বীরভূম ও রাঢ় অঞ্চলের ইতিহাস
বীরভূম ছিল "রাঢ়" অঞ্চলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই রাঢ়ের উত্তর-পূর্বে ছিল গৌড়, পূর্বে গঙ্গা, দক্ষিণে সমতট বা মেদিনীপুর এবং পশ্চিমে মিথিলা। ভৌগোলিক বিচারে রাঢ়ের দুটি অংশ ছিল - উত্তর রাঢ় এবং দক্ষিণ রাঢ়। গঙ্গা, ভাগীরথী এবং অজয় নদী দ্বারা বেষ্টিত অঞ্চলটি হল উত্তর রাঢ়, যা রাঢ়ের প্রধান ভূমি। অন্যদিকে, অজয় এবং দামোদরের মধ্যবর্তী ভূমি হল দক্ষিণ রাঢ়, যাকে রাঢ়ের দক্ষিণ সম্প্রসারণ বলা হয়।
ত্রয়োদশ শতাব্দীর ইতিহাসবিদ মীনহাজ উদ্দিনের লেখা "তবকৎ-ই-নাসিরি" বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে গঙ্গার পশ্চিমে ছিল "রাল" — যার অর্থ "রাঢ়"। মীনহাজের লেখনী থেকে এটি স্পষ্ট যে, দ্বাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত "রাঢ়" নামটি অত্যন্ত প্রচলিত ছিল।
ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে "রহ্" ধাতুর সঙ্গে ভাবার্থে "ঘঞ্" প্রত্যয় যোগে "রাঢ়" শব্দটি তৈরি হয়েছে, যার অর্থ "নিয়ত গতিশীলতা"। প্রকৃতপক্ষে, ত্যাগব্রতধারী ও সদা পরিব্রাজক আর্য ঋষিরাই ছিলেন এই গতিশীলতার প্রতীক। তাঁদের বিহারক্ষেত্র হিসেবে লালমাটির এই ভূমির নাম কালক্রমে হয়ে ওঠে "রাঢ়"।
এই রাঢ়ভূমির উত্তর অংশের নাম পরবর্তীকালে হয় "বীরভূমি"। খ্রিস্টীয় ১৩শ থেকে ১৪শ শতাব্দীর "মহেশ্বরের কুলপঞ্জিকা"-তে আমরা এই নামের অকাট্য প্রমাণ পাই:
“বীরভূঃ কামকোটী স্যাৎ প্রাচ্যাং গঙ্গাজয়ান্বিতা।”
অর্থাৎ, সেই সময় থেকেই রাঢ়ভূমির নতুন নাম “বীরভূম” হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। পরে আবার এই বীরভূমের আরেক নাম হয় “ঝাড়খণ্ড”। অঞ্চলটিতে খণ্ড খণ্ড ঝোপ-ঝাড় ও ঘন জঙ্গলের আধিক্যের কারণেই এই নামকরণ। আজও আমরা খণ্ডাংশ বোঝাতে “ঝোপ-ঝাড়” বা “বাঁশঝাড়” শব্দগুলো ব্যবহার করি।
🧘♂️ ঋষিদের বীরভূম ও লৌকিক বিশ্বাসের জন্ম
বীরভূমের লাল মাটি সুপ্রাচীন কাল থেকেই ঋষি ও সাধকদের সাধনক্ষেত্র ছিল। এর নিবিড় অরণ্যভূমি তাঁদের তপস্যার অনুকূল ছিল। যেমন—
- 👉 ভাণ্ডীরবনে ঋষি বিভাণ্ডক।
- 👉 বক্রেশ্বরে শ্বেতমুনি, শুক্রাচার্য, পতঞ্জলি ও অষ্টাবক্র।
- 👉 তারাপীঠে বশিষ্ঠ।
- 👉 বেহিড়ায় বৃহদারণ্যক মুনি।
- 👉 দুবসায় মহর্ষি দুর্বাসা।
- 👉 কাঞ্চীক্ষেত্রে মহর্ষি রুরু।
জনশ্রুতি ও মহাকাব্যের অনুসরণে বলা হয়, এই দুর্গম অরণ্যের কারণেই পাণ্ডবরা তাঁদের অজ্ঞাতবাসের নিরাপদ স্থান হিসেবে বীরভূমকেই বেছে নিয়েছিলেন।
পাথর থেকে দেবী – “পাথরবুড়ির” জন্মকথা
প্রাচীন কালে এই ঘন জঙ্গলের পথে যাতায়াত ছিল অত্যন্ত বিপদসংকুল। বন্যপ্রাণীর ভয় আর পথ হারানোর শঙ্কা সব সময় তাড়া করে বেড়াত। সেই সময় পথচারীরা হাতে পাথরের ঢেলা বা টুকরো নিয়ে চলতেন। এর পেছনে ছিল ব্যবহারিক কারণ—
- 👉 বয়স্করা লাঠি হাতে ভারসাম্য রক্ষা করতেন।
- 👉 তরুণরা নিরাপত্তার জন্য পাথরের ঢেলা হাতে নিতেন।
- 👉 গন্তব্যে পৌঁছে সেই পাথর ফেলে দিতেন নির্দিষ্ট স্থানে।
ক্রমান্বয়ে এই পরিত্যক্ত পাথর জমে ছোট ছোট স্তূপ তৈরি হতো, যা অনেকটা "আদি মাইলস্টোন" বা পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করতো। পথচারীরা এই স্তূপ দেখে বুঝতে পারতেন তাঁরা সঠিক পথেই আছেন।
কালক্রমে এই পথনির্দেশক পাথরের স্তূপ লোকবিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, এই পাথরই বনের বিপদ থেকে তাদের রক্ষা করে। এই প্রগাঢ় বিশ্বাস থেকেই জন্ম হয় এক অনন্য লৌকিক দেবী - "পাথর বুড়ি"।
আজও বীরভূমের বিভিন্ন স্থানে এই "পাথরবুড়ির থান" দেখা যায়। পথচারীরা ভক্তিভরে প্রণাম জানান। এমনকি ইট বোঝাই লরিগুলোও শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে থানের পাশে দু-একটি ইট রেখে যায়—এ যেন এক বহমান সামাজিক স্মৃতি।
🙏 বিশ্বাসের প্রতীক — বড়কোন্দার “পাথরবুড়ি”
সিউড়ি-রাজনগর পিচ রাস্তার ধারে বড়কোন্দা গ্রামে আজও সেই প্রাচীন "পাথরবুড়ির থান" স্বমহিমায় বিরাজমান। এখানে আধুনিকতা হয়তো পৌঁছেছে, কিন্তু মানুষের আদিম ও অকৃত্রিম বিশ্বাস আজও অটুট।
📍 ভ্রমণ তথ্য:
কিভাবে পৌঁছাবেন: বীরভূমের সদর শহর সিউড়ি থেকে রাজনগর গামী বাসে উঠে বড়কোন্দা মোড়ে নামলেই রাস্তার ধারে এই থানটি চোখে পড়বে। সিউড়ি থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১০-১২ কিমি।
📚 তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা:
- মীনহাজ উদ্দিন সিরাজী — তবকৎ-ই-নাসিরি।
- মহেশ্বরের কুলপঞ্জিকা — প্রাচীন বীরভূমের ঐতিহাসিক নথি।
- বড়কোন্দা গ্রামবাসী — মাঠ-পর্যায়ের সাক্ষাৎকার ও লৌকিক ইতিহাস সংগ্রহ।
সৃজনশীলতার মেলবন্ধন: প্রযুক্তি ও মানবিক দৃষ্টি
এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত দৃশ্যকল্পগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সহযোগিতায় তৈরি করা হলেও, এগুলোর প্রতিটি বিন্দুতে মিশে আছে আমার দীর্ঘদিনের ফিল্ড সার্ভে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং নিজস্ব মনন। প্রযুক্তি এখানে কেবল একটি মাধ্যম; কিন্তু ছবির পেছনের মূল ভাবনা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং মানবিক অনুভূতিগুলো ৯৫% শতাংশই আমার নিজস্ব সৃজনশীলতার ফসল।
