করেছে। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারিভাবে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

গোমিরা মুখোশ খোদাই - Gomira Mask Carving

চিত্র: কারিগর নিজেই মুখোশ তৈরি করছেন

মুখোশের বৈচিত্র্য ও পৌরাণিক পটভূমি

গোমিরা নাচের প্রতিটি মুখোশ কোনো না কোনো পৌরাণিক চরিত্রকে উপস্থাপন করে। উল্লেখযোগ্য কিছু মুখোশ হলো:

🎭 'বুড়া' এবং 'বুড়ি' মুখোশ

গোমিরা নৃত্যে 'বুড়া' এবং 'বুড়ি' হলো কেন্দ্রীয় চরিত্র। এই জোড়া মুখোশ মূলত ভগবান শিব এবং দেবী পার্বতীর মানব রূপের প্রতিনিধিত্ব করে। গোমিরা নৃত্য শুরু হয় এই দুই চরিত্রের মঞ্চে প্রবেশের মাধ্যমে। তাঁরা একে অপরের হাত ধরে অত্যন্ত ধীরগতিতে হাস্যকর ভঙ্গিতে নাচ করেন। বাংলার 'মঙ্গল' সাহিত্যে শিবের যে সহজ-সরল রূপ দেখা যায়, এই নৃত্যটি যেন তারই প্রতিফলন।

বুড়া-বুড়ি মুখোশ - Bura Buri Mask

চিত্র: বুড়া ও বুড়ি চরিত্র

🐯 বাগ (বাঘ) মুখোশ

'বাগ' বা বাঘ চরিত্রটি দর্শকদের বিনোদনের জন্য 'বুড়া-বুড়ি'-এর পর মঞ্চে উপস্থিত হয়। নর্তকী একটি বাঘের মুখোশ এবং কালো-হলুদ ডোরাকাটা পোশাক পরে বিভিন্ন কায়দায় অ্যাক্রোবেটিক চাল প্রদর্শন করেন। এই চরিত্রটি মঞ্চে সজীবতা ও উত্তেজনা তৈরি করে এবং দর্শকদের জন্য এক অনন্য রোমাঞ্চ যোগ করে।

চিত্র: বাগ বা বাঘ মুখোশ

🔥 শ্মশান কালী বা মাসান কালী

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, শ্মশান কালী বা মাসান কালী হলেন দেবী কালীর এক বিশেষ রূপ। তিনি চন্দ এবং মুন্ডা নামক দুই ভয়ঙ্কর অসুরকে বধ করেছিলেন। গোমিরা নৃত্যে শ্মশান কালী বা চামুন্ডা কালী একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।

🎭 চরিত্র ও পোশাকের বৈশিষ্ট্য:

  • মুখোশ: শ্মশান কালী বা চামুন্ডা কালীর মুখোশ সাধারণত অন্য মুখোশগুলোর তুলনায় আকারে বেশ বড় এবং বিস্তৃত হয়, যা দেবীর উগ্র রূপ ফুটিয়ে তোলে।
  • নৃত্যশিল্পী: সাধারণত ২ থেকে ৪ জন নর্তকী একই সাথে মঞ্চে শ্মশান কালী বা চামুন্ডা কালী চরিত্রে পারফর্ম করেন।
  • পোশাক: তাঁরা মুখোশের সাথে উজ্জ্বল ও রঙিন 'ঘাগরা' বা ঐতিহ্যবাহী স্কার্ট পরিধান করেন।

🥁 নৃত্যের শৈলী:

মঞ্চে শ্মশান কালীর প্রবেশের সাথে সাথেই এক গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সংগীতের গতি বাড়ার সাথে সাথে নৃত্যশিল্পীরা বিশেষভাবে কোমর বাঁকিয়ে এবং মাটিতে সজোরে পদঘাত করে এক উন্মাতাল নৃত্য পরিবেশন করেন। ঢাকের দ্রুত তালের সাথে তাঁদের এই শৈলী দর্শকদের শিহরিত করে তোলে।

শ্মশান কালী মুখোশ - Shmashan Kali Mask

শ্মশান কালী বা মাসান কালী মুখোশ পরিহিত নৃত্যশিল্পীদের দৃশ্য

শ্মশান কালীর সঙ্গী ও অন্যান্য চরিত্র

🌑 ডাকিনী:

ডাকিনীকে শ্মশান কালীর প্রধান সঙ্গী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২-৪ জন নর্তকী শরীর কালো রঙ করে এবং শাড়ি দিয়ে তৈরি 'ঘাগরা' পরে এই চরিত্রে অভিনয় করেন। তাঁরা চামুন্ডা কালীকে নৃত্যে সঙ্গ দিয়ে পরিবেশকে আরও রহস্যময় করে তোলেন।

ডাকিনী মুখোশ - Dakini Mask

শ্মশান কালীর সঙ্গী ডাকিনী মুখোশ

🌀 যোগিনী:

যোগিনীও দেবী কালীর অন্য এক নারী সঙ্গী। ডাকিনীর তুলনায় যোগিনীর মুখোশ আকারে কিছুটা বড় ও বিস্তৃত হয়। ২-৩ জন শিল্পী এই চরিত্রে অভিনয় করেন এবং মূল নৃত্যের প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করে তোলেন।

যোগিনী মুখোশ - Jogini Mask

শ্মশান কালীর সঙ্গী যোগিনী মুখোশ

👹 নর রাক্ষস ও নৃসিংহ অবতার

নর রাক্ষস হলো গোমিরা নৃত্যের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর চরিত্র, যা একজন শিল্পী এককভাবে পরিবেশন করেন। অন্যদিকে নৃসিংহ অবতারটি ভগবান বিষ্ণুর দশটি অবতারের একটি। এই দুই চরিত্রের অভিনয়ের সময় শিল্পীরা এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েন যে তাঁরা প্রায়ই 'আবিষ্ট' (Possessed) হয়ে পড়েন।

নর রাক্ষস মুখোশ নৃসিংহ মুখোশ

ধর্মীয় প্রথা ও আচারের গুরুত্ব

গোমিরা নাচের আগে 'ঘট স্থাপন' একটি অত্যন্ত পবিত্র প্রথা। 'দেবংশী' নামক পুরোহিতরা মন্ত্রোচ্চারণ এবং পবিত্র জল-বেলপাতা ছিটিয়ে মুখোশগুলোর পূজা করেন। মজার বিষয় হলো, এই নাচে কোনো গান ব্যবহার করা হয় না। শুধুমাত্র ঢাক, ঢোল, বাঁশি, কাশি, করতাল ও সনাইয়ের মূর্ছনায় নৃত্যশিল্পীরা পারফর্ম করেন।

গোমিরা নাচের বাদ্যযন্ত্র সনাই

সনাই ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার

⚠️ বিশেষ নিয়মাবলী:

গোমিরা নাচ শুধুমাত্র পুরুষ শিল্পীদের দ্বারা অভিনীত হয়। নারী চরিত্রেও পুরুষরাই অভিনয় করেন এবং নাচের সময় মঞ্চে নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। শিল্পীরা নাচের আগে ও পরে নিরামিষ আহার করেন এবং নাচের পর বিশেষ 'ভাপানো আতপ ভাত' গ্রহণ করেন।

🌍 গ্লোবাল রিকগনিশন

গোমিরা মুখোশ-এর GI ট্যাগ প্রাপ্তি

বাংলার লোকশিল্পের সীমানা ছাড়িয়ে আজ বিশ্বজয়ের এক গৌরবোজ্জ্বল কাহিনী

বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে দক্ষিণ দিনাজপুরের কুশমন্ডি আজ এক অনন্য নাম। এখানকার মহিষবাথান গ্রামটি স্থানীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে 'মুখোশ গ্রাম' হিসেবে। Generations ধরে চলে আসা এই শিল্পধারা কেবল শৈল্পিক নিপুণতা নয়, বরং মাটির এক গভীর আবেগের প্রতিফলন।

📜 GI স্বীকৃতি: কারুকার্যের অসামান্য স্বকীয়তার জন্য ২০১৮ সালে কুশমন্ডির কাঠের মুখোশকে আন্তর্জাতিক 'Geographical Indication' (GI) ট্যাগ প্রদান করা হয়।

বর্তমানে কুশমন্ডিতে একটি অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও বিপণন হাব গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয় শিল্পীদের বিশ্বাস, গামারি কাঠের এই মুখোশগুলো নিছক কোনো কাষ্ঠখণ্ড নয়; এগুলো ধারণ করার সাথে সাথেই দেবী শক্তির স্পর্শে জীবন্ত হয়ে ওঠে। ✨

Kushmandi Gomira Mask Village

বংশপরম্পরায় মুখোশ তৈরির নিপুণ কারুকার্য - মহিষবাথান গ্রাম

📝 গোমিরা নৃত্যশিল্পীরা সাধারণত অত্যন্ত সাধারণ ও দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসেন। তাঁদের অধিকাংশের জীবন জীবিকা মূলত কৃষি কাজ বা ক্ষেতমজুরির ওপর নির্ভরশীল। তবে আশার কথা এই যে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের 'লোকপ্রসার প্রকল্পে'র অধীনে বর্তমানে অনেক শিল্পী নিয়মিত সরকারি ভাতা পাচ্ছেন।

আমি ২০১৪ সালে প্রথম এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে পরিচিত হই। এবার আবার যাওয়ার ইচ্ছা আছে—সুযোগ এলে অবশ্যই এই অঞ্চলে যাব এবং একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি তৈরি করব। লোক-সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে ডকুমেন্টেশন করা এবং সেগুলোকে ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করতে আমার খুব ভালো লাগে। আজ এই ব্লগের মাধ্যমে আমার সেই সুপ্ত ইচ্ছাই প্রকাশ করলাম।আমি যখন গিয়েছিলাম, তখনও কুশমণ্ডির কাঠের গোমিরা মুখোশ GI স্বীকৃতি পায়নি (GI- ২০১৮)।

নাচের দৃশ্য - Dance Scene বাচ্চাদের হাতের কাজ - Child Craft

📍 গোমিরা নাচ দেখতে যাওয়ার উপায়

উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর, কুশমন্ডি বা কালিয়াগঞ্জে এই নাচ উপভোগ করতে আপনি নিচের রুটগুলো ব্যবহার করতে পারেন:

🚆 ট্রেন পথ (গঙ্গারামপুর):

  • হাওড়া-বালুরঘাট এক্সপ্রেস: সকাল
  • তেভাগা এক্সপ্রেস: দুপুর
  • গৌর এক্সপ্রেস লিঙ্ক: রাত

🚌 বাস ও অন্যান্য:

কালিয়াগঞ্জ: রাধিকাপুর এক্সপ্রেস (কলকাতা স্টেশন থেকে সন্ধ্যা)।

বাস: কলকাতা থেকে বালুরঘাট/রায়গঞ্জের উদ্দেশ্যে NBSTC ও ভলভো বাস সার্ভিস।

ঐতিহ্যের শিকড়ে ফেরা: এক অমোঘ টান

গোমিরা কেবল একটি নৃত্য নয়, এটি আমাদের মাটির আদিম সুর। ২০১৪ সালের সেই সন্ধ্যায় ঢাকের আওয়াজ আর মুখোশের আড়ালে মানুষের 'দেবত্বে' রূপান্তর হওয়ার দৃশ্য আজও আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ডিজিটাল এই যুগে কয়েকশ বছরের এই ঐতিহ্যকে আগলে রাখা শিল্পীদের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।

"শিল্প বেঁচে থাকে শিল্পীর অটল বিশ্বাসে। আমার আগামীর ডকুমেন্টারি তৈরির সংকল্প মূলত এই বিলুপ্তপ্রায় প্রাণশক্তিকে আগলে রাখারই এক ক্ষুদ্র চেষ্টা।"

আপনার এলাকায় এমন কোনো হারিয়ে যাওয়া লোকসংস্কৃতি আছে যা নিয়ে আমি আগামীতে লিখতে পারি? নিচে কমেন্টে জানান।

বাংলার এই অমূল্য সম্পদ আপনার কেমন লাগে?

আপনার মতামত নিচের কমেন্ট বক্সে অবশ্যই শেয়ার করবেন।

© ২০২৬ | লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ উদ্যোগ

📖 তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা:

  • ১. "বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি" - প্রণব কুমার চক্রবর্তী।
  • ২. Intangible Cultural Heritage of West Bengal - Govt. of WB।
  • ৩. স্থানীয় শিল্পীদের সাথে আলাপচারিতা ও ব্যক্তিগত ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।

*বিশেষ দ্রষ্টব্য: কিছু ছবি ও তথ্য সংগ্রহে বন্ধুদের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to ensure you get the best experience on our website. Learn More
Ok, Go it!