রাণাঘাটের সিদ্ধেশ্বরী মন্দির: রণা ডাকাত নাকি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র—কার হাতে এই দেবীর প্রতিষ্ঠা?

রাণাঘাটের সিদ্ধেশ্বরী মন্দির: রণা ডাকাত নাকি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র—কার হাতে এই দেবীর প্রতিষ্ঠা?

লালপেঁচা (LalPecha.in)
0
রাণাঘাটের ঐতিহাসিক সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির যেখানে ইতিহাস ও লোকশ্রুতি মিলেমিশে এক হয়ে গেছে
রাণাঘাটের সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির: লোকশ্রুতি বনাম ইতিহাসের এক অমীমাংসিত অধ্যায়

রাণাঘাটের সিদ্ধেশ্বরী মন্দির: রণা ডাকাত না মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র? ইতিহাসের প্রকৃত সত্য

বাঙালি সংস্কৃতিতে ইতিহাস এবং লোকশ্রুতি অনেক সময় মিলেমিশে এক হয়ে যায়। নদীয়া জেলার রাণাঘাটের সিদ্ধেশ্বরী মন্দির তেমনই এক অমীমাংসিত রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু। যুগ যুগ ধরে মানুষ বিশ্বাস করে আসছেন যে, এই মন্দির ডাকাত সর্দার রণা বা রাণা ডাকাতের হাতে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বর্তমান সময়ের ঐতিহাসিক গবেষণা, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ এক সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অধিকতর শক্তিশালী সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।

আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব কেন সিদ্ধেশ্বরী মন্দির রণা ডাকাতের নয়, বরং নদীয়ারাজ মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের এক অক্ষয় কীর্তি।

১. রণা ডাকাত ও 'জড়ানেতলা': লোকশ্রুতির অসারতা

সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে বর্তমান রাণাঘাটের নাম ছিল 'জড়ানেতলা'। লোককথা অনুযায়ী, রণা ডাকাত এই নির্জন স্থানে একটি মাটির কালী মূর্তি গড়ে পূজা করতেন। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ জানায়:

  • সময়কালের গরমিল: রণা ডাকাত বা রাণা ডাকাতের সক্রিয় সময়কাল ছিল নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের পিতা রঘুনাথের সমসাময়িক (১৭১৫-১৭২৮ খ্রিষ্টাব্দ)। অন্যদিকে, বর্তমান সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস আরও পরবর্তী সময়ের।
  • জনবসতির অস্তিত্ব: ডাকাতরা সাধারণত নির্জন জঙ্গল বা পরিত্যক্ত স্থানে ঘাঁটি গড়ে। কিন্তু ঐতিহাসিক নথিপত্র বলছে, ৩০০ বছর আগেও সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের আশেপাশের অঞ্চলে তেলী, ব্রাহ্মণ এবং ঘোষ সম্প্রদায়ের ঘন বসতি ছিল।
  • প্রাচীন পূজাগুলোর সাক্ষ্য: মন্দিরের নিকটেই ১১৫৩ বঙ্গাব্দে (অর্থাৎ প্রায় ২৬১ বছর আগে) দে চৌধুরী বাড়িতে দুর্গাপূজা শুরু হয়। এছাড়া শর্মা বাড়ির দুর্গাপূজা (যাকে স্থানীয়রা 'বুড়োমা' বলেন) এবং ঘোষেদের দুর্গাপূজা প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, সেই সময় এটি কোনো নির্জন জঙ্গল ছিল না, বরং একটি সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। এমন জনবহুল এলাকায় কোনো ডাকাত সর্দারের স্থায়ী আস্তানা বা মন্দির থাকা প্রায় অসম্ভব।
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের স্বপ্নাদেশে প্রতিষ্ঠিত নদিয়ার সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের ঐতিহাসিক দৃশ্য
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের স্বপ্নাদেশে প্রতিষ্ঠিত নদিয়ার সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের ঐতিহাসিক দৃশ্য

২. মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের স্বপ্নাদেশ ও মন্দিরের পত্তন

সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের প্রকৃত গোড়াপত্তন হয় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের হাত ধরে। এর পেছনে রয়েছে এক রাজকীয় ইতিহাস:

  • বিগ্রহের অনুসন্ধান: জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক তথ্যমতে, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র চূর্ণী নদী দিয়ে যাতায়াতের সময় স্বপ্নাদেশ পান যে, এই অঞ্চলে একটি মহাশক্তি কালীমূর্তি পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। মহারাজ সেই মূর্তি উদ্ধার করেন এবং তাঁর নিত্যপূজার ব্যবস্থা করেন।
  • বংশপরম্পরায় সেবায়েত: মহারাজ এই দেবীর সেবার ভার অর্পণ করেন বর্ধমান নিবাসী রামগোপাল গঙ্গোপাধ্যায় নামক এক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পরিবারের ওপর। প্রখ্যাত লেখক দীপ্তিময় রায় তাঁর 'পশ্চিমবঙ্গের কালী ও কালীক্ষেত্র' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রই এই দেবীর নামকরণ করেছিলেন 'সিদ্ধেশ্বরী'। কারণ তিনি মনে করতেন এই দেবী সকল কাজে সিদ্ধি প্রদান করেন।
  • মূর্তির বিবর্তন: শুরুতে মূর্তিটি ছিল মৃন্ময়ী বা মাটির। পরবর্তীকালে কোনো এক 'উন্মাদ সাহেব' মন্দিরে প্রবেশ করে বিগ্রহ স্পর্শ করলে, তৎকালীন রক্ষণশীল পণ্ডিত সমাজ শুচিতা রক্ষার্থে সেটি বিসর্জন দেন। বর্তমানের কষ্টিপাথরের মূর্তিটি সেবায়েত প্রমথ গাঙ্গুলী তাঁর গুরু বালানন্দ ব্রহ্মচারীর সহায়তায় কাশী থেকে সংগ্রহ করে আনেন।

৩. স্থাপত্যের ইতিহাস: পালচৌধুরী ও কুণ্ডু পরিবারের অবদান

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেও, আজকের যে বিশাল দালান ও নাটমন্দির আমরা দেখি, তা বিভিন্ন সময়ে ভক্ত ও জমিদারদের আর্থিক সহায়তায় নির্মিত হয়েছে:

  • দালান মন্দির: রাণাঘাটের বিখ্যাত জমিদার ব্রজনারায়ণ পালচৌধুরী এই মন্দিরের দালান অংশটি নির্মাণ করে দেন।
  • নাটমন্দির: ১৩০২ বঙ্গাব্দে রাজনারায়ণ কুণ্ডুর ভ্রাতৃজায়া ইচ্ছাময়ী দাসী বর্তমানের সুদৃশ্য নাটমন্দিরটি তৈরি করান।
রাণাঘাট সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের বর্তমান স্থাপত্য ও নাটমন্দিরের দৃশ্য
রাণাঘাটের রণা ডাকাতের কীর্তি বহনকারী সিদ্ধেশ্বরী মন্দির

৪. রণা ডাকাতের প্রকৃত আস্তানা কোথায় ছিল? (ফিল্ড সার্ভে রিপোর্ট)

আমার সাম্প্রতিক ফিল্ড সার্ভে এবং প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে। রণা ডাকাতের প্রকৃত আস্তানা 'জড়ানেতলা' বা বর্তমান সিদ্ধেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে ছিল না। এর প্রমাণ পাওয়া যায় রাণাঘাটের হিজুলী পঞ্চায়েতের অন্তর্গত হালালপুরে

  • প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন: প্রায় ১০ বছর আগে কৃষ্ণনগর-রাণাঘাট রেললাইন স্থাপনের সময় হালালপুরে মাটি খুঁড়তে গিয়ে প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। সেখানে ৪-৬ ইঞ্চির পাতলা পোড়া মাটির ইট এবং অপূর্ব টেরাকোটা কাজ দেখা গেছে।
  • কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ: খননকার্যের সময় একটি বিশাল কালো কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ পাওয়া যায়, যার গঠনশৈলী মাজদিয়ার শিবলিঙ্গের মতো। এই লিঙ্গের প্রাচীনত্ব এবং ইটের গঠন বলে দেয় যে এটি ৩০০-৩৫০ বছর আগের, যা রণা ডাকাতের সময়কালের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
  • ভৌগোলিক অবস্থান: হালালপুর অঞ্চলটি চূর্ণী নদীর পাশে হলেও এটি অত্যন্ত উঁচু স্থান ছিল। ৮০-৯০ বছর আগেও এই অঞ্চলটি বাঘের বসতিপূর্ণ গভীর জঙ্গলে ঢাকা ছিল। ডাকাতদের জন্য এমন একটি 'বন্যা-মুক্ত' এবং 'দুর্গম' স্থানই ছিল আদর্শ আস্তানা। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এখানে চাষের সময় আজও প্রাচীন তলোয়ার বা রামদার ভাঙা অংশ পাওয়া যায়।

সুতরাং, এই দিকটি বিবেচনায় নিলে স্পষ্টভাবে বলা যায় যে ‘রণা ডাকাত’-এর আস্তানা ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত গোপন মন্দির হালালপুরেই ছিল, —এই সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেওয়া যায়, আপনাদের কি মত।


৫. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কেন কৃষ্ণচন্দ্র এখানে মন্দির গড়লেন?

তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, বর্গী আক্রমণের ভয়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর রাজধানী শিবনিবাসে স্থানান্তরিত করেছিলেন। চূর্ণী নদী ছিল তাঁর যাতায়াতের প্রধান জলপথ।
১. নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি: এই জলপথকে নিরাপদ করতে এবং জনপদকে সুরক্ষিত রাখতে তিনি বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও বসতি স্থাপন করেছিলেন।
২. আধ্যাত্মিক কারণ: মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন পরম তান্ত্রিক। চূর্ণী নদীর তীরে 'হরধাম' ও 'আনন্দধাম' প্রতিষ্ঠা করে তিনি তন্ত্রসাধনা করতেন। সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরও ছিল তাঁর সেই বিশাল আধ্যাত্মিক পরিকল্পনার একটি অংশ।

৬. যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ: মাটির প্রতিমা vs সময়

একটি সাধারণ মাটির প্রতিমা (মৃন্ময়ী) কোনো আচ্ছাদন ছাড়া খোলা আকাশের নিচে ১৫-২০ বছর টিকে থাকা অসম্ভব। রণা ডাকাতের সময়কাল (১৭১৫ খ্রি.) এবং মহারাজের মন্দির সংস্কারের সময়ের (১৭৪০ খ্রি.) মধ্যে দীর্ঘ ব্যবধান রয়েছে। তাই যে মূর্তিটি মহারাজ উদ্ধার করেছিলেন, সেটি রণা ডাকাতের হওয়া প্রায় অসম্ভব। বরং সেটি স্থানীয় কোনো ব্রাহ্মণ বা কায়স্থ পরিবারের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ছিল, যা পরে মহারাজ রাজকীয় রূপ দান করেন।


উপসংহার

ইতিহাস কেবল গল্পের ওপর ভিত্তি করে চলে না, ইতিহাস চলে তথ্যের ওপর। আমাদের আলোচনার ভিত্তিতে এটি পরিষ্কার যে:

  • সিদ্ধেশ্বরী দেবী মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত এবং তাঁরই নামাঙ্কিত।
  • রণা ডাকাতের সঙ্গে এই মন্দিরের কোনো ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে কি? আপনাদের কি মত?।
  • রণা ডাকাতের প্রকৃত ইতিহাস চাপা পড়ে আছে হালালপুরের মাটির নিচে।

রাণাঘাটের আঞ্চলিক ঐতিহাসিকদের উচিত প্রচলিত ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা। লোকবিশ্বাসকে সম্মান জানিয়েও আমাদের বলতে হবে—সিদ্ধেশ্বরী মন্দির নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের এক অনন্য সৃষ্টি এবং রাণাঘাটের গর্ব।


আপনি কি হালালপুরের সেই প্রাচীন শিবলিঙ্গটি দেখেছেন?আমি খুব শীঘ্রই সেই মন্দিরে একটি ভিডিও 'লোক logy' -(loklogy)ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করব এবং অবশ্যই তার সঙ্গে একটি লেখা ‘লালপেঁচার ডিজিটাল’ প্রকাশ করব।পাঠক ও দর্শকদের মতামত নিয়ে,সেই কাজের সূচনা করব।

তথ্যসূত্র: ১. পশ্চিমবঙ্গের কালী ও কালীক্ষেত্র — দীপ্তিময় রায়।
২. ফিল্ড সার্ভে ও স্থানীয় প্রবীণদের সাক্ষাৎকার।
৩. নদীয়া রাজবংশের ইতিহাস ও কার্তিকেয় চন্দ্রের নথিপত্র।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Ok, Go it!