সুটিয়ার প্রতিবাদী সূর্য বরুণ বিশ্বাস: একটি অসম্পূর্ণ বিচারের আখ্যান
৫ জুলাই, ২০১২, বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিট। আপ বনগাঁ লোকাল এসে থামল গোবরডাঙ্গা স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে। ট্রেন থেকে নামলেন মিত্র ইনস্টিটিউশনের বাংলার শিক্ষক। গ্যারেজের মোটরবাইকটি স্টেশনের বাইরে রাখা ছিল। অন্য দিন, অনেক বন্ধুবান্ধব এবং ছাত্র থাকে তার সাথে স্টেশনে আসে পশে। কিন্তু আজ তিনি একা। বন্ধুরা আসেনি, কারণ গ্রামে বিয়ে। তাই মাস্টার মশাই কাউকে স্টেশনে আসতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, আজই সেই ভয়ঙ্কর দিন—যে দিন তাঁকে টার্গেট করা হয়েছিল।
বেশ কয়েক জন দুষ্কৃতী অপেক্ষা করছিল। সুযোগ এসে গেল। প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে আসার পর, তিনি তাঁর মোটর বাইকের দিকে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে, কেউ পিছন থেকে মাস্টারমশাইকে খুব কাছ থেকে গুলি করে। প্রথমে পিঠে এবং তারপর বুকে দুটি গুলি করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান—মাস্টারমশাই মাটিতে পড়ে গেলেন। তিনি রক্তে ভেসে গেলেন এবং প্রায় আধঘণ্টার বেশি সময় ধরে স্টেশনে কাতরাতে থাকলেন। তখনও তাঁর প্রাণ ছিল। তিনি বলতে থাকলেন— 'আমাকে বাঁচান।' আমাকে বাঁচান। আমি বরুন .. কেউ এগিয়ে আসেনি!
অনেক পরে, খবর পেয়ে তাঁর পরিচিতরা স্টেশনে ছুটে আসে। ততক্ষণে তিনি ক্রমাগত রক্তপাত হতে হতে প্রাণ হারান। অনেকেই দাবি করেছে—যদি তাকে সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হত, তাহলে তিনি বেঁচে যেতে পারতেন। কিন্তু যখন শিক্ষককে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আর কিছু করার ছিল না। এক আদর্শিক, সাহসী, সমাজ-সচেতন মানুষ—চিরতরে চলে গেলেন।
পরের দিন, অর্থাৎ ৬ জুলাই, ভারী বর্ষা। সেই বৃষ্টি ভেঙে স্থানীয় মাঠে জমায়েত হয়েছিল হাজার হাজার মানুষ। সবাই মাস্টারদাকে চোখের জলে শেষ বিদায় জানাতে চেয়েছিলেন। তীব্র ক্রোধে ফুঁসতে থাকা স্থানীয় মহিলারা হাতে তুলে নিয়েছিলেন হাতা-খুন্তি, ঝাঁটা। প্রচন্ড ক্ষোভে ফুঁসে উঠে তার পর ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ি। প্রধান সড়ক অবরুদ্ধ ছিল প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে।
বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট এবং স্থানীয় মানুষের তথ্য অনুযায়ী, মাস্টারদার অন্তিম যাত্রায় উপস্থিত ছিলেন প্রায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ। 'শব' ছুঁয়ে অনেকেই শপথ নিয়েছিলেন—এই নির্মম হত্যার জন্য যাঁরা দায়ী, তাঁদের শাস্তি নিশ্চিত না করা পর্যন্ত তারা লড়াই চালিয়ে যাবে। কিন্তু সময়ের সাথে সেই প্রতিজ্ঞা অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে। রাজনৈতিক পতাকা বদলাচ্ছেন অনেকেই। আজও মাস্টারদার পরিবার সন্তুষ্ট নয় তাঁর হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে।
কে এই বরুণ বিশ্বাস?
বরুণ বিশ্বাস, উত্তর চব্বিশ পরগনার সীমান্তবর্তী একদম প্রান্তিক গ্রাম সুটিয়ার ছেলে বরুন বিশ্বাস। (একঘণ্টা হাঁটলেই বাংলাদেশ সীমান্ত)। জন্ম ১২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭২। বাবা জগদীশ বিশ্বাস, মা গীতা বিশ্বাস। তিনি গোবরডাঙ্গা হিন্দু কলেজে পড়াশোনা করেছেন, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ. করেছেন। বি.এড. পাস করার কিছুদিন পর, তিনি—WBCS পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সে সব ছেড়ে শিক্ষকতার জীবন বেছে নেন। এবং বরুন জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাস সমাজের পাশে দাঁড়ানোর জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।
সুটিয়া, একসময় শান্ত একটি সীমান্তবর্তী গ্রাম, ধীরে ধীরে পরিণত হয় হিংস্র অপরাধের গর্ভস্থানে। ১৯৯০ থেকে ২০০২, সুঁটিয়া এবং তার আশপাশের গ্রামগুলোতে তান্ডব চালিয়েছিল সুশান্ত চৌধুরী, বীরেশ্বর ঢালি দের দল। প্রতি পরিবারের প্রত্যেক নারীর উপরে নেমে এসেছিল বিষাক্ত ছোবল। চলতো ভিডিও করে ব্ল্যাকমেল। এমনকি পরিবারের সদস্যদের সামনেই চলেছে যৌন নিপীড়ন। ধর্ষণের পর যোনিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হত বরফ টুকরো। নগ্ন দেহের ছবি তোলা হত। পরে এ ছবি দেদার বিকোবে।
কারুর টু শব্দটি করার সাহস ছিল না। পুলিশ অভিযোগ নিত না। হই-হই করে বাড়ছিল হায়নার দল। ছিল দাদাদের অভয় বাণী, যে মেয়েকে ইচ্ছে, তাকে তুলে নিয়ে আয়। নিয়ে চল সুখ সাধুর ভিটেতে। সেখানে মজুত অফুরন্ত মদ ও ক্যামেরা। গ্রামে যেকোন বিবাদ—সম্পর্ক জনিত, জমি বা অর্থকরী সংক্রান্ত—নিদান একটাই, ধর্ষণ। অনেক সময় লাঞ্ছিতা মেয়েটিকে তারা বাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে যেত। মেয়েটির মা'কে বলে যেত, মেয়েটিকে তাদের মনে ধরেছে। যেন সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে। পরের দিন আবার নিয়ে যাবে। বাড়িতে বাড়িতে গুন্ডাদের দূতেরা বলে আসত "মেয়ে পাঠিয়ে দেবেন, না হলে সব জ্বালিয়ে দেব।" দুহাজার থেকে দুহাজার তিন অবধি শুধু পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী ধর্ষণের সংখ্যাটি ছিল তেত্রিশ। স্থানীয়দের মতে, আসল সংখ্যাটি অনেক গুন বেশি।
ঠিক তখনই, কলকাতা মিত্র ইনস্টিটিউটে চাকরি পাওয়া এক ছিপছিপে গড়নের যুবক, সুটিয়া বাজারের চৌরাস্তার মোড়ে বৃষ্টির বিকেল, সন্ধ্যায় মাইক্রোফোন হাতে বলে উঠেছিলেন—
"আমরা যদি আমাদের মা-বোনদের সম্মান রক্ষা না করতে পারি, তবে আমরা অপরাধীদের থেকেও বড় অপরাধী।"
সুঁটিয়া প্রতিবাদের প্রথম ভাষা শুনতে পায়। একজন শিরদাড়া ঘোষণা করেন, "অনেক হয়েছে, অন্যায় আর নেই, এখন আমরা ন্যায়বিচার চাই।" সেদিন সেই শিরদাঁড়ার নাম ছিল বরুণ বিশ্বাস, সকলের বরুণ দা, প্রতিবাদের সূর্যোদয়। যখন একজন বরুণ জেগে ওঠেন, তখন মানুষের ভেতরের নিভে যাওয়া আগুন আবার জ্বলে ওঠে। জন্ম হয় 'সুটিয়া ধর্ষণ বিরোধী মঞ্চ'-এর। বরুণ বিশ্বাস, বা মাস্টারদা, হয়ে ওঠেন মানুষের আশ্রয়।
প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠলেন মাস্টারদা
তিনি শুধু কথার প্রতিবাদে থেমে থাকেননি। পাশে পেলেন বেশ কিছু উৎসাহী ছেলেমেয়েকে। ধর্ষিত মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন, সরকারি আধিকারিকদের একের পর এক চিঠি লিখেছেন। গড়ে তুলেছেন এক প্রতিরোধের বলয়—রাতের পর রাত বাইক চালিয়ে পাহারা দিয়েছেন গোটা গ্রাম, নেকড়ের পাল'রা কামড়াতে এলে গড়ে তুললেন পাল্টা প্রতিরোধ। তাঁর বাইকের আওয়াজে গোটা গাঁ নিশ্চিন্তে ঘুমোত।
তাঁর নিষ্ঠা ও চাপ প্রয়োগে শেষমেশ সিআইডি তদন্তে সুশান্ত চৌধুরী, বীরেশ্বর ঢালিসহ বহু দুষ্কৃতীকে গ্রেফতার করা হয়। অনেকের হয় আজীবন কারাদণ্ড। এমনকি কারাগারে যাওয়ার আগে এক ধর্ষককে হাতে তুলে দেন 'শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত'। বলেছিলেন— "জেলে বসে পড়িস"। ভাবা যায়! এটাই ছিল মাস্টারদা—এক প্রতিবাদী হৃদয়ের পাশাপাশি এক মানবিক শিক্ষক।
শুধু ধর্ষণের বিরুদ্ধে নয়—নদী মাফিয়ার বিরুদ্ধেও লড়াই
বরুণ বিশ্বাস লক্ষ্য করেছিলেন—প্রতি বছর বর্ষায় সুটিয়া প্লাবিত হয়। তদন্তে দেখা যায়, নদী থেকে বেআইনি ভাবে মাটি কাটার কারণেই এই দুর্যোগ। নদী ও পরিবেশ রক্ষার জন্য নতুন করে আন্দোলন গড়ে তুললেন তিনি। তাঁর এই সাহসিকতা মাফিয়াদের দুশ্চিন্তায় ফেলল। তাঁকে সরানো ছাড়া তাদের উপায় ছিল না।
ষড়যন্ত্র ও হত্যার পর্দা: ২০১২ সালের ৫ জুলাই বরুণ বিশ্বাসকে হত্যা করা হয়। ২০১৬ সালের ৩০ জুন, হাবরা, গাইঘাটা এবং গোপালনগর থানার পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে অপরাধী চক্রের পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে ছিল অভিযুক্ত ভাড়াটে খুনি সুমন্ত দেবনাথ ওরফে ফটকে, দেবাশিষ সরকার, বিশ্বজিৎ বিশ্বাস ও রাজু সরকার। এদের বেশিরভাগই স্থানীয় দুষ্কৃতী। তারা পুলিশের কাছে স্বীকার করে—দমদম কেন্দ্রীয় জেল থেকে সুশান্ত চৌধুরীর নির্দেশেই হত্যা করা হয় বরুণ বিশ্বাসকে। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও পরিবারসূত্রে জানা যায়, এই হত্যার ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে নাম জড়িয়েছে এক রং বদলানো বিশেষ রাজনৈতিক ব্যক্তির। তবুও আলোকপাত হয়নি সিআইডি’র চার্জশিটে। প্রশ্ন থেকে যায়—
- 🔍 কে দিল টাকা?
- 🔍 কেন এখনো রাজনীতিকদের নামে তদন্ত হয় না?
- 🔍 কেন সিআইডি রিপোর্টে ষড়যন্ত্রকারীদের নাম নেই?
আজও কেন এই হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি—এই প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। ঘটনার ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও বরুণের আত্মীয়দের দাবি, আজও প্রকৃত দোষীরা শাস্তি পায়নি। বনগাঁ মহকুমা আদালতে এখনও চলছে সেই মামলার দীর্ঘসূত্রিতা।
শেষ কথা:
ভালো থাকুন বরুণ বিশ্বাস। বিশ্বাস থাক, বিশ্বাস বাঁচুক। ভালো থাকুক আদর্শ। মাস্টারদার মৃত্যু নেই। আমাদের শ্রদ্ধা ও প্রণাম।
📍 স্থান: গোবরডাঙা, উত্তর ২৪ পরগণা।
