মোগলমারি বৌদ্ধ মহাবিহার—পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রাচীন বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র
মোগলমারি বৌদ্ধ মহাবিহার: ইতিহাস, খনন ও ভ্রমণ গাইড
বাংলার ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা বারবার গৌড় (Gaur), পাণ্ডুয়া (Pandua) এবং মুর্শিদাবাদ (Murshidabad) এর কথা শুনি। সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে দেবলগড়, চন্দ্রকেতুগড়, সুন্দরবন বা অন্য অন্য প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সেই রকমই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হলো মোগলমারি (Moghalmari)। মোগলমারি হলো এই বঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাঁতন ২ ব্লকে অবস্থিত একটি নির্জন গ্রাম। এই গ্রামটি তার মাটির গভীরে প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো এক সমৃদ্ধ সভ্যতার ইতিহাস আগলে রেখেছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। আজ মোগলমারি কেবল একটি খননকেন্দ্র নয়, এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
প্রাচীন দণ্ডভুক্তি অঞ্চলের গৌরব—মোগলমারী বৌদ্ধ মহাবিহার, গুপ্ত-পরবর্তী যুগের এক গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ প্রত্নস্থল।
আপনি যদি ইতিহাস ভালোবাসেন বা উইকএন্ডে কোনো অফবিট ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখতে চান, তবে মোগলমারি বৌদ্ধ মহাবিহার আপনার তালিকার শীর্ষে রাখা উচিত। এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা মোগলমারির ইতিহাস, রোমাঞ্চকর খননকার্য এবং ভ্রমণের গাইড নিয়ে আলোচনা করব।
মোগলমারি বৌদ্ধ মহাবিহারের সাইনবোর্ড, দাঁতন ব্লক, পশ্চিম মেদিনীপুর
মোগলমারি নামের উৎস ও ইতিহাস
'মোগলমারি' নামটির পেছনে ঐতিহাসিক ও ভাষাগত দুটি প্রধান মতবাদ প্রচলিত রয়েছে:
- যুদ্ধের ইতিহাস: ১৫৭৫ সালে মোগল সম্রাট আকবরের সেনাপতিদের সাথে পাঠান সুলতান দাউদ খান কররানির এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয় (তুকারুইয়ের যুদ্ধ)। এই যুদ্ধে মোগলদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বলে স্থানটির নাম হয় 'মোগলমারি'।
- ভাষাগত উৎপত্তি: স্থানীয় উপভাষায় ‘মাড়’ মানে রাস্তা। মোগলরা এই রাস্তা মাড়িয়ে ওড়িশার(কলিঙ্গ) দিকে গিয়েছিল বলে লোকমুখে ‘মোগলমাড়ি’ থেকে আজকের ‘মোগলমারি’ নামের উৎপত্তি হয়েছে।
সখীসেনার ঢিবি থেকে আধুনিক আবিষ্কার
শত শত বছর ধরে এই অঞ্চলে জৈন, বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাবে নানা ধরনের শিল্প ও স্থাপত্য গড়ে উঠেছে।
মোগলমারি গ্রামের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে একটি বিশাল ইটের ঢিবি স্থানীয়দের কাছে 'সখীসেনার ঢিবি' বা 'শশীসেনার পাঠশালা' নামে পরিচিত ছিল। কিংবদন্তি অনুসারে, রাজকুমারী সখীসেনা এবং মন্ত্রীপুত্র অহিমাণিকের প্রেম ও শিক্ষার কেন্দ্র ছিল এটি। ১৯৯৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. অশোক দত্ত প্রাচীন বাণিজ্যপথের সন্ধানে এসে, এই ঢিবির ঐতিহাসিক গুরুত্ব উন্মোচন করেন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় ২০০২-০৩ সালে প্রথম খনন শুরু হয় এবং বাংলার বৃহত্তম বৌদ্ধ বিহার কমপ্লেক্স লোকচক্ষুর সামনে আসে। পরবর্তীকালে ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের উদ্যোগে বিস্তারিত খনন শুরু হয়। এই পর্যায়ে বহু মূল্যবান প্রত্নবস্তু, মৃৎপাত্র ও ছয়টি ফলক (ট্যাবলেট) আবিষ্কৃত হয়।
অধ্যাপক ড. অশোক দত্ত | প্রত্নতত্ত্ব গবেষক
খননকার্যের প্রাপ্ত অমূল্য সম্পদ
মোগলমারিতে নয়টি পর্যায়ে খননকার্য চালানো হয়েছে। ব্রিটিশ সার্ভেয়ার বা জরিপকারী এইচ. এল. হ্যারিসনের ১৮৭৩ সালের একটি প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে এটি করা হয়েছে। এখানে ৬ষ্ঠ-৭ম শতাব্দীর অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী পাওয়া গেছে যা বৌদ্ধ ধর্মের 'বজ্রযান' পর্বের পরিচয় দেয়।
- প্রাথমিক পর্যায় (২০০৩-২০০৭): প্রথম দিকে ‘এমজিএম–১’ (সখীসেনার ঢিবি) এবং ‘এমজিএম–২’ এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ শুরু হয়। এখানে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ছোট ঘর, সন্ন্যাসীদের বাসস্থান এবং ত্রিরথ কাঠামোর মন্দির পাওয়া যায়।
- স্থাপত্যের সৌন্দর্য: ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শতাব্দীর দেওয়ালে ফুল, পশু এবং মানুষের ছবি আঁকা অসাধারণ কারুকার্য পাওয়া যায়। এখানে বৌদ্ধ ধর্মের 'বজ্রযান' পর্বের প্রভাব স্পষ্ট।
- ষষ্ঠ পর্যায়ের বিস্ময় (২০১১-২০১২): এই সময় ১৩টি স্টাকো (চুনের পলেস্তারা) মূর্তি আবিষ্কৃত হয়। এর মধ্যে কুবের, অবলোকিতেশ্বর আজও গবেষকদের মুগ্ধ করে।
- ব্রোঞ্জ মূর্তির রত্নভাণ্ডার (২০১৫-২০১৬): নবম পর্যায়ের খননকার্য ছিল সবচেয়ে সফল। একদিনে একসঙ্গে ৯৫টি ব্রোঞ্জ মূর্তি উদ্ধার করা হয়।
মোগলমারি বৌদ্ধ মহাবিহারের খননে আবিষ্কৃত টেরাকোটা অলংকরণযুক্ত প্রাচীন দেয়ালচিত্র
মোগলমারিকে কেন ‘বাংলার নালন্দা’ বলা হয়?
গবেষকদের মতে, এটিই ছিল হিউয়েন সাং বর্ণিত তাম্রলিপ্তের ১০টি বিহারের মধ্যে সেই বিখ্যাত ‘শ্রীবন্দক মহাবিহার’। মূল বিহারটির আয়তন ৬০ মিটার × ৬০ মিটার (৩৬০০ বর্গমিটার), যা পশ্চিমবঙ্গে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত বৃহত্তম বৌদ্ধ বিহার। খননে প্রায় ৫২ ধরনের নকশাযুক্ত ইট পাওয়া গেছে। যেখানে নালন্দায় পাওয়া গিয়েছিল মাত্র ৩৮ ধরনের।
মোগলমারি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর
কলকাতার আশুতোষ মিউজিয়ামের কিউরেটর ড. দীপক কুমার বড় পান্ডা দেবলগড় আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়ামের বার্ষিক (২০২৫) সম্মেলনে এসে একটি গল্পের মাধ্যমে খননকাজের বাইরের নানা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, স্বর্গীয় প্রফেসর অশোক দত্ত অত্যন্ত সাধারণভাবে মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে সাধারণ মানুষের নিজস্বভাবে সংগ্রহ করা নানা বস্তু নিয়ে স্থানীয় ‘তরুণ সংঘ’ ক্লাবে একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলেন এবং প্রত্নবস্তু সংরক্ষণের বহু অজানা কাহিনি সবার সামনে আনেন।
বিশিষ্ট পণ্ডিতদের মতে, মোগলমারী উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ বৌদ্ধ মহাবিহার। এখান থেকে প্রাপ্ত স্বর্ণ ও ব্রোঞ্জের বুদ্ধমূর্তিসহ বহু মূল্যবান নিদর্শন বর্তমানে কলকাতার সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত। কিছু প্রত্নবস্তু এখনও স্থানীয় মোগলমারী তরুণ সেবা সংঘ ক্লাবের তত্ত্বাবধানে রক্ষিত রয়েছে। এই সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য নিদর্শনের মধ্যে আছে পোড়ামাটির ফলক, গুপ্ত-পরবর্তী ব্রাহ্মী লিপিযুক্ত সীলমোহর এবং রাজা সমাচারদেবের নামাঙ্কিত মিশ্র ধাতব মুদ্রা। সীলমোহরের শিলালিপি পাঠোদ্ধার করে জানা গেছে, মোগলমারী মূলত দুটি বৌদ্ধ মঠ নিয়ে গঠিত ছিল।
২০০২-০৩ সালে খননকাজ (MGM-1) শুরু হওয়া 'সখীসেনার ঢিবি' বা 'শশীসেনার পাঠশালা' —ইতিহাসের সাক্ষী এই বিশাল ঢিবির ওপর আজ দাঁড়িয়ে রয়েছে তরুণ সেবা সংঘ বা পাঠাগার ক্লাব ভবন।
কীভাবে যাবেন? (Travel Guide)
- সড়কপথে: কলকাতা থেকে দূরত্ব প্রায় ১৬৩ কিলোমিটার। কলকাতা–ভুবনেশ্বর জাতীয় সড়ক ধরে চলতে চলতে নেকুরসেনি (NSI) স্টেশন পার হওয়ার পর একটি ছোট্ট দিকনির্দেশক বোর্ড চোখে পড়বে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের নির্দেশ মেনে ডানদিকে মোড় নিলেই পৌঁছে যাবেন মোগলমারি প্রাচীন বৌদ্ধ মহাবিহার প্রাঙ্গণে।
- রেলপথে: হাওড়া থেকে খুব সকালে ধৌলি এক্সপ্রেস (১২৮২১) ধরুন। সকাল সোয়া আটটার দিকে বেলদা স্টেশনে নামুন। এছাড়া রূপসীবাংলা, আরণ্যক বা কবিগুরু এক্সপ্রেসেও আসা যায়। মেদিনীপুর শহর থেকে মোগলমারির দূরত্ব প্রায় ৬৩ কিলোমিটার। বেলদা থেকে বাস বা অটোতে মাত্র ১০ কিলোমিটার গেলেই গন্তব্য। একদিনে ফিরতে চাইলে বিকালের ধৌলি এক্সপ্রেসে ফিরতে পারেন।
উপসংহার: মোগলমারি আজ আর কেবল এক অখ্যাত গ্রাম নয়, এটি আমাদের শিকড়কে চেনার এক মাধ্যম। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে একসময় যে পবিত্র মহামন্ত্র ধ্বনিত হতো, তা আজও এই ধ্বংসাবশেষের ইটে ইটে মিশে আছে। আপনি কি আপনার পরবর্তী ছুটিতে ইতিহাসের এই রহস্যময় অধ্যায়টি দেখতে যাচ্ছেন? কমেন্টে আমাদের জানান!
মোগলমারি নিয়ে সাধারণ কিছু জিজ্ঞাসা
১. মোগলমারি আসলে ঠিক কোথায়? এর সঠিক লোকেশন কী? ▼
২. মোগলমারিকে কেন 'বাংলার নালন্দা' বলা হয়? ▼
৩. এখানে দেখার মতো বিশেষ কী কী আছে? ▼
৪. ভ্রমণের সেরা সময় কখন? এখানে কি টিকিট লাগে? ▼
© www.lalpecha.in | All Rights Reserved.
