রানাঘাট নিস্তারিণী মন্দির: দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দিরের আদিরূপ এবং পালচৌধুরী বংশের ইতিহাস
|
| সামনের দিক থেকে মন্দিরটি দেখতে এইরকম। |
রানাঘাট শহরের বড়বাজার এলাকায় অবস্থিত নিস্তারিণী মন্দির সাদামাটা হলেও এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য অপরিসীম। এই মন্দিরটি কলকাতার বিখ্যাত দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির প্রতিষ্ঠার প্রায় ২০ বছর আগে নির্মিত হয়। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দিরটি এই রানাঘাটের নিস্তারিণী মন্দিরের আদলেই তৈরি করা হয়েছিল।
|
| বলির হাড়িকাঠ। |
রানাঘাটের ঐতিহ্য: মন্দিরের অবস্থান ও পরিবেশ
নিস্তারিণী মন্দিরের ডান পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে শান্ত চূর্ণী নদী। বাম পাশে বড়বাজারে যাওয়ার রাস্তা (পি. সি. স্ট্রিট)। মন্দিরটি বিখ্যাত পালচৌধুরী জমিদার বাড়ির কাছে অবস্থিত। এটি একটি উঁচু বেদির ওপর স্থাপিত এবং স্থাপত্যরীতিতে নবরত্ন শৈলীর নিদর্শন। মন্দিরের গর্ভগৃহে মা নিস্তারিণী কালী নিত্য পূজিতা হন এবং একপাশে গৃহদেবতা ও শিবের উপাসনা করা হয়। মন্দিরের দেয়ালে রয়েছে চমৎকার পঙ্খের কাজ এবং প্রধান সিঁড়ির দুই পাশে দুটি সিংহের মূর্তি আভিজাত্যের সাক্ষ্য দেয়। একসময় এখানে পশু বলি হতো, যার চিহ্ন হিসেবে হাড়িকাঠটি এখনও রয়েছে, তবে বর্তমানে বলি প্রথা বন্ধ।
|
| মন্দিরের প্রধান প্রবেশদ্বার। |
যোগাযোগের ঠিকানা:
পি. সি. স্ট্রিট, ২৪, রানাঘাট রোড, রানাঘাট, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ - ৭৪১২০১, ভারত।
ইতিহাসের পটভূমি: চূর্ণী নদী ও দক্ষিণেশ্বর সংযোগ
একসময় এই চূর্ণী নদীই ছিল কলকাতা এবং কৃষ্ণনগরের যোগাযোগের প্রধান জলপথ। যখন রাণী রাসমণি দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণী মন্দির প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছিলেন, তখন মন্দিরের নকশা নিয়ে তিনি খুবই চিন্তিত ছিলেন। ঠিক সেই সময় তাঁর জামাতা মথুর বিশ্বাস নদীপথে কৃষ্ণনগর যাওয়ার সময় এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়েন এবং রানাঘাটের ঘাটে নৌকা ভেড়ান। সেখানেই তাঁর নজরে পড়ে এই অপূর্ব মন্দিরটি।
|
| রানাঘাট স্টেশন থেকে যাওয়ার জন্য গুগল ম্যাপ দেওয়া হল। |
মথুরবাবু মন্দিরটি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে দেখেন এবং রাণী রাসমণিকে এর রূপ বর্ণনা করেন। পরবর্তীকালে কলকাতা থেকে মিস্ত্রি নিয়ে আসা হয় এই মন্দিরটি দেখার জন্য এবং তাদের মাধ্যমেই নিস্তারিণী মন্দিরের আদলে দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
|
| দেওয়ালে পঙ্খের কাজ এবং সিংহ ও কাকাতুয়া জাতীয় ভাস্কর্য। |
নির্মাণের ইতিহাস ও পালচৌধুরী বংশ
রানাঘাটের জমিদার পালচৌধুরী বংশের অন্যতম উত্তরসূরি ছিলেন রতন চন্দ্র পালচৌধুরী। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। তাঁর পরলোকগমনের পর তাঁর স্ত্রী উজ্জ্বলমণি দাসী এই মন্দিরটি নির্মাণ করান। তৎকালীন সময়ে মন্দিরটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিল প্রায় ৭৫ হাজার টাকা এবং এটি পূর্ণ করতে ৯ বছর সময় লেগেছিল।
প্রতিষ্ঠা দিবস: ১৫ই জুন, ১৮৩৫ সাল (সোমবার, ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১২৪২ বঙ্গাব্দ)। মন্দিরের নাম রাখা হয় 'শ্রীশ্রী নিস্তারিণী কালী মাতার মন্দির'।
|
| দেওয়ালে পঙ্খের সূক্ষ্ম কাজ। |
প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের সংক্রান্তির দিন মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস সাড়ম্বরে পালন করা হয়। উজ্জ্বলমণি দাসীর কোনো সন্তান না থাকায় মন্দিরের দেখভালের দায়িত্ব তাঁর ভাসুর ও দেওরের ছেলেদের ওপর অর্পিত হয়। বর্তমানে পালচৌধুরী পরিবারের অলোকেন্দু পালচৌধুরী, অমিতেন্দু পালচৌধুরী এবং অর্ঘেন্দু পালচৌধুরী এই মন্দিরের সেবার দায়িত্ব পালন করছেন।
|
| নিস্তারিণী কালী দেবীর বিগ্রহ। |
অর্ঘেন্দু বাবু জানান, ১৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে মন্দিরটি প্রায় ৫ বছর ধরে সংস্কার করা হয়েছিল। সেই সময় মায়ের মূর্তিতে নতুন করে রং করা হয়। শিল্পীদের কাছ থেকে জানা গেছে, একটি মাত্র বড় পাথর কেটেই কালী এবং শিবের এই মূর্তি তৈরি করা হয়েছে।
|
| গর্ভগৃহে শিবলিঙ্গ। |
যাতায়াতের ব্যবস্থা: কীভাবে পৌঁছাবেন?
কলকাতা থেকে রানাঘাট যাওয়া অত্যন্ত সহজ। আপনি ট্রেন বা সড়কপথ—যেকোনো মাধ্যমেই পৌঁছাতে পারেন।
- ট্রেন পথে: শিয়ালদহ স্টেশন থেকে রানাঘাট, শান্তিপুর, গেদে বা কৃষ্ণনগর লোকাল ট্রেনে রানাঘাট স্টেশনে নামতে হবে (দূরত্ব প্রায় ৭৩ কিমি)। ১, ৫ বা ৬ নম্বর প্ল্যাটফর্মে নামার পর ১০-১৫ মিনিট পায়ে হেঁটে অথবা ৫-৭ মিনিটে টোটো/রিকশায় মন্দিরে যাওয়া যায়।
- সড়ক পথে: ১২ নং জাতীয় সড়ক ধরে রানাঘাট প্রামাণিক মোড়ে নামতে হবে। সেখান থেকে টোটো বা পায়ে হেঁটে মন্দিরে পৌঁছানো সম্ভব।
|
| রানাঘাট স্টেশন যাওয়ার নির্দেশিকার জন্য ক্লিক করুন। |
