Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Test link

Search Suggest

৭৬৩ বছরের ইতিহাসে নদীয়ার ‘বুড়ো মা’ পূজা | Ranaghat Buro Maa Puja History

নদীয়ার রানাঘাটে ৭৬৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বুড়ো মা’ পূজো। রামকুমার চক্রবর্তী কর্তৃক প্রবর্তিত, ইতিহাস ও লোককাহিনী একসাথে।

সাতশো তেষট্টি বছরের ইতিহাস ও কিংবদন্তির সাক্ষী: নদীয়ার ‘বুড়ো মা’

সাতশো তেষট্টি বছরের ইতিহাস ও কিংবদন্তির প্রত্যক্ষ এবং জীবন্ত সাক্ষী নদীয়ার ‘বুড়ো মা’। মা- তিনি সর্বজনেরই মা, তিনিই মা দুর্গা। কিন্তু বৈদিক বা পৌরাণিক দেবীসত্ত্বায় তিনি আর সীমাবদ্ধ নন; তিনি এখানে পরিব্যাপ্ত লোকজীবনের প্রাণকেন্দ্র।

নদীয়া জেলার প্রাচীন শহরে শর্মাপাড়ায় বহু প্রাচীন শর্মাবাড়ির আরাধ্যা দেবী ‘বুড়ো মা’। কোনো পারিবারিক সীমারেখা তাঁর ব্যষ্টিকে কোনোদিনই সঙ্কুচিত করেনি। পারিবারিক দেবী হয়েও তিনি প্রতিষ্ঠিত ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে।

রাঢ়দেশ থেকে কবে যে রামকুমার চক্রবর্তী নামে এক তীর্থাভিলাষী ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণ মায়ের আদেশ পেয়ে এই পূজার প্রবর্তন করেছিলেন, তা আজ আর সন-তারিখ মিলিয়ে খুঁজে বার করা সম্ভব নয়। তবে মোটামুটি হিসেব অনুযায়ী ১২৬২ খ্রিষ্টাব্দে এই ‘বুড়ো মা’-এর পূজা প্রবর্তিত হয়।

লোককাহিনী ও মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র

একদিন নদীয়াধিপতি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রাজকার্যের প্রয়োজনে যাচ্ছিলেন ওই পথ দিয়ে। হঠাৎই তিনি দেখলেন লালপাড় শাড়িপরিহিতা এক অপূর্ব সুন্দরী কন্যা নদীর পাড়ে বসে আখ খাচ্ছেন। কে এই দেবীকন্যা? মুহূর্তে সেই মাতৃমূর্তি অদৃশ্য হয়ে গেল। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রও অনুসরণ করে শর্মাবাড়িতে এসে দেখলেন মা দুর্গার হাতে সেই অবশিষ্ট আখের টুকরো। মহারাজ বুঝলেন, মা এখানে মৃন্ময়ী নন, চিন্ময়ী। এখানে দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়েছে ধনসম্পদে নয়, এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের অপার ভক্তির মহিমায়। ধর্মপ্রাণ ও মাতৃভক্ত মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রই এগিয়ে আসেন দেবী পূজার সহায়তায়।

এই পূজার বাহ্যিক আড়ম্বর নেই, কিন্তু আচার-অনুষ্ঠান ও শাস্ত্রবিধি পুরোপুরি অনুসরণ করেই পূজা হয়, তাই এই পূজার স্থান সকলের আগে।

প্রতি বছর উল্টোরথের দিন নতুন পাটায় সিঁদুর দিয়ে প্রতিমা তৈরির শুভ কাজ শুরু হয়। তৈরি হয় একচালার ডাকের সাজের প্রতিমা। তারপর শুভ চতুর্থী তিথিতে মাতৃপতিমাকে মৃত্তিকাবেদিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই একই বিধি দীর্ঘকাল ধরে অটলভাবে অনুসৃত হয়ে আসছে।

রানাঘাট শহরে আরেকটি প্রাচীন পূজা আজও প্রচলিত। দক্ষিণপাড়াতেই ঘোষবাড়িতে সেই দুর্গাপূজা অব্যাহত রয়েছে। ঘোষবাড়ির পক্ষ থেকে বলা হয়, এই পূজা তিনশ বছরেরও বেশি প্রাচীন।

✍️ যুগান্তর পত্রিকায় প্রনবেশ চক্রবর্তীর কলমে প্রকাশিত গবেষণামূলক সংবাদটি, বুধবার ২১ আশ্বিন ১৩৯৩ বঙ্গাব্দ / ৮ অক্টোবর ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দ।

উপসংহার: ঐতিহ্যের অতন্দ্র প্রহরী

পরিশেষে বলা যায়, নদীয়ার শর্মাপাড়ার এই 'বুড়ো মা' কেবল একটি পারিবারিক আরাধ্যা দেবী নন, বরং তিনি আমাদের বাংলার সাতশো বছরেরও বেশি প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অটুট বিশ্বাসের এক জীবন্ত দলিল। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের স্মৃতিধন্য এই পূজার প্রতিটি আচার আজও সেই আদি ও অকৃত্রিম ভক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। রানাঘাট তথা সমগ্র নদীয়ার জনজীবনে বুড়ো মা এক পরম নির্ভরতার নাম।

সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু বদলে গেলেও, উল্টোরথের দিন প্রতিমা নির্মাণের সূচনা থেকে শুরু করে একচালার ডাকের সাজের সেই চিরাচরিত রূপ আজও অম্লান। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে রানাঘাটের মাটিতে এমন ঐতিহাসিক ঐতিহ্য আজও স্বমহিমায় টিকে আছে। এই অমূল্য লোক-ঐতিহ্যকে আগলে রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এর মাহাত্ম্য পৌঁছে দেওয়া আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।

বাংলার এমন আরও প্রাচীন ইতিহাস ও লৌকিক দেবদেবীর অজানা কাহিনী জানতে আমাদের সাথেই থাকুন।

আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন

বাংলার লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যবাহী লৌকিক দেবতার কাহিনী জানতে আমাদের ফলো করুন:

নদীয়ার বুড়ো মা ও শর্মাবাড়ির পূজা সম্পর্কে সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQ)

১. নদীয়ার রানাঘাটের 'বুড়ো মা' কত বছরের পুরনো এবং এই পূজার ইতিহাস কী?

নদীয়ার রানাঘাট শর্মাপাড়ার আরাধ্যা দেবী 'বুড়ো মা' বর্তমানে প্রায় ৭৬৩ বছরেরও বেশি প্রাচীন। ঐতিহাসিক নথি ও পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, আনুমানিক ১২৬২ খ্রিষ্টাব্দে (বঙ্গাব্দ ৬৮৯) এই পূজার প্রবর্তন হয়। রাঢ়দেশ থেকে আসা রামকুমার চক্রবর্তী নামক এক ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণ মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই দুর্গাপূজার সূচনা করেছিলেন।

২. মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র কেন শর্মাবাড়ির এই পূজাকে 'চিন্ময়ী' রূপ বলেছিলেন?

লোককাহিনী অনুসারে, নদীয়াধিপতি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র একবার এই অঞ্চলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নদীর তীরে এক অপরূপা কন্যাকে আখ খেতে দেখেন। পরে শর্মাবাড়ির দেবীমূর্তির হাতে সেই আখের অবশিষ্টাংশ দেখে তিনি বুঝতে পারেন মা এখানে মৃন্ময়ী (মাটির মূর্তি) নন, বরং সাক্ষাৎ চিন্ময়ী বা জীবন্ত। ভক্তের ভক্তি দেখে মুগ্ধ হয়ে মহারাজ স্বয়ং এই পূজার পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন।

৩. বুড়ো মা-এর প্রতিমা তৈরির বিশেষ নিয়ম বা রীতি কী?

শত শত বছর ধরে এই পূজার একটি বিশেষ রীতি প্রচলিত আছে। প্রতি বছর উল্টোরথের পুণ্য তিথিতে নতুন পাটায় সিঁদুর দান করে প্রতিমা নির্মাণের শুভ কাজ শুরু হয়। এখানে দেবী একচালার ডাকের সাজে ভূষিতা হন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে শাস্ত্রীয় বিধি মেনে চতুর্থী তিথিতে দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা হয়।

৪. রানাঘাটের এই পূজা কি পারিবারিক নাকি সর্বজনীন?

মূলত শর্মাবাড়ির পারিবারিক পূজা হিসেবে শুরু হলেও, গত সাতশো বছরে এটি রানাঘাট তথা সমগ্র নদীয়ার মানুষের কাছে একটি আঞ্চলিক লোকউৎসব ও প্রাণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষ এই 'বুড়ো মা'-কে নিজেদের মা হিসেবে শ্রদ্ধা করেন, তাই এটি পারিবারিক গণ্ডি পেরিয়ে এক আধ্যাত্মিক গণচেতনার রূপ নিয়েছে।

Our Digital Platforms LalPecha.in: Bengali stories on local news, folk culture, and rural life. IndiaTravelGuide: English guide to Indian culture, festivals, and customs. LOKLOGY: YouTube storytel…

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন