রানাঘাটের পাল চৌধুরী বাড়ির জোড়া শিব মন্দির: এক ক্ষয়িষ্ণু ঐতিহ্যের আখ্যান
বাংলার ধর্মীয় স্থাপত্যের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাল পোড়ামাটির বা টেরাকোটা অলংকরণ। এই শিল্প শুধু মাটির কারুকার্য নয়, বরং এটি আমাদের ইতিহাস ও বিশ্বাসের এক নীরব দলিল। আজ আমরা পা রাখব নদীয়া জেলার রানাঘাটে, যেখানে সময়ের প্রলেপে ঢাকা পড়ে আছে পাল চৌধুরী জমিদার বাড়ির সুপ্রাচীন জোড়া শিব মন্দির।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: সাধারণ থেকে অসাধারণ
রানাঘাটের এই বিখ্যাত পাল চৌধুরী বংশের উত্থান কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা কৃষ্ণচন্দ্র পান্তি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ এক মানুষ। কিন্তু নিজের অদম্য পরিশ্রম আর দক্ষতায় তিনি বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হন। তাঁর এই বিশাল কর্মযজ্ঞের স্বীকৃতিস্বরূপ নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে ‘পাল চৌধুরী’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
শিয়ালদহ-রানাঘাট রেলপথের চূর্ণী নদীর তীরে অবস্থিত এই রানাঘাটের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে জমিদার শম্ভুচন্দ্র পাল চৌধুরীর নামও। কৃষ্ণচন্দ্র পান্তির ছোট ভাই শম্ভুচন্দ্র পাল চৌধুরী সম্ভবত ১৮০২ খ্রিষ্টাব্দে এই দৃষ্টিনন্দন শিব মন্দির দুটি নির্মাণ করিয়েছিলেন।
স্থাপত্য ও টেরাকোটার অপার্থিব কারুকার্য
পাল চৌধুরী বাড়ির সীমানার ভেতর একই উঁচু ভিত্তিবেদীর ওপর দক্ষিণমুখী এই আটচালা মন্দির দুটি দাঁড়িয়ে আছে। বাংলার চিরাচরিত স্থাপত্যশৈলী আর অসাধারণ অলংকরণ এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
-
টেরাকোটা বৈশিষ্ট্য: মন্দিরের সামনের দেয়ালে ছড়িয়ে আছে পোড়ামাটির কাজ। প্রবেশদ্বারের খিলানের নিচে বড় পদ্মফুল আর নয়টি প্রতীক শিবমন্দিরের দেখা মেলে।
মন্দিরের গাত্রে খচিত সূক্ষ্ম টেরাকোটা কাজ - মূর্তি ও নকশা: মন্দির দুটির কুলুঙ্গিতে রয়েছে দশভুজা দুর্গা, মকর, বংশীধারী কৃষ্ণ, হংসসারি এবং পৌরাণিক নানা কাহিনী। এছাড়া পাখি, বানর ও লোকজীবনের নারীমূর্তিও এখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
- পার্থক্য: পূর্ব দিকের মন্দিরটিতে দুই সারি অলঙ্কৃত কুলুঙ্গি থাকলেও পশ্চিম দিকের মন্দিরে রয়েছে মাত্র একটি সারি।
![]() |
| টেরাকোটা নকশা কৃষ্ণা |
উভয় মন্দিরে আজও কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ বিদ্যমান, যা একসময়ের জৌলুস ও আধ্যাত্মিকতার সাক্ষ্য বহন করে।
![]() |
| টেরাকোটা নকশা: মকর মূর্তি ও অন্যান্য অলঙ্করণ |
ঐতিহ্যের করুণ আর্তি: বর্তমান অবস্থা
আজ যখন আমরা ঐতিহ্যের কথা বলি, তখন পাল চৌধুরী বাড়ির এই মন্দির দুটি দেখে বুক ফেটে যায়। অযত্ন আর অবহেলায় জীর্ণ হয়ে পড়েছে এর অঙ্গ।
- ক্ষয়িষ্ণু শিল্প: অপটু হাতের সংস্কারে অনেক সূক্ষ্ম টেরাকোটা কাজ আজ ঝাপসা হয়ে গেছে। মন্দির চত্বরে বুনো ঘাস আর আগাছা রাজত্ব করছে।
- মরিচা ধরা তালা: মন্দিরের প্রবেশপথে লোহার গ্রিল বসানো থাকলেও সেগুলিতে স্পষ্টভাবে মরিচা ধরেছে। কিছু গ্রিলে মরিচা প্রতিরোধক রং একাধিকবার ব্যবহার করা হয়েছে। এসব লক্ষণ থেকে অনুমান করা যায়, বহু বছর ধরে এখানে দেবতার আরাধনা ও নিয়মিত পূজা হয়তো আর আগের মতো হয়ে ওঠে না।
- চরম অশ্রদ্ধা: সবচেয়ে বেদনার বিষয় হলো, এই ঐতিহাসিক মন্দিরের প্রবেশপথের ঠিক সামনেই তৈরি করা হয়েছে পৌরসভার জঞ্জাল ফেলার ভ্যান স্ট্যান্ড। একটি ইতিহাসখ্যাত দেবালয়ের সামনে এই দুর্গন্ধময় পরিবেশ আমাদের সচেতনতার অভাবকেই প্রকট করে তোলে।
রানাঘাটের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আরও জানতে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন:
আরও পড়ুন: রানাঘাট পাল চৌধুরীর ইতিহাসউৎসবের আমেজ: পাল চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপূজা
মন্দির সংলগ্ন পাঁচ-খিলানযুক্ত ঠাকুরদালানে আজও পাল চৌধুরী বাড়ির ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। একসময় এখানে মহাসমারোহে ‘কুমারী পুজো’ ও ‘কুমড়ো বলি’ হতো। যদিও এই বাড়িতে কোনোদিন পশুবলি হয়নি। আজও বোধনের সময় মন্দির চত্বর কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়, কিন্তু বছরের বাকি সময়টা এটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
কীভাবে পৌঁছাবেন?
আপনি যদি এই ইতিহাসের স্পর্শ পেতে চান, তবে খুব সহজেই পৌঁছাতে পারেন:
- 🚆 ট্রেনে: শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট, কৃষ্ণনগর, শান্তিপুর বা গেদে লোকাল ধরে রানাঘাট জংশনে নামুন। সেখান থেকে টোটো বা রিকশায় পাল চৌধুরী বাড়ি।
- 🛣️ সড়কপথে: ১২ (পুরানো ৩৪) নং জাতীয় সড়ক ধরে সরাসরি রানাঘাট শহরে আসা যায়।
রানাঘাটের পাল চৌধুরী বাড়ির জোড়া শিব মন্দির ও সংলগ্ন ঠাকুরদালানে ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা পরিদর্শন
ভ্রমণ ও পরিদর্শনের সময়কাল:
- তারিখ: ১লা অক্টোবর, ২০২৫ (বুধবার)
- সময়: মহানবমী, দুর্গাপূজা (সকালবেলা)


