ভেল ভেল উৎসব: ব্যান্ডেলের বিরল তামিল শীতলা পূজা vel vel festival bandel 2025

লালপেঁচা (LalPecha.in)
1
ব্যান্ডেলের ঐতিহ্যবাহী ভেল ভেল উৎসব ২০২৫
ভেল ভেল! বীর ভেল! – ব্যান্ডেলের ঐতিহ্যবাহী উৎসব

হুগলি জেলার ব্যান্ডেলে প্রতি বছর আয়োজিত হয় এক বিশেষ তামিল সম্প্রদায়ের উৎসব – ‘ভেল ভেল উৎসব’, যা একটি দুর্লভ দৃষ্টান্ত শীতলা পূজা উৎসব। যা প্রতি বছর চৈত্র মাসে পালিত হয়, যেখানে তামিল অনুসারীরা কার্তিকের উদ্দেশে "ভেল ভেল" (Vetrivel, Veeravel) ধ্বনি তুলে শরীরের জিভ, গাল বা পিঠে সূচ ফুঁটিয়ে এবং আগুন নিয়ে হাঁটার মতো কঠিন ব্রত পালন করে নিজেদের ভক্তি ও শৃঙ্খলার পরিচয় দেন। এটি মূলত ভগবান মুরুগানের (কার্তিক) পূজা, যা দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলঙ্কায় প্রচলিত হলেও পশ্চিমবঙ্গে ব্যান্ডেলের তামিল জনবসতিতেই দেখা যায়। এই অনন্য ধর্মীয় আয়োজন উপভোগ করতে ভুলবেন না! এটি আপনার জন্য এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা হতে পারে। এটি হুগলি জেলার ব্যান্ডেল শহরের অন্যতম আকর্ষণীয় ধর্মীয় উৎসব।

ব্যান্ডেলের ভেল ভেল উৎসবের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা
ভেল ভেল উৎসব ব্যান্ডেল

🗓️ কবে অনুষ্ঠিত হবে?

২০২৫ সালের ৬ই এপ্রিল (রবিবার) ব্যান্ডেলে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব পালিত হবে।

🗺️ কোথায় অনুষ্ঠিত হয়?

ওলাইচণ্ডীতলা মন্দির প্রাঙ্গণ (বালিকাটা) থেকে শোভাযাত্রা
🚶 ব্যান্ডেল স্টেশন রোড হয়ে মন্দির পর্যন্ত শোভাযাত্রা চলে।
👀 ব্যান্ডেল স্টেশন রোডে দাঁড়িয়ে সহজেই এই উৎসব উপভোগ করা যায়।

কোন দেবতার পূজা হয়?

🔱 ভগবান মুরুগান (কার্তিক) এবং শীতলা মা।
📣 নামের উৎস: "ভেট্রিভেল, বীরভেল" (বিজয়ী ভেল, সাহসী ভেল) থেকে "ভেল ভেল" ধ্বনির উদ্ভব

🕒 সময়সূচি:

দুপুর ১২টা থেকে শুরু হয়ে
🌇 বিকাল ৫-৬টা পর্যন্ত শোভাযাত্রা ও পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

শরীরে বর্শা বিঁধিয়ে ভক্তদের কৃচ্ছ্রসাধন ও ভক্তি প্রদর্শন
ভেল ভেল উৎসব ব্যান্ডেল

🗡️ ভেল ভেল উৎসব কী?

ব্যান্ডেলের শ্রী শ্রী ওলাইচণ্ডী মাতা ঠাকুরাণী মন্দিরে প্রতি বছর ‘ভেল ভেল’ উৎসব পালিত হয়। ভক্তরা পবিত্র সুতো বাঁধেন, কোমরে নিমপাতা ও লেবু ধারণ করেন এবং নেতিবাচক শক্তি দূর করার ব্রত পালন করেন।

এরপর ভক্তরা শরীরে ‘ভেল’ (বর্শা) ছিদ্র করেন। কেউ জিহ্বায়, কেউ গালে, কেউ আবার পিঠ বা বুকে ছিদ্র করান। এটি কঠোর ব্রত ও ভক্তির প্রতীক। ভক্তরা সাজানো রথে ফলমূল উৎসর্গ করেন, যা ব্যান্ডেল ও আশপাশের এলাকায় জনপ্রিয়।

মুরুগান বা দেবসেনাপতি কার্তিকের প্রতীকি বর্শা ধারণ
ভেল ভেল উৎসব ব্যান্ডেল

🏹 ভেল ভেল শব্দের অর্থ কী?

‘ভেল’ অর্থ বর্শা। এটি দেবসেনাপতি মুরুগানের (কার্তিকেয়) হাতে দেখা যায়। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, মা পার্বতী মুরুগানকে একটি বর্শা উপহার দেন, যাতে তিনি অসুরদের পরাস্ত করতে পারেন।

🌏 তামিল সংস্কৃতি ও মুরুগান

মুরুগান শুধুমাত্র দক্ষিণ ভারতে নয়, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াতেও তামিলদের কাছে অত্যন্ত পূজিত দেবতা। তিনি যুদ্ধ ও বিজয়ের দেবতা হিসেবে পরিচিত।

📜 পৌরাণিক কাহিনীর সংযোগ

অসুর সূরপদ্মনের সঙ্গে যুদ্ধের সময়, সূরপদ্মন আমগাছে রূপান্তরিত হলে মুরুগান তার ভেল দিয়ে গাছটিকে দ্বিখণ্ডিত করেন। এতে এক অংশ থেকে ময়ূর (মুরুগানের বাহন) ও অপর অংশ থেকে মোরগ (তার পতাকার প্রতীক) জন্ম নেয়।

🕉️ ব্যান্ডেলের বিশেষ আয়োজন

প্রথমে ওলাইচণ্ডী তলার একটি পুকুরে স্নান করে ভক্তদের ওপর প্রেতাত্মা বা দেবতা ইত্যাদির অধিষ্ঠান হয়, যাকে বলা হয় ‘ভর’ সেটিও এখানে হতে দেখা যায়। এরপর তাঁদের নিয়ে আসা হয় ওলাইচণ্ডী মন্দিরে। সেখানে তাদের গালে, জিভ, কপালে, শূল বিদ্ধ করা হয়। বঁড়শি গাঁথা হয় পিঠে, বুকে, বঁড়শির নীচে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন সামগ্রী।

যাত্রাপথে অগণিত মানুষ তাঁদের পায়ে জল দেন। কানের পাশে অবিরাম বলে চলেন, ভেল ভেল। শিশুদের মাটিতে শুইয়ে দেন তাঁদের পদধূলি নেওয়ার জন্য। ভক্তরা নিজেদের শরীরকে বিভিন্ন উপায়ে যন্ত্রণা দিয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে ইষ্ট দেবতাকে তৃপ্ত করার চেষ্টা করেন। এভাবেই চলে ভেল ভেল উৎসব।

এই উৎসবের শোভাযাত্রায় ‘ভেল ভেল’ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়, যা "ভেট্রিভেল! বীরভেল!" (বিজয়ী ভেল! সাহসী ভেল!) শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ।

ব্যান্ডেলের ভেল ভেল উৎসবে ভক্তদের কৃচ্ছ্রসাধনের দৃশ্য
ভেল ভেল উৎসব ব্যান্ডেল

🎭 ভেল ভেল উৎসব ও গাজনের মিল

এই উৎসবের মূল কাঠামো বাংলার গাজন উৎসবের সাথে অনেকটাই মিলে যায়। ভক্তরা কঠোর ব্রত পালন করেন এবং ধর্মীয় শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন।

✨ উপসংহার

আমি ও সুকান্তদা ২০২৫ সালে সকালের ট্রেন ধরে বান্ডেল গিয়েছিলাম। আমাদের অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয়দের মুখ থেকে পাওয়া মূল্যবান কাহিনীসমূহ এই লেখায় তুলে ধরা হলো। তামিল সংস্কৃতির এক দুর্লভ দৃষ্টান্ত এই ব্যান্ডেলের শীতলা পূজা ও ভেল ভেল উৎসব। এই অনন্য ধর্মীয় আয়োজন উপভোগ করতে ভুলবেন না! এটি আপনার জন্য এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা হতে পারে।


📅 তারিখ: ৬ই এপ্রিল ২০২৫ (রবিবার)

📍 স্থান: ওলাইচণ্ডীতলা মন্দির, ব্যান্ডেল
সময়: দুপুর ১২টা - সন্ধ্যা ৬টা

⚔️ এই উৎসব মুরুগান দেবতার প্রতি ভক্তি ও সাহসের প্রতীক। শোভাযাত্রা, ভক্তদের ব্রত, এবং বর্শা ছিদ্রের মতো কঠোর ধর্মীয় আচরণ দেখতে আসুন!

🔗 আরও জানুন: বর্গভীমা মন্দির: তমলুকের ঐতিহাসিক শক্তিপীঠ - Blog Post

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to ensure you get the best experience on our website. Learn More
Ok, Go it!