চূর্ণী তীরের লোকগাথা: আনুলিয়ার ৪৫০ বছরের প্রাচীন বাসুদেব ও এক অলৌকিক ইতিহাস
নদিয়া জেলার মাটির গন্ধ আর নদীর হাওয়ায় মিশে আছে অজস্র না বলা কাহিনী। এ জেলার বুক চিরে বয়ে চলা ছয়টি নদীর মধ্যে চূর্ণী একটু অন্যরকম। এর জন্ম আর শেষ—দুটোই আমাদের নদিয়ার সীমানায়। চূর্ণীর দুই পাড়ে আজ থেকে কয়েক শতাব্দী আগে যখন জনবসতি গড়ে উঠতে শুরু করেছিল, তখন সমাজটা ছিল বুনো, বাগদি, সাঁওতাল আর কৈবর্তদের মতো মেহনতি মানুষের। পরবর্তীতে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের হাত ধরে এখানে শিক্ষার আলো পৌঁছালেও, এখন এই জনপদের গ্রামরক্ষক লোকদেবতা হিসেবে বাসুদেবের মূর্তি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন।
আজ আমি আপনাদের নিয়ে যাবো রানাঘাটের চূর্ণী নদীর পাশে সেই ঐতিহাসিক আনুলিয়া গ্রামে, যেখানে এক কষ্টিপাথরের দেবতার টানে আজও মানুষের ভিড় জমে।
মৌখিক ইতিহাস বলে, বালির ঢিবির নিচে লুকানো ছিল সেই মূর্তি: এক অলৌকিক স্বপ্নাদেশ
গল্পটা রূপকথার মতো মনে হলেও আনুলিয়ার মানুষের কাছে এটি ধ্রুব সত্য। কয়েকশো বছর আগের কথা, স্থানীয় জমিদার সর্বচন্দ্র রায় এক রাতে এক অদ্ভুত স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নে তিনি দেখেন—শিবপুর ঘাটের কাছে, যেখানে গঙ্গা ও চূর্ণীর মিলন হয়েছে, সেখানকার এক বালির ঢিবির নিচে একটি বিশাল মূর্তি অযত্নে পড়ে আছে।
পরদিন সকালেই নায়েব-গোমস্তাদের নিয়ে জমিদার মশাই পৌঁছে যান সেই ঘাটে। খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হতেই বেরিয়ে আসে এক অপূর্ব সুন্দর, কালো কষ্টিপাথরের চতুর্ভুজ বিষ্ণুমূর্তি। জমিদার পরম ভক্তিভরে সেই মূর্তি নিয়ে এসে একটি বিশাল অশ্বত্থ গাছের নিচে স্থাপন করেন। আজও সেই স্থানেই তিনি পূজিত হচ্ছেন।
ছবি: কয়েক শতাব্দী প্রাচীন দণ্ডায়মান বাসুদেব মূর্তি
বিষ্ণু যখন পূজিত হন 'বুড়ো শিব' রূপে!
এই মন্দিরের সবচেয়ে বড় বৈচিত্র্য হলো এর ধর্মীয় সমন্বয়। মূর্তির গঠনশৈলী দেখলে বোঝা যায় এটি একটি ক্ল্যাসিকাল বিষ্ণুমূর্তি—যাঁর হাতে শঙ্খ, পদ্ম, গদা ও চক্র। উচ্চতা প্রায় সাড়ে চার ফুট এবং ওজন প্রায় সাড়ে তিনশো কেজি। মূর্তির মস্তকের দুই পাশে উড়ন্ত গন্ধর্ব আর পায়ের কাছে চামরধারী ভক্তদের খোদাই করা ছবি ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিষ্ণুমূর্তিকে গ্রামের মানুষ বিশেষ করে চড়ক ও গাজনের সময় "বুড়ো শিব" রূপে পূজা করেন। এই যে লৌকিক বিশ্বাস আর বৈষ্ণব-শৈব সংস্কৃতির মিলন, এটাই আনুলিয়ার প্রধান আকর্ষণ।
সামাজিক বিবর্তন ও আধুনিক প্রেক্ষাপট
বৌদ্ধ যুগের প্রাচীন 'অনলগ্রাম' আজকের আনুলিয়া। আনুলিয়া গ্রামটি নদিয়া জেলার রানাঘাট মহকুমা ও রানাঘাট–I ব্লকের অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। প্রাচীন ইতিহাস ও নানা ঐতিহাসিক নিদর্শনের জন্য এই গ্রামটি বিশেষভাবে পরিচিত। ‘আনুলিয়া’ নামটি সম্ভবত ‘অনলগ্রাম’ শব্দ থেকে উদ্ভূত। একদা এই গ্রামটি বৌদ্ধ শ্রমণদের বাসস্থান ছিল। নদিয়া জেলার পুরাকীর্তি বিষয়ক গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে বিখ্যাত বৌদ্ধ শ্রমণ শান্তাচার্য সম্ভবত এই গ্রামেরই বাসিন্দা ছিলেন।
এবার আসি আমাদের আলোচনাতে—মৌখিক ইতিহাস বলে, এই বাসুদেব মন্দিরটি ১৬২১ সাল নাগাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একসময় এখানে পূজার নিয়মে এক বিশেষ সামাজিক স্তরবিন্যাস ছিল। সময়ের বিবর্তনে আজ আর সেই ভেদাভেদ নেই। আজ গ্রামবাসী বাসুদেবকে তাদের পরিবারের সদস্যের মতো ভালোবাসেন। গ্রামের খুব জাগ্রত দেবতা তিনি, গ্রামের একাধিক ব্যক্তি আমাকে এই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
গ্রামবাসীদের ভক্তি এতটাই অটুট যে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI)-র পরিচয় দিয়ে অজ্ঞাত কিছু ব্যক্তি এই মূর্তিটি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। তখন গোটা গ্রাম প্রতিবাদে রুখে দাঁড়িয়েছিল। এই ঘটনার পর আনুলিয়া গ্রামের সচেতন নাগরিকদের উদ্যোগে দেবলগড় প্রত্নক্ষেত্রের গবেষক ড. বিশ্বজিৎ রায়ের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে, বটতলাটিকে লোহার গ্রিল দিয়ে ঘিরে সুরক্ষিত করা হয়। নিচে পাকা ভিত তৈরি করা হয় এবং তার ওপর একচালা টিনের ছাউনি নির্মিত হয়। সকাল ও বিকালবেলায় পূজার সময় দরজা খোলা থাকে। এর আগে বাসুদেবের তলা ছিল সম্পূর্ণ খোলা ও অরক্ষিত।
কীভাবে যাবেন?
রানাঘাট স্টেশন থেকে পায়রাডাঙাগামী যেকোনো অটো রিকশা বা টোটো করে সহজেই পৌঁছানো যায়। রানাঘাট স্টেশন থেকে আনুমানিক দূরত্ব প্রায় ২.৮ কিলোমিটার। অটোতে এলে ‘মনোশাতলা বটগাছ’ নামতে হবে (ভাড়া আনুমানিক ২০ টাকা)। সেখান থেকে ডানদিকে প্রায় ২০০ মিটার পায়ে হেঁটে এগোলেই পৌঁছে যাবেন। আর টোটোতে এলে সরাসরি বাসুদেব মন্দির পর্যন্ত পৌঁছানো যায়। টোটো রিজার্ভ করলে সাধারণত ১০০-১৫০ টাকা নিতে পারে, তবে দরদাম করে নিন, ১০০ টাকার কম হতে পারে।
ম্যাপ লোকেশনউপসংহার
আনুলিয়ার এই প্রাচীন বাসুদেব মূর্তি কেবল একটি কষ্টিপাথরের স্থাপত্য নয়, এটি চূর্ণী তীরের মানুষের আবেগ, বিশ্বাস আর কয়েকশো বছরের লড়াইয়ের ইতিহাস। প্রত্নতাত্ত্বিক ড. বিশ্বজিৎ রায়ের মতো বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলের মাটির নিচে এখনও লুকিয়ে থাকতে পারে সেন বা পাল যুগের অনেক না বলা ইতিহাস। আপনি যদি ইতিহাসপ্রেমী হন বা আধ্যাত্মিক শান্তির খোঁজে থাকেন, তবে একদিনের সফরে রানাঘাটের এই 'অনলগ্রাম' আপনার তালিকায় অবশ্যই রাখা উচিত।
জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
- ১. আনুলিয়া বাসুদেব মন্দিরটি কত বছরের পুরনো?
জনশ্রুতি ও নথিপত্র অনুযায়ী এটি আনুমানিক ১৬২১ সালে প্রতিষ্ঠিত, যা প্রায় ৪০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন। - ২. এখানে মূল উৎসব কবে হয়?
চৈত্র সংক্রান্তিতে নীল পূজা এবং গাজনের সময় এখানে সবথেকে বড় উৎসব ও মেলা বসে। - ৩. রানাঘাট স্টেশন থেকে যাতায়াতের সেরা মাধ্যম কী?
শেয়ার অটোতে 'মনোশাতলা বটগাছ' পর্যন্ত এসে সামান্য হাঁটা সবথেকে সাশ্রয়ী উপায়।
আমাদের নদিয়ার প্রতিটি কোণায় এমন কত ইতিহাস যে লুকিয়ে আছে! আপনার এলাকায় এমন কোনো কাহিনী জানা থাকলে কমেন্টে অবশ্যই জানান।
নদিয়ার আরও ইতিহাস জানতে চোখ রাখুন: www.lalpecha.in

We welcome thoughtful discussions. Comments are moderated for quality