বর্তমানে নদিয়া জেলার ছয়টি নদ-নদীর মধ্যে চূর্ণী নদী অন্যতম। এই চূর্ণী নদীর তীরেই অবস্থিত ঐতিহাসিক শহর রাণাঘাট। যদিও রাণাঘাট আদিতে নদিয়া জেলার প্রাচীন গ্রামগুলির মধ্যে পড়ে না, তবু বহু মানুষের কাছে বর্তমানে এই জনপদটি সুপরিচিত। আজ যে রাণাঘাট এক ব্যস্ত শহর, কয়েকশো বছর আগে তা ছিল অখ্যাত এক জনপদ-চারদিকে বিস্তৃত জঙ্গল ও অনাবাদি ভূমি। রাণাঘাটের নামকরণ ও প্রাচীন পরিচয় নিয়ে নানা লোককথা ও জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। একটি বহুল প্রচলিত মত অনুযায়ী, রাণাঘাটের পূর্বে এই পল্লীর নাম ছিল ব্রহ্মডাঙ্গা। আবার আনুলিয়া অঞ্চলের কেউ কেউ বলেন,একসময় এই জঙ্গলময় অঞ্চল পরিচিত ছিল ‘জড়ানে তলা’ নামে। কোন নামটি প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন - তা নির্দিষ্ট করে বলা আজও কঠিন। আরও একটি মত অনুযায়ী, উত্তরে জিয়ানগর, মধ্যভাগে রাণাঘাট এবং দক্ষিণে নাসড়া-এই তিনটি গ্রাম মিলিয়েই বর্তমান রাণাঘাট শহরের গঠন। আশ্চর্যের বিষয়, বহু প্রাচীন পুস্তক কিংবা মানচিত্রে এই স্থানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখিত নয়। তবে ব্রিটিশ মানচিত্রকার জেমস রেনেল–এর ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বাংলার মানচিত্রে অতি ক্ষুদ্র অক্ষরে এই স্থানের নাম দেখা যায়। लोकমুখে আরও একটি কাহিনি প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন, ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কৃষ্ণনগরাধিপতি রাজা রঘুরামের রাজত্বকালে এই অঞ্চলে রানা (রণজিৎ বিশ্বাস)নামে এক কুখ্যাত দস্যুর ঘাঁটি বা আড্ডা ছিল। সেই সূত্র ধরেই নাকি এই অঞ্চলের নাম হয়েছে ‘রাণাঘাট’।এই দস্যু রানা(রণজিৎ বিশ্বাস)ও তাঁর কাহিনি নিয়ে পরবর্তীকালে আলাদা একটি পর্বে আলোচনা করা হবে। আজকের আলোচনার বিষয় অন্য —ছোট ব্যবসায়ী থেকে বুদ্ধির জোরে জমিদারি স্থাপন। একসময় এই জনপদকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রভাবশালী এই জমিদাররা, যাঁদের মধ্যে পাল চৌধুরী বংশ ছিল অন্যতম। রাণাঘাটের পাল চৌধুরী বংশ। আজকের ব্লগে আমরা জানব কীভাবে সামান্য পান ব্যবসায়ী থেকে তাঁরা অধিপতি হয়ে উঠলেন এবং রাণাঘাটের সমাজ ও সংস্কৃতিতে তাঁদের অবদান কী ছিল।
উত্থানের নেপথ্যে: সামান্য 'পান্তি' থেকে 'পাল চৌধুরী'
রাণাঘাটের পাল চৌধুরী বংশের ইতিহাস হার মানায় রূপকথাকেও। এই বংশের আদি পুরুষ মহেশচন্দ্র পাল ১৬৬৯ সালে হুগলী থেকে রাণাঘাটে আসেন। তাঁর উত্তরসূরি সহস্ররাম পালের পুত্ররা—কৃষ্ণপান্তি, শম্ভুপান্তি ও নিধিরাম—গাংনাপুর হাটে পানের ব্যবসা করতেন। পান ব্যবসার কারণেই তাঁদের পদবী 'পাল' থেকে লোকমুখে 'পান্তি' হয়ে যায়।
পরবর্তী কালে ব্রিটিশরা তাকে রাজা উপাধি দিতে চাইলে তিনি তা বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁদের কেনা প্রথম জমিদারি ছিল 'সাঁতোর পরগণা' (সাতর পরগনা)।
মুঘল স্থাপত্য শৈলীতে নহবতখানাগুলি বাদ্যঘর হিসেবে ব্যবহৃত হত। রাণাঘাটে পাল চৌধুরীদের নির্মিত দুটি নহবতখানা ছিল, যার একটির স্থাপত্য নিদর্শন আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জমিদারির বিস্তার ও সমৃদ্ধি
পাল চৌধুরী পরিবার খোদ রাণাঘাট গ্রামটি কিনে নেন এবং সম্ভবত ১৭৮০-এর দশকে আশেপাশে, কৃষ্ণ পান্তি (পাল) প্রায় আড়াই শতাব্দী আগে চূর্ণীর তীরে নির্মাণ করিয়েছিলেন রাজকীয় প্রাসাদোপম অট্টালিকা। বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের মতে, স্কটল্যান্ডের স্থপতিদের সহায়তায় তাঁর উত্তরপুরুষদের জন্য ৩০০টিরও বেশি কক্ষবিশিষ্ট বিশাল ভবন গড়ে তোলেন। বর্তমানে তার জরাজীর্ণ অংশের কিছুটা আছে। তাঁরা শুধু ব্যবসায়ী ছিলেন না, বরং পরম ধার্মিক হিসেবে অসংখ্য দেবালয় ও অতিথিশালা নির্মাণ করেছিলেন।
সমাজসেবা ও শিক্ষা বিস্তারে অবদান
শ্রীগোপাল পাল চৌধুরী রাণাঘাট পৌরসভা প্রতিষ্ঠায় এবং লালগোপাল পাল চৌধুরী ১৯২৬ সালে 'লালগোপাল উচ্চ বিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা নেন। মাদ্রাজের দুর্ভিক্ষের সময় তাঁদের দান আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।
পাল চৌধুরী বংশলতিকা (এক নজরে)
- মহেশচন্দ্র পাল: আদি পুরুষ (১৬৬৯ সালে আগমন)
- শুকদেব পাল: মহেশচন্দ্রের পুত্র
- সহস্ররাম পাল: বংশের প্রধান শাখার প্রতিষ্ঠাতা
- কৃষ্ণপান্তি (কৃষ্ণচন্দ্র): সহস্ররামের জ্যেষ্ঠ পুত্র (১৭৪৯ খ্রিঃ)
- শম্ভুপান্তি: সহস্ররামের দ্বিতীয় পুত্র
- নিধিরাম পান্তি: সহস্ররামের তৃতীয় পুত্র
- পরবর্তী প্রজন্ম: শ্রীগোপাল, নগেন্দ্র, গুণেন্দ্র, ক্ষীরোদচন্দ্র ও অশোক পাল চৌধুরী।
পাল চৌধুরী বংশের বৈপরীত্য: মহত্ত্ব বনাম অবক্ষয়
- মাদ্রাজ দুর্ভিক্ষে লক্ষাধিক টাকার ত্রাণ পাঠানো।
- শিক্ষা ও পৌরসভার উন্নয়নে বিশাল আর্থিক অবদান।
- শিল্প ও ঐতিহ্যের পৃষ্ঠপোষকতা।
- দীর্ঘ শরিকী মামলা যা বংশের সম্পদ ধ্বংস করেছিল।
- নীলচাষীদের ওপর অত্যাচারের কলঙ্কিত ইতিহাস।
- মাত্রাতিরিক্ত বিলাসিতা ও রাজকীয় অপব্যয়।
উপসংহার:
পারিবারিক বিবাদ এবং সময়ের নিয়মে আজ সেই জমিদারি জৌলুস হয়তো হারিয়ে গেছে, কিন্তু রাণাঘাটের অলিতে-গলিতে আজও তাঁদের নাম জড়িয়ে আছে। চূর্ণী নদীর ধারের জীর্ণ অট্টালিকাগুলো আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই এক সময়ের প্রতাপশালী 'পাল চৌধুরী'দের কথা। পাল চৌধুরীদের পাশাপাশি অন্যান্য প্রভাবশালী পরিবার 'দে চৌধুরী' এবং 'মল্লিক বংশের' অবদান রাণাঘাটের ইতিহাসে অনস্বীকার্য। তাঁদের নির্মিত অন্নছত্র ও অতিথিশালাগুলি আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

We welcome thoughtful discussions. Comments are moderated for quality