ইতিহাসের পাতা থেকে: কেন গড়ে উঠেছিল শিবনিবাস?
শিবনিবাসের ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের নাম। কিন্তু কেন তিনি কৃষ্ণনগর ছেড়ে এখানে রাজধানী স্থাপন করেছিলেন? এই নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে:
বর্গি আক্রমণ থেকে সুরক্ষা: দেওয়ান কার্তিকেয় চন্দ্র রায়ের মতে, ১৭৪২ সাল নাগাদ বাংলায় মারাঠা বা বর্গি হামলা শুরু হয়। নিজের পরিবার ও ধনরত্ন রক্ষা করতে মহারাজ কৃষ্ণনগর থেকে দূরে নির্জন এলাকায় চূর্ণি ঘেরা এই স্থানে সুরক্ষিত রাজধানী স্থাপন করেন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মৃগয়া: রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়ের মতে, মহারাজ একবার এখানে শিকার বা মৃগয়া করতে এসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন এবং রাজপ্রাসাদ নির্মাণের আদেশ দেন।
ডাকাত দমন: লোকশ্রুতি আছে, এখানে নসরত খাঁ নামে এক দুর্ধর্ষ ডাকাত সর্দার থাকতো। তাকে দমন করতে মহারাজ এখানে সসৈন্যে শিবির স্থাপন করেছিলেন। পরে এক শুভলগ্নে নদীর রুই মাছ তাঁর সামনে লাফিয়ে পড়লে তিনি এটিকে শুভ লক্ষণ মনে করে বসতি স্থাপন করেন।
নামকরণ: অনেকের মতে মহারাজের জ্যেষ্ঠ পুত্র শিবচন্দ্রের নামানুসারে এর নাম শিবনিবাস। আবার কারো মতে, এখানে অসংখ্য শিব মন্দির থাকায় এই নামকরণ।
শিবনিবাসের স্থাপত্য ও বিস্ময়কর মন্দিরসমূহ
শিবনিবাসকে বলা হয় 'দ্বিতীয় কাশী'। এখানকার মন্দিরগুলোর স্থাপত্যশৈলী বাংলার সাধারণ মন্দির থেকে অনেকটাই আলাদা। এখানে মূলত চারটি প্রধান মন্দির আজও টিকে আছে।
১. রাজ রাজেশ্বর শিব মন্দির (বুড়ো শিব)
এটি শিবনিবাসের প্রধান আকর্ষণ। বাংলার ইতিহাসে এত উঁচু প্রাচীন মন্দির খুব কমই দেখা যায়।
উচ্চতা: প্রায় ১২০ ফুট।
স্থাপত্য: এটি অষ্টকোণাকৃতি এবং এর শিখরটি ছত্রাকার। এর গায়ে গথিক ও মুসলিম স্থাপত্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
বিস্ময়: মন্দিরের ভেতরে রয়েছে ৯ ফুট উঁচু এক বিশাল কালো পাথরের শিবলিঙ্গ। বলা হয়, পূর্ব ভারতে এত বড় শিবলিঙ্গ আর কোথাও নেই। ১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
২. রাজ্ঞীশ্বর শিব মন্দির
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের দ্বিতীয় মহিষী ১৭৬২ সালে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ৬০ ফুট উঁচু এই চারচালা মন্দিরে রয়েছে সাড়ে সাত ফুট উচ্চতার শিবলিঙ্গ।
৩. রাম-সীতা মন্দির
চূর্ণি নদীর বাঁশের সেতু পেরিয়ে প্রবেশ করলে প্রথমেই পড়ে এই মন্দিরটি।
বিশেষত্ব: মন্দিরের গর্ভগৃহে কালো পাথরের রামচন্দ্র ও সীতাদেবীর মূর্তি রয়েছে। তবে মজার বিষয় হলো, শ্লোক বা লিপিতে লক্ষ্মণের উল্লেখ থাকলেও মন্দিরে তাঁর কোনো মূর্তি নেই।
স্থাপত্য: এটি চারচালা মন্দির হলেও এর মিনারের মাথায় আরবীয় স্থাপত্যের ছোঁয়া রয়েছে।
৪. শীতলা মায়ের মন্দির
রাম-সীতা মন্দিরের আদলে তৈরি এই ছোট মন্দিরটিতে শীতলা মায়ের এক দুর্লভ পাথরের মূর্তি আছে। সাধারণত শীতলা মায়ের মূর্তি পাথরের হয় না, যা এখানকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বর্তমান অবস্থা ও হারিয়ে যাওয়া গৌরব
একসময় এখানে মহারাজ ১০৮টি মন্দির তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন (যদিও কেউ কেউ মনে করেন ৪টিই প্রধান ছিল)। বর্তমানে রাজপ্রাসাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। বিখ্যাত পর্যটক রেভারেন্ড হিবার ১৮২৪ সালে এখানে এসে এখানকার প্রবেশদ্বারকে রাশিয়ার 'ক্রেমলিন' এবং প্রাসাদের শৈলীকে 'কনওয়ে কাসল'-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। আজ সেই জৌলুস নেই, কিন্তু চূর্ণি নদীর শান্ত বহমানতা আজও সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়।
ভ্রমণ গাইড: কীভাবে যাবেন?
শিবনিবাস ভ্রমণ এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ।
ট্রেনে: শিয়ালদহ স্টেশন থেকে গেদে লোকাল ট্রেনে উঠে মাজদিয়া বা তারকনগর স্টেশনে নামতে হবে (দূরত্ব প্রায় ১০৭ কিমি)। স্টেশন থেকে অটো বা বাসে ৪ কিলোমিটার পথ গেলেই মন্দির প্রাঙ্গণ।
বাসে: কৃষ্ণনগর থেকে মাজদিয়াগামী বাসে চেপে শিবনিবাসে নামা যায় (দূরত্ব প্রায় ২৬ কিমি)।
থাকা-খাওয়া: বর্তমানে পর্যটকদের জন্য এখানে 'চূর্ণি রিসর্ট', 'কৈলাস লজ' সহ বেশ কিছু লজ গড়ে উঠেছে। মন্দিরে ভোগের ব্যবস্থাও রয়েছে।
ভোগ ও পূজা:
মন্দির প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে। খিচুড়ি, ভাজা, পায়েস ও চাটনি সহযোগে সুস্বাদু ভোগের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ভোগের জন্য অন্তত ৪ দিন আগে মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়।
প্রয়োজনীয় তথ্য: বর্তমান প্রধান পুরোহিত স্বপন ভট্টাচার্য (মোবাইল: ৯৭৩২৭২৬৩২১)। তাঁর পরিবার গত ১৫০ বছর ধরে এই মন্দিরের সেবায় নিয়োজিত।
মেলা ও উৎসব
শিবনিবাসের প্রাণ হলো এর উৎসবগুলো:
ভীম একাদশীর মেলা: মাঘ মাসে ১৮ দিন ধরে চলা এই মেলাটি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমল থেকেই হয়ে আসছে। এটিই এখানকার সবচেয়ে বড় উৎসব।
শ্রাবণী মেলা: শ্রাবণ মাসের প্রতি সোমবার ভক্তরা নবদ্বীপ থেকে হেঁটে এসে চূর্ণি নদীর জল শিবের মাথায় ঢালেন।
রামনবমী ও গাজন: চৈত্র মাসে রামনবমী এবং শিবের গাজন ধুমধাম করে পালিত হয়।
শিবনিবাসের কৃতি সন্তানরা
শুধু মন্দির নয়, এই মাটি জন্ম দিয়েছে অনেক গুণী মানুষকে। রবীন্দ্রনাথের সংগীত শিল্পী চিত্তপ্রিয় মুখোপাধ্যায়, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী গীতা মুখোপাধ্যায়, এমনকি 'বঙ্গবাসী' পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম এই গ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত।
উপসংহার
আজকের যান্ত্রিক জীবনে একদিনের জন্য ইতিহাসের নিঃশ্বাস নিতে চাইলে শিবনিবাস আপনার সেরা গন্তব্য হতে পারে। চূর্ণি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে যখন সুউচ্চ শিব মন্দিরের দিকে তাকাবেন, তখন মনে হবে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে ১৭৪২ সালে। রাজপ্রাসাদ নেই, কিন্তু বাতাসের ফিসফিসানি আজও মহারাজের সেই হারানো রাজধানীর কথা বলে যায়।
আপনি কি শিবনিবাস ভ্রমণে যেতে চান? অথবা আপনার কোনো অভিজ্ঞতা আছে? কমেন্ট বক্সে আমাদের জানান!


We welcome thoughtful discussions. Comments are moderated for quality