ফুলিয়া: মহাকবি কৃত্তিবাস ওঝার ও যবন হরিদাস ঠাকুরের পুণ্যভূমি | নদীয়া জেলা

RAJU BISWAS
0

ফুলিয়ায় অবস্থিত মহাকবি কৃত্তিবাস ও ভক্ত হরিদাস ঠাকুরের স্মৃতিস্তম্ভ ও পুণ্যভূমি, নদীয়া জেলা
ইতিহাসের নীরব সাক্ষী ফুলিয়া—মহাকবি কৃত্তিবাস ও ভক্ত হরিদাসের স্মৃতিধন্য পুণ্যভূমি
 বাংলার মাটির পরতে পরতে মিশে আছে সংস্কৃতি, সাহিত্য আর আধ্যাত্মিকতার গভীর ইতিহাস। নদীয়া জেলার শান্তিপুর সংলগ্ন একটি জনপদ ফুলিয়া—যা কেবল একটি গ্রাম নয়, বরং বাঙালির আবেগ ও চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কলকাতা থেকে মাত্র ৫৪ মাইল দূরে অবস্থিত এই শান্ত গ্রামটি আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত 'ভাষা-রামায়ণ' রচয়িতা মহাকবি কৃত্তিবাস ও পরম বৈষ্ণব সাধক হরিদাস ঠাকুরের স্মৃতিধন্য পুণ্যভূমি হিসেবে।

fulia-krittibas-nadia.jpg
মহাকবি কৃত্তিবাসের মূর্তি—তাঁর জন্মভূমি ফুলিয়ায়, নদীয়া জেলা

ফুলিয়ার ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

প্রাচীনকালে ফুলিয়া ছিল এক সমৃদ্ধ জনপদ। কবি কৃত্তিবাসের লেখনীতেই পাওয়া যায় সেই সময়ের বর্ণিল চিত্র:

"গ্রামরত্ন ফুলিয়া জগতে বাখানি।

দক্ষিণে পশ্চিমে বহে গঙ্গা তরঙ্গিণী।।"

অর্থাৎ, একসময় ফুলিয়ার কোল ঘেঁষে প্রবাহিত হতো উত্তাল গঙ্গা। সময়ের বিবর্তনে গঙ্গা আজ প্রায় ৪ মাইল দূরে সরে গেলেও, সেই সমৃদ্ধির ছাপ আজও এখানকার ধূলিকণায় অনুভব করা যায়। ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দের এক পুণ্য রবিবার, সরস্বতী পূজার শুভ লগ্নে এই গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাঙালির প্রাণের কবি কৃত্তিবাস ওঝা।

krittibas-toron-fulia-nadia.jpg
ফুলিয়ায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ও পবিত্র স্থানের প্রবেশ পথ, নদীয়া জেলা

মহাকবি কৃত্তিবাস: বাঙালির নিজস্ব রামায়ণকার

কৃত্তিবাস ওঝা কেবল একজন অনুবাদক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সার্থক রূপকার। বাল্মীকির মূল সংস্কৃত রামায়ণের নিরস অনুবাদের পরিবর্তে তিনি তাতে মিশিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার নিজস্ব জল-হাওয়া, সমাজচিত্র এবং উৎসবের আমেজ।

বংশ পরিচয় ও বাল্যকাল

কৃত্তিবাসের বংশগত উপাধি ছিল 'ওঝা', যা পরবর্তীকালে 'মুখুটি' বা মুখোপাধ্যায় পরিবার হিসেবে পরিচিত হয়। তাঁর পিতা বনমালী ও মাতা মালিনী দেবী। 'মুখুটি' গোত্রীয় ব্রাহ্মণ।কৃত্তিবাসের বংশলতিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর পূর্বপুরুষ মুরারি ওঝা ছিলেন এক বিশিষ্ট পণ্ডিত। বনমালীর আট পুত্রের মধ্যে কৃত্তিবাস ছিলেন জ্যেষ্ঠ এবং সর্বাধিক মেধাবী।

স্তরসদস্যদের নাম
মূল পুরুষমুরারি ওঝা
দ্বিতীয় স্তর (পুত্রগণ)বনমালী, লক্ষ্মীধর, অনিরুদ্ধ
তৃতীয় স্তর (বনমালীর পুত্রগণ)কৃত্তিবাস, শান্তি, মাধব, মৃত্যুঞ্জয়, বলভদ্র, শ্রীকণ্ঠকঃ, চতুর্ভুজ, মনোহর (শ্রীধর)
চতুর্থ স্তর (মৃত্যুঞ্জয়ের পুত্র)মালাধর খাঁ
পঞ্চম স্তর (মালাধর খাঁর পুত্রগণ)সুষেন পণ্ডিত, গজানন্দ

mahakabi-krittibas-library-fulia-nadia.jpg

 গৌড়েশ্বরের সভা ও কাব্য রচনা

শিক্ষা সমাপন করে কৃত্তিবাস তৎকালীন গৌড়েশ্বরের রাজসভায় যোগ দেন। কবির পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে রাজা তাঁকে রামায়ণ রচনার অনুরোধ জানান। কৃত্তিবাস বাল্মীকির রামায়ণকে বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে তাতে যুক্ত করলেন 'অকালবোধন' বা রামচন্দ্রের দুর্গাপূজার বর্ণনা, যা মূল সংস্কৃত রামায়ণে ছিল না। এছাড়া মহীরাবণ বধ, লব-কুশের যুদ্ধ এবং রাবণের মৃত্যুবাণ হরণের মতো চমকপ্রদ আখ্যানগুলো তাঁর রামায়ণকে মৌলিক কাব্যের মর্যাদা দিয়েছে।

জয়গোপালী রামায়ণ ও আধুনিক সংস্করণ

আজ আমরা যে কৃত্তিবাসী রামায়ণ পড়ি, তার অনেকটা জুড়ে আছে জয়গোপাল তর্কালঙ্কারের সংস্কার। মূল কৃত্তিবাসের প্রাচীন ভাষাকে আধুনিক পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য করতে তিনি প্রায় আমূল পরিবর্তন করেছিলেন। তবে বর্তমানে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রচেষ্টায় কবির মূল পাণ্ডুলিপির পুনরুদ্ধার করার কাজ অব্যাহত রয়েছে।

historic-sacred-place-entrance-fulia-nadia.jpg
ফুলিয়ায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ও পবিত্র স্থানের প্রবেশ পথ, নদীয়া জেলা

ফুলিয়ার দর্শনীয় স্থান: স্মৃতির সরণি বেয়ে

ফুলিয়া ভ্রমণে গেলে যে স্থানগুলো আপনার ইতিহাসের তৃষ্ণা মেটাবে, সেগুলি হলো:

krittibas-ojha-smriti-stambha-fulia-nadia.jpg
ফুলিয়ায় অবস্থিত মহাকবি কৃত্তিবাস ওঝার স্মৃতি স্তম্ভ, নদীয়া জেলা
 

১. কৃত্তিবাসের স্মৃতি স্তম্ভ: ১৯১৬ সালে (১৩২২ বঙ্গাব্দ) বাংলার বাঘ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এই স্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। স্তম্ভের গায়ে খোদিত কবির পরিচয় ও প্রশস্তি আজও আগত পর্যটকদের মুগ্ধ করে।

Krittibas Kup at Birthplace Fulia Nadia
মহাকবি কৃত্তিবাস ওঝার জন্মভূমি ফুলিয়ায় অবস্থিত ঐতিহাসিক কূপ

 ২. কৃত্তিবাস কূপ: জনশ্রুতি আছে, কবির জন্মভিটার এই প্রাচীন কূপটি তাঁর শৈশবের স্মৃতি বহন করছে। বর্তমানে এটি সংস্কার করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। 

Krittibas Smriti Vidyalaya at Fulia Nadia
ফুলিয়ায় অবস্থিত কৃত্তিবাসের স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠিত কৃত্তিবাস স্মৃতি বিদ্যালয়, নদীয়া জেলা

৩. কৃত্তিবাস স্মৃতি বিদ্যালয় ও দোলমঞ্চ: স্মৃতি স্তম্ভের পাশেই রয়েছে বিদ্যালয় এবং কবির দোলমঞ্চ হিসেবে পরিচিত একটি প্রাচীন ইষ্টক স্তূপ। ধারণা করা হয়, এই স্থানে খননকার্য চালালে আরও বহু প্রাচীন অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া সম্ভব।

Haridas Thakur Smriti Sthal at Fulia Nadia
ফুলিয়ায় অবস্থিত ভক্ত শিরোমণি হরিদাস ঠাকুরের স্মৃতিস্থল ও সাধনপীঠ, নদীয়া জেলা

ভক্ত শিরোমণি হরিদাস ঠাকুরের সাধনপীঠ

এর আগে পোস্টে আমি বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসে নদীয়া জেলার শান্তিপুরে অবস্থিত শ্রী অদ্বৈত আচার্যের লীলাভূমি—‘বাবলার অদ্বৈত পাট’ নিয়ে আলোচনা করেছি।

আজ শান্তিপুরের কাছে অবস্থিত ফুলিয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে মনে হচ্ছে, ফুলিয়া শুধু সাহিত্যের ক্ষেত্রেই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান নয়, বরং আধ্যাত্মিকতার দিক থেকেও এটি একটি গভীর ও পবিত্র মিলনস্থল।কারণ,এখানে অবস্থিত যবন হরিদাস ঠাকুরের সাধনপীঠ। মুসলিম পরিবারে জন্ম নিলেও হিন্দুধর্মে তাঁর অগাধ ভক্তি ও 'নাম-সংকীর্তন' তাঁকে বৈষ্ণব সমাজে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। আর কৃত্তিবাসের দেশে আপনার এলেই হরিদাস ঠাকুরের আশ্রম দেখতে পাবেন। 

Yavan Haridas Thakur in Gouranga Mahaprabhu’s Kol at Fulia Nadia
যবন হরিদাস ঠাকুরকে কোলে নিয়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মূর্তি, নদীয়া জেলা

অবিশ্বাস্য ক্ষমা ও সহনশীলতা

তৎকালীন প্রাদেশিক শাসক বা মুলুকপতি হরিদাসকে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করতে আদেশ দেন। তিনি তা অস্বীকার করলে তাঁকে বাইশ বাজারে বেত্রাঘাত করার নিষ্ঠুর শাস্তি দেওয়া হয়। অবিশ্বাস্যভাবে, সেই অমানবিক নির্যাতনেও তিনি বিচলিত হননি। বরং তিনি তাঁর অত্যাচারীদের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে বলেছিলেন :

"এ সব জীবেরে প্রভু করহ প্রসাদ।

মোরে দ্রোহে নহু এ সবার অপরাধ।।"

এই ক্ষমাশীলতার আদর্শ তাঁকে পৃথিবীর ইতিহাসে যিশু খ্রিস্টের মতো এক অনন্য আসনে বসিয়েছে। স্বয়ং শ্রীচৈতন্যদেব তাঁকে 'পৃথিবীর শিরোমণি' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। 

haridas-thakur-ashram-probesh-poth-fulia-nadia.jpg
হরিদাস ঠাকুরের আশ্রমে প্রবেশ পথ

ফুলিয়ার গুহা ও অলৌকিকতা

ফুলিয়ায় হরিদাস ঠাকুর যেখানে একটি 'গোফা' বা গুহার মধ্যে প্রতিদিন তিন লক্ষ নাম জপ করতেন, সেই স্থানটি আজও ভক্তদের কাছে পরম পবিত্র। কথিত আছে, সেই গুহায় একটি বিষধর সর্প বাস করত, যা হরিদাসের উপস্থিতিতে কারও ক্ষতি করেনি। পরবর্তীকালে শ্রীচৈতন্যদেব নীলাচল যাওয়ার পথে এই স্থানেই অবস্থান করেছিলেন। 

fulia-tant-shilpo-handloom-nadia.jpg
ফুলিয়ার তাঁতশিল্প—গ্রামীণ কারিগরদের নিপুণ হাতের কাজ

বর্তমানের ফুলিয়া: তাঁতশিল্প ও পর্যটন

আধুনিক যুগে ফুলিয়া কেবল ইতিহাসের জন্য নয়, তার জগদ্বিখ্যা তাঁতশিল্পের জন্যও পরিচিত। শান্তিপুরী ও ফুলিয়া টাঙ্গাইল শাড়ির কদর বিশ্বজুড়ে। একদিকে মহাকবির ইতিহাস আর অন্যদিকে গ্রামীণ কারিগরদের নিপুণ হাতের কাজ—ফুলিয়াকে করেছে পর্যটকদের জন্য এক আকর্ষণীয় গন্তব্য।

mahakabi-krittibas-samadhi-sthan-fulia-nadia.jpg
ফুলিয়ায় অবস্থিত মহাকবি কৃত্তিবাস ওঝার ঐতিহাসিক সমাধিস্থান, নদীয়া জেলা
 কেন যাবেন ফুলিয়ায়?

আপনি যদি একাধারে সাহিত্যপ্রেমী, ইতিহাস অনুরাগী এবং আধ্যাত্মিক পিপাসু হন, তবে ফুলিয়া আপনার তালিকায় অবশ্যই থাকা উচিত। প্রতি বছর মাঘ মাসের শ্রীপঞ্চমী তিথিতে এখানে বড় মেলা ও সাহিত্য সম্মেলন বসে। সেই শান্ত পরিবেশ আর প্রাচীন বটের ছায়ায় দাঁড়ালে মনে হবে, সময় যেন কয়েকশ বছর থমকে দাঁড়িয়ে আছে।

উপসংহার

ফুলিয়া বাঙালির শেকড়ের সন্ধান দেয়। কৃত্তিবাসের রামায়ণ যেমন আমাদের ভাষা শিখিয়েছে, হরিদাস ঠাকুরের জীবন শিখিয়েছে ধৈর্য ও প্রেম। নদীয়া জেলার এই ছোট জনপদটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের সাহিত্য ও সাধনা কালজয়ী। তাই ছুটির দিনে ব্যস্ত জীবন থেকে মুক্তি পেতে একবার ঘুরে আসতেই পারেন এই পুণ্যভূমি থেকে।

ফুলিয়া আর শান্তিপুরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত 'বাথন কৃত্তিবাস' রেল স্টেশন

কিভাবে যাবেন:

শিয়ালদহ স্টেশন থেকে শান্তিপুর লোকাল ধরে ফুলিয়া স্টেশনে নামতে হবে।আবার, ফুলিয়া আর শান্তিপুরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত 'বাথন কৃত্তিবাস' রেল স্টেশন (রানাঘাট স্টেশন থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরত্ব)। বাথন কৃত্তিবাস রেল স্টেশন থেকেই টোটোতে সহজেই কৃত্তিবাস ওঝার জন্মভিটা এবং হরিদাস ঠাকুরের মঠে পৌঁছানো যায়। 

আপনি কি নদীয়া জেলার আরও ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চান? অথবা শান্তিপুরের তাঁতশিল্প নিয়ে আলাদা কোনো নিবন্ধ প্রয়োজন? আমাকে জানান, আমি আপনাকে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে পারব।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to ensure you get the best experience on our website. Learn More
Ok, Go it!