রাভা জনগোষ্ঠীর লোকসংস্কৃতি: ঝিমিরিগাঁও ও ফারকান্তি নৃত্যের আধ্যাত্মিক দহন
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে আসাম রাজ্য একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। নানা জাতিগোষ্ঠী, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মনোরম মিলনস্থল এই অঞ্চল। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও কিছু সম্প্রদায় রয়েছে যাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, বিশ্বাস, লোকসংস্কৃতি এবং জীবনদর্শন আজও অনেকাংশে অবহেলিত ও অপরিচিত। রাভা সম্প্রদায় তেমনই এক অনন্য উপজাতি, যাদের জীবনযাত্রা, ধর্মীয় রীতি, সংগীত-নৃত্য ও লোকজ বিশ্বাস ভারতীয় ফোক-সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ।
প্রথম পর্বে আমরা রাভা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী আবাসস্থল ঝিমিরিগাঁও-কে কেন্দ্র করে তাদের সংস্কৃতি ও সমাজজীবনের কিছু বিশেষ দিক তুলে ধরব।
রাভাদের মাহিরি বা উপগোষ্ঠী
ঝিমিরিগাঁও গ্রামে রাভা সম্প্রদায়ের মোট ছয়টি মাহিরি বা উপগোষ্ঠী ছিল—
- ১. জিরাং-কাইলান মাহিরি
- ২. নাংলাডu-চিনাল মাহিরি
- ৩. উমচা-বেৰেগাঁও কোমোরা মাহিরি
- ৪. বাখালাপাড়া-রাঁচা মাহিরি
- ৫. বাকুলিপাড়া-নাংবাগ মাহিরি
- ৬. লুংখুং-চাম্পা মাহিরি
ফারকান্তি নৃত্য (Farkanti Dance)
রাভা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, মৃত্যুই জীবনের সমাপ্তি নয়। তাদের মতে, মৃত আত্মা অবিনশ্বর এবং পুনর্জন্ম লাভ করে—শুধু মানুষ রূপে নয়, পশু ও পাখির রূপেও। এই গভীর বিশ্বাস থেকেই জন্ম নিয়েছে রাভাদের ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক নৃত্য- ফারকান্তি নৃত্য।
নৃত্যের প্রতীকী অর্থ
- 👉 পুরুষেরা হাতে নেন মানচেলেংকা বান্ডিল।
- 👉 মহিলারা বহন করেন ঢাল ও তরবারি, যা মাতৃশক্তির প্রতীক। রাভা সমাজে নারীরা উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। তাই এই নৃত্যে তাদের ভূমিকাও বিশেষ তাৎপর্যময়।
💢 মানচেলেংকা বান্ডিল-এ থাকে তিনটি কাঠের পাখির প্রতিরূপ—
১. মানচেলেংকা (বা মাছ লেংকা)
২. তোডেলেংকা
৩. বারেঃহে তোকা
রাভাদের বিশ্বাস, এই কাঠের পাখিদের ডানা মেলানো মৃত আত্মাকে শান্তি ও মুক্তি দেয়। একইসঙ্গে এগুলো বন্ধুত্ব, বিশ্বাস এবং আত্মার ধারাবাহিকতার প্রতীক।
অনুষ্ঠানের তাৎপর্য
ফারকান্তি নৃত্যকে অনেক সময় ‘শ্রাদ্ধ-নৃত্য’ ও বলা হয়। শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়া, মৃত আত্মার শান্তি কামনা করা এবং নতুন জীবনের পথে তাকে আশীর্বাদ জানানোই এই নৃত্যের মূল উদ্দেশ্য।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এই নৃত্য শুধু মৃত্যু নয়, শিশুর জন্মের পর আতুর ঘর থেকে মুক্তির সময়ও পরিবেশিত হয়—আত্মাকে নতুন রূপে স্বাগত জানানোর প্রতীক হিসেবে। তবে, মৃত্যুর ক্ষেত্রে এই নৃত্য বাধ্যতামূলক।
নৃত্যের পোশাক
💢 পুরুষ: একরঙা গামোচা, পাজর, মাথার বন্ধনী, রুফান।
💢 মহিলা: কাম্বুং, মাথার বন্ধনী, কোমরবন্ধনী ও অলঙ্কার।
💢 উভয় লিঙ্গের জন্য: বাচেক, নামারি, কানে ধলবগলা, নাকে নথ, গলায় হাঞ্চা, হাতে চানাপালি, বাহুতে বাজু, কোমরে করক, মাথায় খুসুমাক্রাং ইত্যাদি।
বাদ্যযন্ত্র: এই নৃত্যের সঙ্গে বাজানো হয় ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র—
- 💢 বাদুংদুপা: বাঁশের তৈরি তারবাদ্য।
- 💢 খাম: ঢোলসদৃশ বাদ্যযন্ত্র।
- 💢 দাইদী: ধাতব শব্দযন্ত্র (কাঁসি)।
- 💢 বাঁহি: বাঁশি।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: আগে ফারকান্তি নৃত্য কেবল মৃত্যুর পর বা বিশেষ ধর্মীয় উপলক্ষে পালন করা হলেও এখন এটি সাংস্কৃতিক প্রদর্শন (demonstration)-এর জন্যও পরিবেশিত হয়। তবে, রাভাদের কাছে এর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আজও অটুট।
