🚂 শান্তিপুর–নবদ্বীপ ঘাট লাইট রেল পরিষেবা
১৮৯৯ সালে বিখ্যাত মার্টিন লাইট রেলওয়ে কোম্পানি ২ ফুট ৬ ইঞ্চি (৭৬২ মিমি) ন্যারো গেজ লাইনে এই ঐতিহাসিক পরিষেবা চালু করে। শুরুর দিকে এই রুটে প্রতিদিন ৫ জোড়া ট্রেন চলত, যা সময়ের সাথে কমে ৩ জোড়ায় এসে দাঁড়ায়। এই রেলপথে আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও এটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। লোকমুখে আজও প্রচলিত আছে যে, ট্রেনের যাত্রাপথ নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধুমাত্র শান্তিপুর স্টেশনে টোকেন দেওয়া হতো।
🛤️ লাইনটি প্রধানত দুটি সেকশনে বিভক্ত ছিল:
-
১. শান্তিপুর জংশন - কৃষ্ণনগর সিটি জংশন:
প্রায় ১৮ কিলোমিটার (১২ মাইল) দীর্ঘ এই শাখাটি ১৯০৪ সালে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে অধিগ্রহণ করার পর এর নাম হয় রানাঘাট-কৃষ্ণনগর ব্রাঞ্চ।
-
২. কৃষ্ণনগর সিটি জংশন - নবদ্বীপ ঘাট:
২৭ কিলোমিটার (১৭ মাইল) দীর্ঘ এই অংশটির উল্লেখ ১৯০৮ সালের রিপোর্টে না থাকলেও, ১৯৪৭ সালের রেলওয়ে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রিপোর্টে এটি "In Operation Narrow Gauge Line" হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।
🚂 শান্তিপুর–নবদ্বীপ ঘাট লাইট রেল পরিষেবা
১৮৯৯ সালে বিখ্যাত মার্টিন লাইট রেলওয়ে কোম্পানি ২ ফুট ৬ ইঞ্চি (৭৬২ মিমি) ন্যারো গেজ লাইনে এই ঐতিহাসিক পরিষেবা চালু করে। শুরুর দিকে এই রুটে প্রতিদিন ৫ জোড়া ট্রেন চলত, যা সময়ের সাথে কমে ৩ জোড়ায় এসে দাঁড়ায়। এই রেলপথে আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও এটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। লোকমুখে আজও প্রচলিত আছে যে, ট্রেনের যাত্রাপথ নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধুমাত্র শান্তিপুর স্টেশনে টোকেন দেওয়া হতো।
🛤️ লাইনটি প্রধানত দুটি সেকশনে বিভক্ত ছিল:
- ১. শান্তিপুর জংশন - কৃষ্ণনগর সিটি জংশন: প্রায় ১৮ কিলোমিটার (১২ মাইল) দীর্ঘ এই শাখাটি ১৯০৪ সালে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে অধিগ্রহণ করার পর এর নাম হয় রানাঘাট-কৃষ্ণনগর ব্রাঞ্চ।
- ২. কৃষ্ণনগর সিটি জংশন - নবদ্বীপ ঘাট: ২৭ কিলোমিটার (১৭ মাইল) দীর্ঘ এই অংশটির উল্লেখ ১৯০৮ সালের রিপোর্টে না থাকলেও, ১৯৪৭ সালের রেলওয়ে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রিপোর্টে এটি "In Operation Narrow Gauge Line" হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।
কৃষ্ণনগর সিটি জংশন-নবদ্বীপ ঘাট লাইট রেল সেকশন: ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথটির ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। ১৯০৮ বা ১৯১৮ সালের সরকারি নথিতে এর উল্লেখ না থাকলেও, ১৯৪৭ সালের রেল রিপোর্টে এটি চালু ন্যারো গেজ লাইন হিসেবে দেখানো হয়।
শান্তিপুর থেকে নবদ্বীপ ঘাট পর্যন্ত এই পুরো রুটটি মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। শেষ দিকে যাত্রী কমে যাওয়ায় আমঘাটা ও মহেশগঞ্জ স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই লাইনে ছোট ট্রেন চলত। বর্তমানে এটি ব্রড গেজে রূপান্তরিত হয়েছে এবং ট্রেনগুলো বিদ্যুতে চলে।
🔄 শান্তিপুর-নবদ্বীপ ঘাট রুট ও টার্ন টেবিলের গল্প
![]() |
শান্তিপুর টার্ন টেবিল |
শান্তিপুর থেকে নবদ্বীপ ঘাট পর্যন্ত এই ঐতিহাসিক ছোট ট্রেনটি ২৭.৩৯ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে প্রায় ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট সময় নিত। ট্রেনের গতি অত্যন্ত ধীর হওয়ার কারণে যাত্রীরা অনেক সময় চলন্ত ট্রেন থেকেই স্বচ্ছন্দে ওঠানামা করতে পারতেন।
শুরুতে এই ট্রেনটি বাষ্পীয় ইঞ্জিনে চলত, তবে পরবর্তীতে ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করা শুরু হয়। নবদ্বীপ ঘাট স্টেশনে পৌঁছানোর পর ইঞ্জিনটিকে বগি থেকে আলাদা করে একটি টার্ন টেবিলের (Turntable) সাহায্যে ঘুরিয়ে আবার ট্রেনের সামনে জোড়া হতো। শেষ দিকে টার্ন টেবিল ঘোরানোর জন্য নির্দিষ্ট কর্মী না থাকায়, চালককে সাহায্য করতে স্থানীয় উৎসাহী ছেলেরা নিজেরাই ইঞ্জিন ঠেলে ঘুরিয়ে দিত।
ট্রেনটির রঙের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছিল। শুরুতে এর কামরাগুলো ছিল কমলা-সাদা-কমলা রঙের। পরবর্তীতে কাঁচরাপাড়া ওয়ার্কশপে রক্ষণাবেক্ষণের পর এর রং পরিবর্তন করে ঘন সবুজ এবং সাদা ক্রিম করা হয়।
বাষ্প ইঞ্জিন থেকে ডিজেল রেলবাসে রূপান্তর:
১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের যুগ শেষ হলে, শান্তিপুর-নবদ্বীপ ঘাট রুটে অশোক লেল্যান্ড নির্মিত ডিজেল রেলবাস চালু হয়। এই সবুজ-হলুদ রঙের রেল-বাস গুলোতে একটি মোটর কোচ (EZZS) এবং দুটি ট্রেলার কোচ থাকত। এটি ১৯৭০-এর দশকে এই রুটে আগমন করে এবং বাসের মতো দেখতে হওয়ায় এর যাত্রী ধারণ ক্ষমতাও বেশি ছিল। সাধারণত তিনটি কামরা থাকলেও রাস উৎসবের মতো বিশেষ অনুষ্ঠানে যাত্রীর চাপ বেড়ে গেলে কামরার সংখ্যা বাড়িয়ে চারটি করা হতো এবং বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থাও থাকত। এই সময়ে ভাড়া কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া হতো, যার উল্লেখ স্বরুপগঞ্জের পরিত্যক্ত নবদ্বীপ ঘাট স্টেশনে এখনও পাওয়া যায়।
১৯৭৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় এই রেলপথটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে গতি কমে ১৫ কিমি/ঘণ্টা হয়ে যায়। ধীরে ধীরে এই লাভজনক রুটটি চরম লোকসানের শিকার হয়। এর প্রধান কারণ ছিল টিকিট কাটার অনীহা।
ধীর গতির কারণে যাত্রীরা প্রায়শই বাড়ির সামনে থেকে ট্রেনে ওঠানামা করতেন এবং স্টেশনগুলো কেবল নামেই ছিল। কাউন্টারগুলো প্রায়ই বন্ধ থাকায় যাত্রীরা টিকিট কাটতে চাইলেও পারতেন না।
কৃষ্ণনগর স্টেশন এক সময় এই রুটের একটি গুরুত্বপূর্ণ জংশন ছিল। এখানে তিনটি লাইন এবং দুটি প্ল্যাটফর্ম ছিল, যেখানে ট্রেন ক্রসিং এবং বাষ্পীয় ইঞ্জিনে জল দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কৃষ্ণনগর স্টেশন বড় করার জন্য ন্যারো গেজের লাইন সংখ্যা কমে একটিতে দাঁড়ায়। এরপর থেকে এই রুটে 'One Train Only System' ট্রেন চলত, অর্থাৎ একটি মাত্র ট্রেন সারা দিনে তিনটি ট্রিপ দিত।
👉শান্তিপুর – নবদ্বীপ ঘাট লাইট রেলের পুরোনো সময়সূচীঃ
| ট্রেন নং | ছাড়ার সময় (শান্তিপুর) |
|---|---|
| ১৫১ আপ | সকাল ৪:০৫ |
| ১৫৩ আপ | সকাল ৮:৪৮ |
| ১৫৫ আপ | বিকেল ৩:১৫ |
👉অন্যদিকে, নবদ্বীপ ঘাট → শান্তিপুর ডাউন পুরোনো সময়সূচীঃ
| ট্রেন নং | ছাড়ার সময় (নবদ্বীপ ঘাট) |
|---|---|
| ১৫২ ডাউন | সকাল ৬:০০ |
| ১৫৪ ডাউন | সকাল ১১:০৫ |
| ১৫৬ ডাউন | বিকেল ৫:১৫ |
কৃষ্ণনগর থেকে নবদ্বীপ ঘাটের মাঝে কৃষ্ণনগর রোড, আমঘাটা, মহেশগঞ্জ এবং নদিয়া - এই চারটি স্টেশন ছিল। আমঘাটা ছাড়া বাকি স্টেশনগুলো ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হয়ে যায়। তবে, কৃষ্ণনগর রোড স্টপেজটি, যা 'রোড স্টেশন' নামে পরিচিত ছিল, আজও মানুষের মনে বেঁচে আছে। নবদ্বীপ থেকে বাসে কৃষ্ণনগর যেতে হলে যাত্রীরা এখনও এই রোড স্টপেই নেমে যান।
গেজ রূপান্তর এবং এক নতুন অধ্যায়
অবশেষে, চরম অবহেলা ও লোকসানের শিকার এই ন্যারো গেজ লাইনটির বিদায়ঘণ্টা বাজে।তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১০ সালের ১৭ই জানুয়ারি গেজ রূপান্তরের ঘোষণা করেন। সেদিনই পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু প্রয়াত হন।
১৮ই জানুয়ারি থেকে শুরু হয় লাইন তুলে ফেলার কাজ। শান্তিপুর জংশন থেকে কৃষ্ণনগর সিটি জংশন পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয় ২০১১ সালের মধ্যে এবং ২০১২ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি এটি ব্রড গেজে রূপান্তরিত হয়ে চালু হয়।
গেজ রূপান্তরের সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, এই রেললাইনটি নবদ্বীপ ঘাটের পরিবর্তে সরাসরি নবদ্বীপ ধাম স্টেশনে গিয়ে মিশবে। এর ফলে পুরনো স্বরূপগঞ্জের স্টেশনটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, লাইনটি মহেশগঞ্জ পেরিয়ে ভাগীরথী নদীর পাড়ে পৌঁছাবে এবং সেখানে একটি নতুন ব্রিজ পেরিয়ে নবদ্বীপ ধামে যুক্ত হবে। তবে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় বর্তমানে এই প্রকল্পটির কাজ থমকে আছে। আমঘাটা পর্যন্ত প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও রেললাইন এবং বৈদ্যুতিক পোলগুলো আজ অযত্নে জঙ্গলের আড়ালে ঢাকা পড়ছে।
🔍 বর্তমান পরিস্থিতি: এক নজরে আজকের অবস্থা
- 📍 পরিত্যক্ত নবদ্বীপ ঘাট স্টেশন: স্বরূপগঞ্জের সেই ঐতিহাসিক নবদ্বীপ ঘাট স্টেশনটি আজ কেবলই স্মৃতি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্টেশন চত্বর এবং পুরনো প্ল্যাটফর্ম বর্তমানে পরিত্যক্ত এবং জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।
- 🏛️ সংগ্রহশালায় নস্টালজিয়া: এই রুটে চলাচলকারী ঐতিহ্যবাহী কিছু ডিজেল রেলবাস কোচ (Railbus) বর্তমানে ইতিহাসের অংশ হিসেবে সংরক্ষিত। পর্যটক ও রেলপ্রেমীদের জন্য এগুলো হাওড়া রেল মিউজিয়াম এবং চেন্নাইয়ের মিউজিয়ামে রাখা হয়েছে।
- 🚧 থমকে যাওয়া ব্রডগেজ প্রকল্প: গেজ রূপান্তরের কাজ শুরু হলেও জমি সংক্রান্ত আইনি জটিলতায় নবদ্বীপ ধাম পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনের কাজ থমকে আছে। আমঘাটা পর্যন্ত ব্রডগেজ ট্র্যাক এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি বসানো হলেও দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেখানেও এখন আগাছা আর জঙ্গলের রাজত্ব।
উপসংহার: শান্তিপুর–নবদ্বীপ ঘাট লাইট রেল এক সময়ের আবেগ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। আজ সেই ছোট ট্রেন হারিয়ে গেলেও স্থানীয় মানুষের স্মৃতি এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতিতে এই নস্টালজিয়া চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।










