মাঘের শেষে শিউলি ঝরার দিন ফুরিয়ে এখন প্রকৃতিতে বসন্তের হাওয়া। আর এই বসন্তের আগমনেই বাঙালির ঘরে ঘরে বেজে ওঠে শিবরাত্রির ডঙ্কা। মহাদেব সর্বত্র— হিমালয়ের চূড়া থেকে শুরু করে শান্ত পল্লীগ্রামের মেঠো পথ, সবখানেই তাঁর অবাধ বিচরণ। কিন্তু আপনি কি জানেন, তিলোত্তমা কলকাতার বুকেই এমন এক শিবলিঙ্গ আছেন, যাঁকে একসময় লোহার মোটা শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো?
নিমতলার বিখ্যাত দুর্গেশ্বর শিব মন্দির (মোটা মহাদেব)
আজ আপনাদের আমি জানাবো নিমতলার সেই বিখ্যাত দুর্গেশ্বর শিব মন্দির, যা স্থানীয়দের কাছে "মোটা মহাদেব" মন্দির নামেও পরিচিত। যাঁর মাহাত্ম্য হয়তো ইতিহাসের বইয়ের পাতায় খুব একটা বড় জায়গা পায়নি, কিন্তু ভক্তদের হৃদয়ে আর কলকাতার ঐতিহ্যে তাঁর স্থান সবার উপরে।
আহিরীটোলার সেই মন্দির ও আমাদের আবেগ
আমরা যারা গ্রামে থাকি, তারা প্রায় প্রতিবছরই কলকাতায় ঠাকুর দেখতে যাই। সারারাত প্যান্ডেল হপিং, তারপর ভোরে শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে আবার গ্রামে ফেরা— এ যেন আলাদা এক আনন্দ আর স্মৃতির মেলবন্ধন।
সেই সময় উত্তর কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা, আহিরীটোলা সর্বজনীন দুর্গোৎসব দেখতেও যাই আমরা। আর সেই আহিরীটোলার কাছেই শান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে এই বিখ্যাত দুর্গেশ্বর শিব মন্দির।
শিবরাত্রি ও লোকজ সংস্কৃতির মিলনমেলা
আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা— আসছে পবিত্র শিবরাত্রি। এক সময় শিবরাত্রির রাতে এখানে বসত জমজমাট গান-পালার আসর। এটি যেন হয়ে উঠত বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির এক মিলন তীর্থক্ষেত্র। প্রহরে প্রহরে চলত বাবার মাথায় জল ঢালার হিড়িক, সঙ্গে প্রসাদ বিতরণ— ভক্তি, উৎসব আর লোকঐতিহ্যের এক অপূর্ব মিলনমেলা আজও মানুষকে টানে।
মন্দিরের ঠিকানা ও গঠনশৈলী
এই মন্দিরটি অবস্থিত রাজধানী কলকাতার ১৬, মোহাম্মদ রমজান লেন, নিমতলা, আহিরীটোলা, বেনিয়াটোলা, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ ৭০০০০৫ । এটি মূলত বাংলার চালা রীতির ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটা ‘আটচালা’ স্থাপত্যের চমৎকার নিদর্শন। অর্থাৎ আট ঢালু ছাদের বিশেষ গঠনশৈলী। ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে (১২০১ বঙ্গাব্দ) প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরটি পশ্চিমমুখী। এককথায় ঠিকানাটি হলো — মদন মোহন দত্ত লেন, নিমতলা, আহিরীটোলা (বেনিয়াটোলা)। এটি নিমতলা শ্মশান ও ভূতনাথ মন্দির–এর খুব কাছেই অবস্থিত। একসময় মন্দিরের সম্মুখভাগ ও পার্শ্বদেয়ালে টেরাকোটার ও পঙ্খের সূক্ষ্ম অলংকরণ, নকশা ও শৈল্পিক মোটিফে ভরপুর ছিল। সময়ের সঙ্গে অনেকটাই ক্ষয়ে গেলেও এখনও তার চিহ্ন চোখে পড়ে। মন্দিরে উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম— এই তিন দিকে প্রবেশদ্বার রয়েছে, তবে পূর্বদিকে কোনো দরজা নেই।
মন্দিরটি এখন Kolkata Municipal Corporation–এর স্বীকৃত কলকাতা হেরিটেজের তকমা বহন করছে।
- উচ্চতা: প্রায় ১৫ মিটার।
- দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ: ৮.৬ মিটার ও ৭ মিটার।
- বিশেষত্ব: মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছে কষ্টিপাথরের তৈরি এক বিশাল শিবলিঙ্গ, যার উচ্চতা প্রায় ২.৫ মিটার। যার মানে গিয়ে দাঁড়ায় ৮.২০২ ফুট (প্রায়)। সহজভাবে বললে, এটি ৮ ফুট ২ ইঞ্চির সমান। এতটাই উঁচু এই শিবলিঙ্গ যে, মাথায় জল ঢালার জন্য পাশে কমলা রঙের লোহার সিঁড়ি ব্যবহার করতে হয়।
এখন মন্দিরের দেওয়ালে ঝুলে থাকা বটের ঝুড়িগুলো দেখে মনে হয় স্বয়ং মহাদেব তাঁর জটা বিস্তার করে বসে আছেন।
কেন লোহার শিকলে বাঁধা থাকতেন মহাদেব?
এই মন্দিরকে ঘিরে একাধিক লোককথা প্রচলিত থাকলেও, সবচেয়ে বেশি শোনা যায় একটি রোমাঞ্চকর গল্প। বলি তবে শুনুন— সেই আমলে নাকি গঙ্গা নদী আজকের মতো দূরে ছিল না; মন্দিরের একদম কোল ঘেঁষেই কুলকুল শব্দে বয়ে চলত মা গঙ্গা। কথিত আছে, দিনের বেলা মন্দিরে ভক্তদের ভিড় থাকলেও রাত বাড়লেই প্রাঙ্গণ একেবারে নিঝুম হয়ে যেত।
রোজকার মতো পুরোহিত মশাই নিয়ম মেনে সন্ধ্যাপূজা সেরে কোনো একদিন রাতে গর্ভগৃহের দরজা বন্ধ না করেই বাড়ি চলে যান। পরদিন সকালে দরজা দিয়ে তাকাতেই দেখা যায়— গর্ভগৃহ ফাঁকা! বেদীর ওপর মহাদেব নেই। মহাদেব উধাও!
চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর নাকি তাঁকে দেখা যেত গঙ্গার তীরে গিয়ে বসে আছেন। লোকমুখে বলা হয়, মহাদেব নাকি রাতের হাওয়া খেতে চুপিচুপি নদীর ধারে চলে যেতেন। দেবতার এই “চঞ্চলতা” আটকাতেই শেষমেশ তাঁকে মোটা লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করা হয়— এমনটাই বিশ্বাস ভক্তদের।
যদিও এটি একটি ভক্তিমূলক বিশ্বাস, তবু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বলা এই গল্প মন্দিরটিকে এক অনন্য রহস্যময় আবহ দেয়— যেখানে ভক্তি, কৌতূহল আর লোকবিশ্বাস মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
প্রতিষ্ঠাতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
হাটখোলার বিখ্যাত দত্ত পরিবারের মদনমোহন দত্তের দুই পুত্র— রসিকলাল দাস দত্ত এবং হরলাল দাস দত্ত এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের ফলক অনুযায়ী এর প্রকৃত নাম ‘দুর্গেশ্বর শিব’।
মদনমোহন দত্ত ছিলেন সেই সময়ের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী জমিদার এবং ব্যবসায়ী। কলকাতার প্রবাদপ্রতিম চরিত্র ছাতুবাবু ও লাটুবাবুর পিতা রামদুলাল দে কিন্তু এই মদনমোহন দত্তের হাত ধরেই সাফল্যের সিঁড়ি চড়েছিলেন। শুধু বিষয়-সম্পত্তি নয়, গয়ার প্রেতশিলা পাহাড়ে সিঁড়ি তৈরি থেকে শুরু করে বহু জনকল্যাণমূলক কাজে তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম।
দর্শনের সময়সূচী
আপনি যদি বাবার আশীর্বাদ নিতে যেতে চান, তবে এই সময়গুলো মাথায় রাখবেন:
- 🌅 ভোর: ৫:০০ টা থেকে ৬:০০ টা পর্যন্ত।
- ☀️ সকাল: ৭:৩০ টা থেকে দুপুর ১২:১৫ পর্যন্ত।
- 🕒 বিকাল: ৪:০০ টায় মন্দির আবার খোলে।
- 🌸 বিশেষ সাজ: রাত ৮ টায় বাবার বিশেষ ‘অঙ্গরাগ’ বা পুষ্পশৃঙ্গার হয়। এই রূপটি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
- 🔏 বন্ধ: রাত ৯ টায় গর্ভগৃহ বন্ধ হয়।
যাবেন কিভাবে?
কলকাতার যেকোনো প্রান্ত থেকে এখানে পৌঁছানো খুব সহজ:
- 🚢 লঞ্চে: হাওড়া স্টেশন থেকে লঞ্চে আহিরীটোলা ঘাট, সেখান থেকে মাত্র ১০ মিনিটের হাঁটা পথ।
- 🚃 ট্রেনে: চক্ররেলের শোভাবাজার-আহিরীটোলা স্টেশনে নেমে পায়ে হেঁটে যাওয়া যায়।
- 🚇 মেট্রোতে: শোভাবাজার সুতানুটি স্টেশনে নেমে অটো বা রিকশায় নিমতলা স্ট্রিট।
শেষ কথা
মোটা মহাদেবের মন্দিরের দেওয়ালে তাকালে দেখবেন অসংখ্য ঢিল সুতো বা প্লাস্টিক দিয়ে বাঁধা। যাকে বাংলায় বলে “ভাড়া বাঁধা”। মানুষের বিশ্বাস, এখানে ভক্তিভরে যা চাওয়া হয়, বাবা তা ফিরিয়ে দেন না। শিবরাত্রি বা নীল পুজোর দিনে এখানে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। কলকাতা-র এই প্রাচীন ঐতিহ্যগুলোই শহরটাকে জীবন্ত করে রেখেছে।
আসন্ন শিবরাত্রিতে আপনিও কি যাচ্ছেন মোটা মহাদেবের মাথায় জল ঢালতে? কমেন্ট করে আমাদের জানান আপনার অভিজ্ঞতার কথা।
