শিবরাত্রি: শিবের জটায় গঙ্গা ও ত্রিপুরারি মহাদেবের পৌরাণিক গল্প

RAJU BISWAS
0
রাগ-রাগিনীর অভিশাপ ও গঙ্গার জন্ম

রাগ-রাগিনীর অভিশাপ ও গঙ্গার জন্ম

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর সেই পার্বণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন দেবতারা। ক্যালেন্ডারের পাতায় বা ঠাকুরঘরে আমরা যে মহাদেবের ছবি দেখি, সেখানে তাঁর জটা থেকে গঙ্গার ধারা নামতে দেখা যায়। কিন্তু কেন মহাদেব গঙ্গাকে নিজের জটায় ধারণ করলেন? আর কেনই বা তাঁকে 'ত্রিপুরারি' বা 'মহাদেব' বলা হয়? এর পেছনে লুকিয়ে আছে পুরাণের রোমাঞ্চকর সব গল্প।

রাগ-রাগিনীর অভিশাপ ও গঙ্গার জন্ম

গঙ্গার উৎপত্তির গল্পটি শুরু হয় এক অদ্ভুত ঘটনার মাধ্যমে। পুরাণে প্রতিটি রাগ-রাগিনী এক-একটি জীবন্ত চরিত্র। তারা অমরাবতীতে গান-বাজনা করতেন। একবার সব রাগ-রাগিনী জেদ ধরলেন যে তারা আর গান গাইবেন না। কারণ? মহর্ষি নারদের বেসুরো গান! নারদের ভুল সুরে গান গাওয়ার ফলে রাগ-রাগিনীরা বিকলাঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন।

বিষ্ণুর বিগলিত ধারা

তাঁরা শর্ত দিলেন, যদি মহাদেব তাঁর সুললিত কণ্ঠে গান গান, তবেই তাঁরা সুস্থ হবেন এবং অমরাবতীতে ফিরবেন। শিব রাজি হলেন একটি শর্তে— শ্রোতা হিসেবে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুকে থাকতে হবে। মহাদেবের সেই স্বর্গীয় সংগীত শুনে বিষ্ণু এতটাই বিগলিত হলেন যে তাঁর দেহ থেকে জলধারা বইতে শুরু করল। ব্রহ্মা সেই জল তাঁর কমন্ডলুতে ভরে নিলেন। বিষ্ণুর এই বিগলিত অংশ থেকেই কিন্তু গঙ্গার জন্ম।

📜 সগর রাজার বংশ ও কপিল মুনির অভিশাপ

ভগীরথের তপস্যা

ভগীরথের কঠোর তপস্যা

গঙ্গা কীভাবে পৃথিবীতে এলেন, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইক্ষাকুবংশের রাজা সগরের কাহিনী। রাজা শততম অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করলে ইন্দ্র যজ্ঞের ঘোড়াটি কপিল মুনির আশ্রমে লুকিয়ে রাখেন।

🔥 রোষানল: সগর পুত্ররা মুনিকে অপমান করলে তাঁর রোষানলে ৬০ হাজার পুত্র ভস্মীভূত হন।

🌊 মুক্তির পথ: তাঁদের আত্মার মুক্তির জন্য ভগীরথ স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে মর্ত্যে নামিয়ে আনার কঠিন ব্রত গ্রহণ করেন।

শিবের জটায় গঙ্গার বন্দি হওয়া

গঙ্গার প্রচণ্ড বেগ ধারণ করতে একমাত্র মহাদেবই সক্ষম ছিলেন। গঙ্গা যখন সগর্বে আকাশ থেকে নেমে আসছিলেন, শিব তাঁর দম্ভ চূর্ণ করতে জটা খুলে দিলেন। গঙ্গা জটাজালে বন্দি হলেন। পরে ভগীরথের প্রার্থনায় মহাদেব গঙ্গাকে সাতটি ধারায় মুক্ত করেন— হ্লাদিনী, পাবনী, নলিনী, সচক্ষু, সীতা, সিন্ধু ও ভাগীরথী।

শিব কেন 'মহাদেব' ও 'ত্রিপুরারি'?

অসুরদের দমনে দেবতারা তাঁদের তেজের অর্ধেক শিবকে দান করেছিলেন। দেবতাদের সম্মিলিত তেজে তিনি সবার উপরে স্থান পান এবং পরিচিত হন 'মহাদেব' নামে।

— মহাজাগতিক উপাখ্যান —

⚔️ ত্রিপুরারি যুদ্ধের মহাজাগতিক প্রস্তুতি

ত্রিপুরারি যুদ্ধের মহাজাগতিক রথ
স্বয়ং পৃথিবী ছিল এই রথের মূল দেহ

🛠️দেব-স্থপতি বিশ্বকর্মার এক অতিপ্রাকৃত সৃষ্টি

পুরাণ মতে, তিন অসুর ভাইয়ের অজেয় শক্তি ধ্বংস করতে স্বয়ং দেব-স্থপতি বিশ্বকর্মা মহাবিশ্বের পঞ্চভূত ও প্রধান শক্তিগুলোকে একত্রিত করে এই মহা-যুদ্ধরথটি নির্মাণ করেন। এর প্রতিটি অংশ ছিল এক-একজন দেবতার শক্তির বহিঃপ্রকাশ:

🌍

রথের আধার

স্বয়ং পৃথিবী ছিল এই রথের মূল দেহ। দেবী মন্দার পর্বত ও দিক-বিদিক এর অজেয় কাঠামো হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

🛞

মহাজাগতিক চাকা

রথের চাকা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন চন্দ্র ও সূর্য। দিন ও রাতের দুই জ্যোতিষ্ক রথকে অজেয় গতি ও ভারসাম্য দান করেছিল।

🐎

অশ্বরূপী ৪ দিগপাল

রথ টানার জন্য চার প্রধান দেবতা— ইন্দ্র, বরুণ, যম ও কুবের প্রচণ্ড শক্তিশালী ঘোড়ার রূপ ধারণ করেছিলেন।

🏹

কালরুপী ধনুক

বৎসর (সময়) ছিল অতিকায় ধনুক এবং প্রলয়রূপী কালরাত্রি ছিল সেই ধনুকের জ্যা বা গুণ।

🔱

ত্রি-শক্তি বাণ

বাণটি ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। এতে বিষ্ণু ছিলেন মূল শক্তি, অগ্নি ছিল ফলা এবং চন্দ্র ছিল তিরের শেষ অংশ।

🧙‍♂️

পিতা ব্রহ্মা

এই মহাজাগতিক রথ পরিচালনার ভার ছিল স্বয়ং সৃষ্টির দেবতা পিতা ব্রহ্মা-র ওপর।

💡 আপনি কি জানেন?

যুদ্ধের প্রচণ্ড চাপে যখন রথটি বসে যাচ্ছিল, তখন ভগবান বিষ্ণু স্বয়ং বৃষভ/ষাঁড়(🐂) রূপ ধারণ করে নিজের পিঠে রথটিকে ধারণ করেছিলেন। মহাদেবের এই প্রচণ্ড তেজের সামনে কোনো অশুভ শক্তিই টিকতে পারেনি!

এক বাণে তিনটি অসুর নগরী ভস্মীভূত করে মহাদেব বিজয় লাভ করেন। এই অসামান্য সাফল্যের পরই তাঁর নাম হয় ত্রিপুরারি

ত্রিপুরারি যুদ্ধ
শিবের বাণ — অন্যায়ের বিনাশ, সত্যের জয়।

এই পৌরাণিক কাহিনীগুলো আমাদের শেখায় ভক্তি, বিনয় এবং অন্যায়ের বিনাশ কীভাবে সম্ভব। শিবের জটায় গঙ্গা কেবল একটি ছবি নয়, এটি একটি বংশের মুক্তি এবং প্রকৃতির শক্তির এক মিলনস্থল।

আমাদের পক্ষ থেকে আপনাকে ও আপনার পরিবারকে জানাই মহা শিবরাত্রির অনেক অনেক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। এই ব্লগের প্রতিটি কাহিনী এবং ছবি আপনার কেমন লেগেছে তা আমাদের কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। আপনার একটি মতামত আমাদের আগামী দিনের কাজের অনুপ্রেরণা।

শিবের জটায় গঙ্গার মুক্তি এবং ত্রিপুরারি যুদ্ধের এই অলৌকিক কাহিনীগুলো আমাদের লোক-সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ। এই বিষয়ে আরও গভীর তথ্য ও ভিডিও বিশ্লেষণ দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করে আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে যুক্ত হোন।

🎬 Subscribe to Abhikaron

(দ্রষ্টব্য: এই ব্লগে ব্যবহৃত ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা শৈল্পিক উদ্দেশ্যে নির্মিত।)

আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন

নতুন নতুন পৌরাণিক কাহিনী ও লোক-সংস্কৃতির আপডেট পেতে
সরাসরি আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত হন।

www.lalpecha.in

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to ensure you get the best experience on our website. Learn More
Ok, Go it!