নতুন বছরে পুরুলিয়ার ছৌ নাচ: বীর-রসের উৎসব
ভূমিকা: মাটির আকর্ষণ এবং বীরত্বের স্পিরিট —বাংলার লোকসংস্কৃতি তার নিজস্ব ঐতিহ্যে ও বৈচিত্র্যে অনন্য। আর সেই ঐতিহ্যের মুকুটে সবথেকে উজ্জ্বল মণিটি হলো পুরুলিয়ার ছৌ নাচ। ছৌ (Cho Dance বা Chhau Dance) কেবল একটি নৃত্য নয়, এটি একটি আদিবাসী যুদ্ধনৃত্য যা তার শক্তিশালী ভঙ্গি, নাটকীয় পরিবেশনা এবং পৌরাণিক গল্পের সংমিশ্রণে এক অনন্য শিল্পরূপ ধারণ করেছে।
ছৌ নাচের প্রকারভেদ ও ভৌগোলিক বিস্তার
ছৌ নৃত্য প্রধানত ভারতের তিনটি বিশেষ অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে প্রচলিত। এই তিন রাজ্যের সাংস্কৃতিক ধারায় ছৌ নাচের গুরুত্ব অপরিসীম। নৃতাত্ত্বিক বিচারে ছৌ নাচকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
- ✅ ১. পুরুলিয়া ছৌ: এর উৎপত্তিস্থল পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলা।
- ✅ ২. সরাইকেল্লা ছৌ: এর উৎপত্তিস্থল বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সরাইকেল্লা-খরসোয়া জেলার সদর শহর সরাইকেল্লা।
- ✅ ৩. ময়ূরভঞ্জ ছৌ: ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলায় এই শৈলী প্রচলিত (এখানে কোনো মুখোশ ব্যবহৃত হয় না)।
ঐতিহাসিকদের মতে, পুরুলিয়াই হলো ছৌ নাচের আদি জন্মভূমি। পুরুলিয়া ও সরাইকেল্লা ছৌ-তে বর্ণিল মুখোশ ব্যবহার করা হলেও ময়ূরভঞ্জ শৈলীতে শিল্পীরা তাদের সরাসরি মুখভঙ্গি ও দৈহিক ভাষার মাধ্যমে কাহিনী ফুটিয়ে তোলেন।
'ছৌ' নাচের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
অনেকেই সরাইকেল্লা ও ময়ূরভঞ্জ ছৌ-কে পৃথক না ভাবলেও, নৃতাত্ত্বিক ও শৈল্পিক বিচারে এর তিনটি স্বতন্ত্র ধারা বিদ্যমান। নিচে ছৌ নাচের এই বৈচিত্র্যময় রূপগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
পুরুলিয়া ছৌ
ভারী ও বাস্তবধর্মী মুখোশ ব্যবহার করে মহাকাব্যের নাটকীয় রূপায়ণ। এটি মূলত সাধারণ মানুষের দলীয় লোকনৃত্য যা মাটির কাছাকাছি এক জোরালো বহিঃপ্রকাশ।
সরাইকেল্লা ছৌ
প্রতীকী ও স্বপ্নিল মুখোশের মাধ্যমে সূক্ষ্ম শৈল্পিক উপস্থাপনা। রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই শৈলীটি আভিজাত্যপূর্ণ ও কাব্যিক একক নাচে রূপান্তরিত হয়েছে।
ময়ূরভঞ্জ ছৌ
এখানে কোনো মুখোশ ব্যবহৃত হয় না। মানবশরীরের নিখুঁত রণকৌশল, সামরিক প্রশিক্ষণের বিবর্তন এবং শৈল্পিক ক্ষিপ্রতাই এই শৈলীর মূল ভিত্তি।
পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়া ও ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য — ছৌ-নাচ গবেষণার একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র অধ্যাপক ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতো মহান গবেষকের কথায়, এটি হলো পুরুলিয়ার মানুষের জীবন-সংগ্রাম, তাদের আদিম সংস্কৃতি এবং বীর-রসের এক জীবন্ত রূপ। ১৯৬১ সালে প্রথমবার পুরুলিয়ার একটি প্রান্ত-গ্রামে এই নাচ দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন এবং এর 'নভেল্টি' বা অনন্যতা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল।
কিংবদন্তি শিল্পী পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়া: পুরুলিয়ার গর্ব।
'ছৌ' শব্দের ব্যুৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিবর্তন
ছৌ নৃত্যের নামের উৎপত্তি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য রয়েছে। ড. পশুপতি প্রসাদ মাহাতো ও ড. সুধীর করণ-এর মতে এই নাচের নাম “ছো”। অন্যদিকে বিভূতিভূষণ দাশগুপ্ত ও ড. বঙ্কিমচন্দ্র মাহাতো মনে করেন, এই নাচের নাম “ছ”। পরবর্তীকালে ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য সর্বপ্রথম “ছৌ” শব্দটি ব্যবহার করেন।
'ছৌ' শব্দের উৎপত্তি নিয়ে পণ্ডিতদের মতে, এটি সংস্কৃত 'সং' (Saṅga) শব্দ থেকে এসেছে। আবার অনেকে মনে করেন 'ছায়া' (Shadow) বা 'ছাউনি' (Military Camp) থেকে এর উদ্ভব।
পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়া: ছৌ নাচের এক কালজয়ী শিল্পীর জীবনগাথা ➜
ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য ও ছৌ নাচের বিশ্বজয়
- পুনর্জাগরণ: হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্পকে তিনি গ্রাম্য উৎসব থেকে তুলে আনেন।
- দিল্লির মঞ্চ: ১৯৬৮ সালে সংগীত নাটক একাডেমির মাধ্যমে দিল্লিতে প্রথম প্রদর্শনী।
- একাডেমিক স্বীকৃতি: রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি।
নৃতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট ও জনজাতির অবদান
ওস্তাদের ভূমিকা
মুড়া ও ভূমিজ সম্প্রদায়ের ওস্তাদরা বংশপরম্পরায় প্রায় ৫-৬ প্রজন্ম ধরে এই নাচের শিক্ষা দিচ্ছেন। এটি তাদের কাছে কেবল জীবিকা নয়, এক পবিত্র ধর্মীয় আচার।
ব্রাহ্মণ্য প্রভাব ও হিন্দু পুরাণ
বাঘমুন্ডি ও চোরদার রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এতে রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের কাহিনী যুক্ত হয়ে একে এক সমৃদ্ধ লোকনাট্যে পরিণত করেছে।
পুরুলিয়ার চারিদা গ্রাম: ছৌ মুখোশ তৈরির স্বর্গরাজ্য।
মুখোশের জাদু ও চারিদা গ্রামের শিল্পীরা
- 🎭 বাস্তবধর্মী মুখভঙ্গি: পুরুলিয়ার মুখোশগুলো অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও নাটকীয়।
- 🎭 চারিদা গ্রাম: বাঘমুন্ডি ব্লকের এই গ্রামটিই ছৌ মুখোশের মূল কেন্দ্র।
- 🎭 সজ্জার কারুকাজ: পুঁতি, জরি ও শোলার নিখুঁত কাজ রাতের আলোয় অনন্য দেখায়।
বাদ্যযন্ত্র ও সংগীতের মূর্ছনা
ধামসা, ঢোল এবং শানাই—এই তিনের সংমিশ্রণে এক উন্মাদনাময় পরিবেশ তৈরি হয়। ধামসা ও ঢোল রণ-বাদ্য হিসেবে উত্তেজনা বাড়ায় এবং শানাই কাহিনীর আবেগ প্রকাশ করে।
ইউনেস্কো স্বীকৃতি ও বর্তমান প্রেক্ষিত
ইউনেস্কো (UNESCO) ছৌ নাচকে 'Intangible Cultural Heritage of Humanity' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমান যুগে পর্যটনের কল্যাণে শিল্পীরা খ্যাতি পেলেও এই আদি রূপটি টিকিয়ে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।
লাল মাটির টান ও অবিনশ্বর লোকগাথা
নদীয়া জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে আমার বাড়ি। সেখান থেকেই ২০২২ সালে বন্ধুদের নিয়ে পুরুলিয়ার পথে পা বাড়িয়েছিলাম। তিন বন্ধু—অসীম, কৌশিক, সাগর আর আমি, হারু কাকার গাড়িতে চড়ে ঘুরেছিলাম সেই লাল মাটির দেশ। ভ্রমণের সেরা প্রাপ্তি ছিল 'ছৌ' নাচ। শিল্পীরা যখন বীরত্বের মুদ্রায় লাফিয়ে ওঠেন, তখন মনে হয় যেন পুরুলিয়ার মাটি কথা বলছে। এটি কেবল বিনোদন নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও সংগ্রামের এক অদম্য প্রতিচ্ছবি।
