খেদাইতলার সাপের মেলা , ৩৫০ বছরের মনসা পূজা ও লোকউৎসব

RAJU BISWAS
0
খেদাইতলার মেলা
📸 মেলায় সাপুড়েরা বিষধর, নির্বিষ এবং দেশি পাহাড়ি নানা প্রজাতির সাপ নিয়ে আসেন।
আমি শ্রাবণ সংক্রান্তির দিনে পুজো দিতে গিয়েছিলাম, নদিয়া জেলার চাকদা থানার বেলে–বিষ্ণুপুর এলাকার মথুরাগাছি গ্রামে, খেদাইতলার মেলা দেখতে ও মনসা পূজা দিতে। সাত শলাকির বিলের ধারে এই মেলা হয়। এই পূজাটি প্রতি বছর শ্রাবণ সংক্রান্তির দিনেই অনুষ্ঠিত হয়।ভোর থেকেই গ্রামে অন্যরকম এক উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে—ঢাকের শব্দ, মানুষের ভিড়, বিশ্বাস আর ভক্তির মিশেলে জায়গাটা যেন হয়ে ওঠে আলাদা এক জগৎ। এই পুজো ও মেলা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি ও মানুষের বিশ্বাসের এক জীবন্ত প্রকাশ।
শুরুতেই বলে রাখা ভালো, খেদাই ঠাকুর একজন সর্পদেবতা। সাপের উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় শ্রাবণ সংক্রান্তির দিনে শুধু গ্রামের মানুষই নয়, আশপাশের এলাকা থেকে শুরু করে নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বহু ভক্ত এখানে এসে পূজা অর্পণ করেন। এই পূজার সঙ্গে পশুপলি প্রথা ও সাপের মেলার প্রচলনও রয়েছে। একত্রিত হয়ে খেদাই ঠাকুরের পূজা করেন। লোকবিশ্বাস আছে, সাপে কাটা বহু মানুষ নাকি খেদাই ঠাকুরের আশীর্বাদে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন।

ইতিহাস ও লোককাহিনি

প্রায় ৩৪০–৩৫০ বছরের পুরোনো এই মেলার সঠিক সূচনাকাল জানা না গেলেও, এই মেলাকে ঘিরে নানা লোককথা আজও প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র লোকমুখে খেদাই ঠাকুরের মাহাত্ম্যের কথা শুনে কৌতূহলী হয়ে এখানে এসেছিলেন এবং কিছু ভূসম্পত্তিও দান করেন। এরপর থেকেই এই পূজোর জাঁকজমক অনেকটাই বেড়ে যায়। তবে বর্তমানে সেই জাঁকজমক অনেকটা কমে এসেছে।
খেদাইতলার মেলা: গৃহস্থালির জিনিস ও বাঁশ-বেতের সামগ্রীর দোকান
📸 মেলায় উপলব্ধ বিভিন্ন পণ্যের সাথে- মাছ ধরার জাল।

🪔 লোকগাথা ও মেলার উৎপত্তি

শোনা যায়, খেদাই নামে এক ব্যক্তি একবার পাট কাটতে গিয়েছিলেন শলাকির বিলে। সেখানে হঠাৎ এক বিশাল বিষধর সাপ তাকে দংশন করে। তিনি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরতে থাকেন।
বাড়ি ফেরার পথে মাঠের মধ্যে তিনি একটি কুলগাছে একাধিক সাপ ঝুলতে দেখেন। ঘটনাটি তিনি স্ত্রী ও মাকে জানালে, তারা কুলগাছের নিচে মনসা দেবীর নাম করে কলার খোলায় দুধ ও কলা দিয়ে মানত করেন।
এরপর ওঝা–কবিরাজ ডাকা হলেও, কাটিঘাঁতে রোগীর উপসর্গ দেখে কেউই তার চিকিৎসা করতে রাজি হয়নি। সেই রাতে তার এক আত্মীয়কে স্বপ্নে মা মনসা দেখা দিয়ে পূজার আদেশ দেন। পরের দিনই ছিল শ্রাবণ সংক্রান্তি।পূজা দেওয়ার পর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যে অসাড়তা দেখা দিয়েছিল, তা কেটে গিয়ে খেদাই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।
"এই অলৌকিক ঘটনা জানাজানি হবার পর থেকেই ওই কুলগাছের নিচে গ্রামবাসীরা মনসা পুজো শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেই জায়গাটি 'খেদাইতলার মেলা' নামে পরিচিতি পায়।"
🌍 শলাকির বিল সংলগ্ন, নদীয়া
খেদাইতলার মেলা: মেলা প্রাঙ্গণ, প্রধান মন্দির নবরত্ন শৈলীতে ইট দিয়ে নির্মিত হচ্ছে
📸 মেলার কামারশালায় দা-কাঁচি, কুড়ুল, নিড়ানি, পাশনি ইত্যাদি পাওয়া যায়।

🐍 বিশেষত্বঃ সাপ ও সাপুড়ে


খেদাইতলার মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো সাপ ও সাপুড়েরা। সারা বছর শনি ও মঙ্গলবার এখানে পূজা হলেও, শ্রাবণ মাসের সংক্রান্তিতে বিশেষ পূজার আয়োজন হয়। এই সময় পশ্চিমবঙ্গের এবং ভারতের বিভিন্ন জেলা থেকে বেদে-বেদিনীরা নানা ধরনের সাপ নিয়ে খেলা দেখাতে বা ভিক্কা করতে আসেন। তবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কারণে আগের মতো সাপুড়েদের ভিড় আর দেখা যায় না। ফলে মেলার ঐতিহ্য কিছুটা ফিকে হয়েছে।
এখানে কোনো মূর্তি নেই—আছে সেই প্রাচীন কুলগাছের গুড়ি। গাছটিও জীবিত নেই। সেই গুড়িকে ঘিরেই নতুন ইটের মন্দির তৈরি হয়েছে। দুধ, চাল, কলা ইত্যাদি দিয়ে হাজারো ভক্ত মনসা মায়ের কাছে তাদের মনোবাঞ্ছা জানান। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই মেলার আরেকটি প্রধান অংশ হলো পাঠা বলি। আগে প্রচুর পাঠা বলি হলেও, এখন তা অনেক কমে এসেছে। তবে এখনও পাঠা বলি দেওয়া হয়।
খেদাইতলার মেলা: গৃহস্থালির জিনিস ও বাঁশ-বেতের সামগ্রীর দোকান
📸 মেলায় বাঁশ ও বেতের নানা সামগ্রী, মাথাল(টোকা), ঝুড়ি থেকে ঘর সাজানোর বিভিন্ন জিনিস।

🤝 মেলার চিত্র ও সম্প্রীতির উৎসব


মেলায় বসে অসংখ্য দোকান—খেলনা, গৃহস্থালির জিনিস, বাঁশ-বেতের সামগ্রী থেকে শুরু করে খাবারের আয়োজন। ভক্তরা মানতের ঢিল বাঁধেন, দণ্ডি কাটেন, মানতের পাঠা বলি দেন। হাজার হাজার মানুষ শুধু পূজা নয়, আনন্দে মেতে ওঠেন মেলার আবহে।
🤝 সম্প্রীতির উৎসব: এই মেলা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি এক অনন্য সম্প্রীতির মিলনক্ষেত্র। শ্রাবণ সংক্রান্তিতে স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই 'অরন্ধন' পালন করেন এবং মেলায় সমবেত হন। এটি প্রমাণ করে যে ধর্মীয় ভেদাভেদ ছাপিয়ে এই মেলা আজ এক বিশাল সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
খেদাইতলার মেলা থেকে কেনা মাথাল বা টোকা
📸এই মেলা থেকে আমি মাঠে কাজ করার জন্য কৃষিকাজের সময় ব্যবহারের একটি মাথাল (টোকা) কিনেছিলাম।

🛒 মেলা ও কেনাকাটা: খেদাইতলার এই মেলায় ফলের রস ও আখের রস, জিলিপি, নিমকি, বাদামভাজা, বিভিন্ন মিষ্টি-মিঠাই, ফুচকা, পরোটা, এগ রোল, লুচি, কলচুরি, ঘুগনি, বেলুন, বাচ্চাদের খেলনা, ঝুড়ি, মাথাল, কাঠের জিনিস, জাল, মাছ ধরার পলো, বাঁশ ও বেতের জিনিস, টেরাকোটা পুতুল, চাষাবাদের নানা যন্ত্রপাতি, মাছ ধরার জাল এবং দা, কাঁচি, কুড়ুল, বঁটি, হাতখুন্তি-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালির সামগ্রী,ও পুজোর বাটা ইত্যাদি পাওয়া যায়। মেলা ঘুরে আমি নিজেও প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনেছি, যেমন—রুটি বেলার বেলন এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত একটি কোদাল, ‘মাথাল’ বা টোকা।

⚠️ বর্তমান চ্যালেঞ্জ: বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কঠোরতার কারণে বর্তমানে মেলায় সাপুড়েদের উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে। তবে সাপুড়ে কম থাকলেও মানুষের ভক্তি ও বিশ্বাসে কোনো ঘাটতি নেই। গ্রামবাংলার এই প্রাচীন লোকসংস্কৃতির টানে আজও প্রতি বছর মেলায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। এই মেলার একটি নিজস্ব ধারা রয়েছে। এক সময় প্রচুর বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ ঝাঁপি কাঁধে নিয়ে সমতল ও পাহাড়ি এলাকার বিষহীন ও বিষাক্ত নানা জাতের সাপ নিয়ে আসতেন। মেলায় যাওয়ার রাস্তার দুই ধারে সাপের খেলা দেখিয়ে তারা ভিক্ষা সংগ্রহ করতেন। এই সাপখেলা ছিল মেলার লোকজ আকর্ষণের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এ বছর খেদাইতলার মেলায় সেই পুরোনো বেদে–সাপখেলার দৃশ্য প্রায় দেখা যায়নি বললেই চলে, কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া।

কীভাবে পৌঁছাবেন খেদাইতলার মেলায়:বাস্তব অভিজ্ঞতা

আমি ও আমার বাবা পুজো দিতে গিয়েছিলাম। আমরা খুব সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে রওনা দিয়েছিলাম। সকাল সাতটার মধ্যেই আমাদের পুজো দেওয়া শেষ হয়ে যায়। এরপর কিছু কেনাকাটা করে আমরা বাড়ির পথে রওনা হই। ফেরার সময় দেখি পুলিশি প্রহরা অনেক কড়া হয়ে গেছে এবং যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।খেদাইতলার এই সুপ্রাচীন মেলায় পৌঁছানোর জন্য রেল ও সড়কপথ উভয়ই বেশ সুগম। তবে মেলার দিনগুলোতে ব্যাপক জনসমাগম ও ভিড় সামলাতে প্রশাসন অত্যন্ত সক্রিয় থাকে।আমাদের বাড়ি থেকে দূরত্ব ছিল প্রায় ২৫ কিলোমিটার, এবং যেতে মোটামুটি ৪০ মিনিট সময় লেগেছিল। আপনার সুবিধার জন্য যাতায়াতের বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

🚂 রেল যোগাযোগ:

  • ১. রানাঘাট–বনগাঁ লাইন: এই লাইনে আসলে আপনাকে গাংনাপুর স্টেশনে নামতে হবে। স্টেশন থেকে চাকদহগামী বাসে উঠে বিষ্ণুপুর মোড়ে নামুন।
  • ২. শিয়ালদহ–রানাঘাট লাইন: এই লাইনে এলে চাকদহ স্টেশনে নামা সবচেয়ে সুবিধাজনক। স্টেশন থেকে বনগ্রামগামী যেকোনো বাস, অটো, টাটা ম্যাজিক বা ট্রেকারে সহজেই বিষ্ণুপুর পৌঁছানো যায়।
খেদাইতলার মেলা: মেলা প্রাঙ্গণ, প্রধান মন্দির নবরত্ন শৈলীতে ইট দিয়ে নির্মিত হচ্ছে
📸 মেলা প্রাঙ্গণ, প্রধান মন্দির নবরত্ন শৈলীতে ইট দিয়ে নির্মিত হচ্ছে ।
⚠️ সড়কপথ ও মেলার বিশেষ সতর্কতা
আপনি যদি নিজের গাড়ি বা বাইক নিয়ে আসতে চান, তবে সরাসরি চাকদহ-বিষ্ণুপুর মোড় পর্যন্ত আসতে পারেন। সেখানে গাড়ি পার্কিং করার নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: মেলার দিন যানজট এড়াতে মূল গ্রামীণ রাস্তাগুলোতে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। ফলে বিষ্ণুপুর থেকে প্রায় ১.৫ থেকে ৩ কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটে যেতে হয়।
খেদাইতলার মেলা: গৃহস্থালির জিনিস ও বাঁশ-বেতের সামগ্রীর দোকান
📸 কাঠ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন জিনিস।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, খেদাইতলার এই সাপের মেলা কেবল একটি প্রাচীন উৎসব নয়, এটি বাংলার লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত ও অমলিন প্রতিচ্ছবি। ৩৫০ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যের টান কতটা গভীর, তা বোঝা যায় মেলার দিনগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখে।
বাস্তবিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, মেলার প্রধান দিনগুলোতে জনজোয়ার সামলাতে মূল রাস্তাগুলোতে যানচলাচল বন্ধ রাখা হয়। ফলে ১.৫ থেকে ৩ কিলোমিটারের সেই মেঠো পথ কিংবা গ্রামের সরু গলিগুলো দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যে বিপুল জনসমাগম চোখে পড়ে, তা এক কথায় অভূতপূর্ব। মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত পদযাত্রা প্রমাণ করে যে, বিশ্বাস আর শেকড়ের টান আজও আধুনিক যান্ত্রিকতার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
সব মিলিয়ে—ধর্ম, লোককথা, আর মানুষের এই অকৃত্রিম মেলবন্ধন খেদাইতলার মেলাকে দিয়েছে এক অনন্য মানবিক উচ্চতা। প্রতি বছরের এই সমাগম কেবল একটি মেলা নয়, বরং এটি আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির এক উৎসবমুখর বিজয়গাথা। আপনি যদি বাংলার আদি সংস্কৃতির সত্যিকারের রূপটি দেখতে চান, তবে এই ১.৫-৩ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে যাওয়ার কষ্টটুকু আপনার কাছে সার্থক মনে হবে, যখন আপনি মেলার সেই প্রাণস্পন্দন অনুভব করবেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to ensure you get the best experience on our website. Learn More
Ok, Go it!