অনেকেই মনে করেন, লোকসংস্কৃতি (Folklore) মানেই শুধুমাত্র নাচগান শেখানো। এটি পুরোপুরি ভুল ধারণা। অবশ্যই লোকসঙ্গীত, লোকনৃত্য, লোকনাট্য এই বিভাগের অংশ, কিন্তু শুধুমাত্র নৃত্য-সঙ্গীত নয়, লোকসংস্কৃতি বিভাগের পড়াশোনা মানুষের শিকড়ের সন্ধান করার বিষয়।
কী পড়ানো হয়?
লোকসংস্কৃতি হল একটি বিস্তৃত বিষয় যেখানে মানুষের সাংস্কৃতিক শেকড়, ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের গবেষণা করা হয়। এখানে বিভিন্ন লোকসংস্কৃতিবিদদের তত্ত্ব, লোকভাষা, লোকভাষাবিজ্ঞান, জাতিগত সংস্কৃতির বৈচিত্র্য, বিভিন্ন জনজাতির শিল্প, জীবনযাপন, ভাষা ইত্যাদি পড়ানো হয়।
🎓 কোথায় পাওয়া যায় এই কোর্স? (আঞ্চলিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপট)
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে লোকসংস্কৃতি বা ফোকলোর একটি অত্যন্ত বিশেষায়িত শাখা। আপনি যদি পশ্চিমবঙ্গে এই বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে চান, তবে আপনার জন্য প্রধান ও একমাত্র গন্তব্য হলো কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে স্নাতকোত্তর স্তরে লোকসংস্কৃতি পড়ার এমন সুযোগ নেই।
তবে পাঠকদের সুবিধার্থে জানানো প্রয়োজন যে, ভারতের জাতীয় স্তরে এই বিষয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ভারতের আরও কিছু নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত সুনামের সাথে লোকসংস্কৃতি পড়ানো হয়। নিচে সেই তালিকাটি দেওয়া হলো:
- কর্ণাটক লোকসংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়: এটি এশিয়ার প্রথম লোকসংস্কৃতি কেন্দ্রিক পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, যা এই বিষয়ের বিশালতাকে প্রমাণ করে।
- গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় ও উত্তর-পূর্ব পার্বত্য বিশ্ববিদ্যালয় (NEHU): উত্তর-পূর্ব ভারতের সমৃদ্ধ জনজাতীয় সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণার জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
- ঝাড়খন্ড কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়: আদিবাসী সমাজ ও তাদের বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য রক্ষায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
- মহীশূর, মাদুরাই কামারাজ ও কালিকট বিশ্ববিদ্যালয়: দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন দ্রাবিড় সংস্কৃতি এবং লোকগাথা নিয়ে উচ্চতর গবেষণার জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষভাবে পরিচিত।
*আপনি যদি পশ্চিমবঙ্গের বাইরে গিয়েও লোকসংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় জগত নিয়ে কাজ করতে চান, তবে উপরের এই প্রতিষ্ঠানগুলো আপনার জন্য সেরা বিকল্প হতে পারে।
ভর্তি ও কোর্স কাঠামো
- যোগ্যতা: যে কোনো বিভাগ (Arts, Science, Commerce) থেকে অনার্সসহ স্নাতক পাশ করা ছাত্রছাত্রীরা আবেদন করতে পারবেন।
- কোর্সের ধরন: এটি একটি রেগুলার কোর্স, ডিসটেন্স মোডে পাওয়া যায় না।
- সময়সীমা: ২ বছর, মোট ৪টি সেমিস্টার।
- ক্ষেত্রসমীক্ষা: বাধ্যতামূলক, যা ছাত্রদের গবেষণার দক্ষতা বাড়ায়।
- আন্তর্জাতিক ভর্তি: দেশ ও বিদেশের ছাত্রছাত্রীদের জন্য সুযোগ রয়েছে। (বিদেশের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের স্কলারশিপ (বৃত্তি) পাওয়া যায়)
লোকসংস্কৃতি সংগ্রহশালা
কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের গবেষণা সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত রয়েছে:
- বাংলার লোকদেবদেবীর উপকরণ
- লোকপ্রযুক্তি ও বাদ্যযন্ত্র
- মৃৎশিল্প ও লোক পোশাক
- ঐতিহাসিক যুদ্ধাস্ত্র
চাকরির সম্ভাবনা
লোকসংস্কৃতি নিয়ে পড়াশোনা করলে বেশ কিছু সম্ভাবনাময় পেশা রয়েছে:
- শিক্ষা ও গবেষণা: UGC-NET পরীক্ষার মাধ্যমে গবেষণা ও অধ্যাপনায় যোগ দেওয়া যায়।
- সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়: তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রকে লোকসংস্কৃতিবিদদের চাহিদা রয়েছে।
- প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ: ASI ও অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে চাকরির সুযোগ।
- মিউজিয়াম: বিভিন্ন মিউজিয়াম ও কালচারাল ইনস্টিটিউটে কাজের সুযোগ।
- গণমাধ্যম: প্রকাশনা ও মিডিয়া হাউসে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ।
ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠা
১৯৭৮ সালে ১০ম নৃতত্ত্ব বিষয়ক সম্মেলনে লোকসংস্কৃতি শাখার দায়িত্ব পায় কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়। পরবর্তীতে, ১৯৮২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি, UGC অনুমোদিত INSTITUTE OF FOLKLORE প্রতিষ্ঠিত হয়। ড. সিতাংশু মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এর যাত্রা শুরু এবং ১৯৯০ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ বিভাগে পরিণত হয়।
বিভাগীয় শিক্ষক পরিচিতি (Faculty Members)
| প্রোফাইল | নাম | পদমর্যাদা ও যোগ্যতা |
|---|---|---|
| Tapan Kumar Biswas | Professor (MA, Ph.D, D.Litt) | |
| Ashimananda Gangopadhyay | Professor (Ph.D., PGBT, PGDJMC) | |
| Sujay Kumar Mandal | Professor (PhD) | |
| Debolina Debnath | Assistant Professor (PhD) | |
| Kakali Dhara Mandal | Assistant Professor (PhD) |
লোকসংস্কৃতি শুধুমাত্র নাচগান শেখার বিষয় নয়, এটি সমাজের শেকড় খোঁজার একটি গবেষণাধর্মী শাখা। যারা এই বিষয়ে পড়তে চান, তাদের জন্য এটি একটি দারুণ সুযোগ। চাকরির ক্ষেত্রেও এটি একটি সম্ভাবনাময় অধ্যয়ন। আপনার যদি আরও প্রশ্ন থাকে, কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না।
সূত্র: Kalyani University Official Portal
