পুরুলিয়ার ছৌ-নৃত্য ও পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়া
পুরুলিয়ার মাটি আর মানুষের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ছৌ-নৃত্য। আর এই লোকশিল্পের নাম নিলেই যার প্রতিচ্ছবি সবার আগে ভেসে ওঠে, তিনি হলেন কিংবদন্তী শিল্পী গম্ভীর সিং মুড়া। চরম দারিদ্র্য আর সামাজিক প্রতিকূলতাকে জয় করে কীভাবে একজন ভূমিহীন আদিবাসী ঘরের সন্তান 'পদ্মশ্রী' সম্মানে ভূষিত হলেন, সেই সংগ্রামের ইতিহাস আজ বাঙালির গর্বের আখ্যান। আজকের আমি এই ব্লগের মাধ্যমে জানাবো আপনাদের, এই মহান শিল্পীর জীবন ও ছৌ-নৃত্যের ঐতিহ্যে তাঁর অনবদ্য অবদানের কথা।
জন্ম ও শৈশব: সংগ্রামের এক ভিন্ন প্রেক্ষাপট
গম্ভীর সিং মুড়ার জন্ম ১৯৩০ সালের ২রা মার্চ, তৎকালীন অবিভক্ত মানভূম জেলার (বর্তমান পুরুলিয়া জেলা) পিটিদিরি গ্রামে তাঁর মামার বাড়িতে। তাঁর পিতা জিপা সিং মুড়া ছিলেন একজন ছৌ-নৃত্যশিল্পী এবং ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক। শৈশব ছবিতে গম্ভীর সিং-এর ডাকনাম ছিল ‘বাবু’।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে গম্ভীর সিং পিতৃহীন হন। বাবার অকাল মৃত্যুতে পরিবারটি একেবারে ভেঙে পড়ে। অভাবের তাড়নায় তিনি তাঁর পৈতৃক ভিটে বাঘমুন্ডির চড়িদা গ্রামে ফিরে আসেন। শৈশব থেকেই তাঁকে পেটের তাগিদে গরু চরানো, বন-জঙ্গলে শিকার করা এবং ছোটখাটো দিনমজুরের কাজ করতে হতো। কিন্তু এই হাড়ভাঙা খাটুনিও তাঁর অন্তরের শিল্পীসত্তাকে দমাতে পারেনি।
মুরা সম্প্রদায়ের ভূমিকা ও ছৌ-নৃত্যের শিকড়
পুরুলিয়ার ছৌ-নৃত্যে মুরা (বা মুন্ডা) সম্প্রদায়ের অবদান ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। এই সম্প্রদায় ছৌ-নৃত্যকে কেবল একটি শিল্প হিসেবে নয়, বরং তাদের জীবনচর্চার অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে।
- ওস্তাদ হিসেবে মুরাদের অবস্থান: অনেক ক্ষেত্রে এই সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরাই ছৌ-নৃত্যের প্রশিক্ষক বা ‘ওস্তাদ’ হিসেবে কাজ করেন। প্রথাগত শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও বংশপরম্পরায় তারা রামায়ণ, মহাভারত এবং ভারতীয় ধ্রুপদী মহাকাব্যের কাহিনিগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তোলেন।
- সংস্কৃতি রক্ষা ও ত্যাগ: মুরা সম্প্রদায় আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকলেও, তাদের কষ্টার্জিত সামান্য অর্থ সঞ্চয় করে ছৌ-নৃত্যের দল পরিচালনা করে। বাঘমুন্ডি এলাকাটি এদের প্রধান বসতি, যেখানে প্রাচীন মেগালিথিক যুগের নিদর্শনের পাশাপাশি আজও এই জীবন্ত সংস্কৃতি টিকে আছে।
নৃত্যজীবনের শুরু: প্রকৃতিই যখন প্রধান গুরু
গম্ভীর সিং মুড়ার নাচের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না। তাঁর প্রথম পাঠশালা ছিল অযোধ্যা পাহাড়ের ঘন জঙ্গল। গরু চরাতে গিয়ে তিনি বনের পশুপাখির অঙ্গভঙ্গি—তাদের লাফানো, দৌড়ানো বা আক্রমণের মুদ্রাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। বাবার কাছ থেকে পাওয়া প্রাথমিক শিক্ষার সাথে প্রকৃতির এই অনুকরণ মিলিয়ে তিনি তৈরি করেন তাঁর নিজস্ব ঘরানা। গম্ভীর সিং মুড়া ছিলেন ছৌ-নৃত্যের অত্যন্ত জটিল ভঙ্গি ‘উলফা বাজি’-র জনক, যা এই নাচকে এক উচ্চমাত্রার শিল্পে পরিণত করে।
ছৌ-নৃত্যের প্রতি অটল অঙ্গীকার
১৯৫৬ সালে এক মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি লহরিয়া শিবমন্দিরে দীর্ঘ তিন মাস উপবাস ও প্রার্থনা করেন। রোগমুক্তির পর তিনি এক পবিত্র প্রতিজ্ঞা করেন—প্রতি বছর চৈত্র মাসে চড়ক উৎসবে লহরিয়ার শিবমন্দির প্রাঙ্গণে তিনি ছৌ-নৃত্য পরিবেশন করবেন। আমৃত্যু তিনি এই অঙ্গীকার রক্ষা করে গেছেন। বর্তমানে তাঁর পুত্র সুকুমার মুড়াও এই ধারা নিষ্ঠার সঙ্গে বহন করছেন।
পুরুলিয়ার প্রান্তিক লোকসংস্কৃতি ছৌ-নৃত্যকে বিশ্বমঞ্চে অমর করার পিছনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র-অধ্যাপক ও বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি গবেষক ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯ মে ১৯৬১ সালে বাঘমুন্ডিতে প্রথমবার গম্ভীর সিং মুড়ার নাচ দেখে তিনি মুগ্ধ হন। এরপর তাঁরই একক প্রচেষ্টায় গম্ভীর সিং মুড়ার হাত ধরে এই বীররসাত্মক নাচ প্রথমবারের মতো বিদেশের মাটি স্পর্শ করে এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে।
মুরা শিল্পীদের বীরত্বপূর্ণ মুদ্রা, রণভঙ্গি এবং মাটির তৈরি উজ্জ্বল রঙিন মুখোশের ব্যবহার পাশ্চাত্য বিশ্বের দর্শকদের কাছে এক বিস্ময়কর শিল্প রূপ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। গম্ভীর সিং মুড়ার এই বিশ্বজয়ের ফলেই পুরুলিয়ার ছৌ আজ UNESCO-র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নিতে পেরেছে।
পদ্মশ্রী ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননা
শিল্পের প্রতি তাঁর এই অসামান্য ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে একাধিক শীর্ষ সম্মানে ভূষিত করে:
- পদ্মশ্রী (১৯৮১): তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডি তাঁকে এই রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করেন।
- সঙ্গীত নাটক আকাদেমি (১৯৮২): রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জেল সিং-এর হাত থেকে তিনি এই বিরল সম্মাননা গ্রহণ করেন।
- স্মারক ডাকটিকিট (২০২৩): ২০২৩ সালে ভারতীয় ডাক বিভাগ (India Post) তাঁর স্মরণে একটি বিশেষ ডাকটিকিট প্রকাশ করে।
ছৌ মূলত একটি আদিবাসী যুদ্ধনৃত্য (War Dance)। এটি কোনো সাধারণ নাচ নয়, বরং লড়াইয়ের মুদ্রা আর পৌরাণিক কাহিনির এক অদ্ভুত মিশেল। ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশনের ধরন অনুযায়ী এটি প্রধানত তিনটি ধারায় বিভক্ত:
পুরুলিয়া ছৌ হলো অত্যন্ত তেজস্বী এবং বীররসাত্মক। এর প্রধান আকর্ষণ হলো বিশাল ও কারুকার্যময় মুখোশ। চড়িদা গ্রামের সূত্রধর শিল্পীদের হাতে তৈরি এই মুখোশ পরে যখন শিল্পীরা মঞ্চে লাফিয়ে পড়েন (যাকে 'উলফা বাজি' বলা হয়), তখন দর্শকদের মনে এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি হয়। এটি মূলত তান্ডব নৃত্যের একটি রূপ যেখানে রামায়ণ-মহাভারতের যুদ্ধগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে।
ঝাড়খণ্ডের সরাইকেলা ধারায় মুখোশ ব্যবহার করা হলেও এর গতি কিছুটা ধীর এবং লাবণ্যময়। এখানে শিল্পীর শারীরিক মুদ্রার চেয়ে মুখের মুখোশটিই বেশি কথা বলে। এই ঘরানায় চরিত্রের গভীরতা এবং দার্শনিক ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। এটি রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিকশিত হওয়ার কারণে এর মধ্যে এক ধরণের ধ্রুপদী গাম্ভীর্য লক্ষ করা যায়।
ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ ঘরানার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এখানে কোনো মুখোশ ব্যবহার করা হয় না। মুখোশ না থাকায় শিল্পীকে তাঁর মুখভঙ্গি এবং শরীরের প্রতিটি পেশির নিখুঁত সঞ্চালনের মাধ্যমে যুদ্ধের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে হয়। এটি মূলত একটি মার্শাল আর্ট বা রণকৌশল নির্ভর নাচ যা ওড়িশার পাইক যোদ্ধাদের ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে।
শেষ জীবন: এক করুণ বিদায়
দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মান ও পুরস্কার অর্জন করলেও গম্ভীর সিং মুড়ার ব্যক্তিগত জীবন ছিল দারিদ্র্যক্লিষ্ট। শিল্পীর জীবনের শেষ পর্বে অর্থাভাবের মধ্যে দিন কাটাতে হয় তাঁকে। ২০০২ খ্রিষ্টাব্দের ১লা নভেম্বর কলকাতায় তাঁর চোখের অপারেশন হয়। অপারেশনের পর চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।
৯ই নভেম্বর, ৩১৫ আপ হাওড়া–চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার (18011 HWH–CKP EXP.) ট্রেনে তিনি হাওড়া থেকে পুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু সেই যাত্রাপথেই, ট্রেনের মধ্যেই আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নিজ জেলার মাটিতে ফিরে যাওয়ার গভীর আকাঙ্ক্ষা লালন করেছিলেন। ছৌ-নৃত্যের এই কিংবদন্তি শিল্পীর প্রয়াণে ভারতের লোকসংস্কৃতি এক অমূল্য রত্নকে চিরতরে হারাল।
উপসংহার
সত্যি বলতে, ছৌ নৃত্যের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ২০২২ সালের জানুয়ারির এক সন্ধ্যায়, চলন্ত রাস্তার ধারে একটি মাঠে। গাড়ি চালক হারুকাকার কাছে গাড়ি থামাতে বলেই , সেইদিন সেই নাচ দেখা। সেখানেই বারবার কানে আসছিল এক নাম—ছৌ-সম্রাট পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়া। ক্লান্ত শরীরে, বেস্ত মস্তিষ্ক তখন গুরুত্ব না দিলেও, রাতে হোটেলের ঘরে ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে বুঝতে পারি—তিনি শুধু একজন নৃত্যশিল্পী নন, বাংলার লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত ইতিহাস। তারপর বাড়ি ফিরে লাইব্রেরির পথ ধরা। লোকসংস্কৃতির নেশা তখন মনে পাকাপাকি।
পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়া কেবল একজন নৃত্যশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলার মাটির সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। তাঁর জীবন প্রমাণ করে যে, অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে চরম দারিদ্র্যকেও হার মানানো যায়। আজ তাঁরই অবদানে পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রাম ‘মুখোশ-গ্রাম’ হিসেবে বিশ্ববিখ্যাত। আগামী প্রজন্মের কাছে গম্ভীর সিং মুড়া এবং মুরা সম্প্রদায়ের এই ত্যাগ এক অমূল্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।
পুরুলিয়া এবং কিংবদন্তি শিল্পী গম্ভীর সিং মুড়ার গ্রাম চড়িদা ভ্রমণ করতে চাইলে নিচের তথ্যটি আপনাকে সাহায্য করবে:
কলকাতা থেকে পুরুলিয়া পৌঁছাতে ট্রেনভেদে ন্যূনতম সময় লাগে প্রায় ৫ ঘণ্টা ২৫ মিনিট।
কলকাতা থেকে পুরুলিয়া: ট্রেন গাইড ও ভ্রমণ গাইড ২০২৬
পাহাড় আর লাল মাটির দেশে আপনার যাত্রাকে সহজ করতে ইন্ডিয়া রেল ইনফো (IndiaRailInfo) অনুযায়ী ট্রেনের সঠিক সময়সূচী এবং আমার ব্যক্তিগত টিপস নিচে দেওয়া হলো।
| ট্রেন ও নম্বর | উৎস | ছাড়ার সময় | পৌঁছানোর সময় | চলার দিন |
|---|---|---|---|---|
| Rupasi Bangla (12883) | SRC | 06:30 AM | 12:05 PM | রোজ |
| HWH Ranchi Intercity (22891) | HWH | 12:50 PM | 06:30 PM | রোজ |
| Vande Bharat (20897) | HWH | 02:35 PM | 07:23 PM | রোজ (শনি বাদে) |
| HWH Purulia SF (12827) | HWH | 04:50 PM | 10:40 PM | রোজ |
| Chakradharpur Exp (18011) | HWH | 11:30 PM | 06:25 AM | রোজ |
আমি নিজে চক্রধরপুর এক্সপ্রেসে (18011) পুরুলিয়া ভ্রমণ করেছি। এই ট্রেনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি রাতভর চলে। রাত ১১:৩০-এ হাওড়া থেকে ছেড়ে এটি ভোর ৬:২৫-এ পুরুলিয়া পৌঁছায়। ট্রেনের মৃদু দুলুনিতে চমৎকার ঘুম শেষে ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় স্টেশনে নামার অভিজ্ঞতা দারুণ! এতে আপনার পুরো দিনটি ঘোরার জন্য বাঁচে।

IRCTC Connect
Railone