মা হ্যান্টা কালী: মালদহের এক জাগ্রত লোকগাথা

লালপেঁচা (LalPecha.in)
0
মালদহের ঐতিহাসিক মা হ্যান্টা কালী মন্দিরের বিগ্রহ ও গর্ভগৃহ
চিত্র: মালদহের ঐতিহাসিক মা হ্যান্টা কালী মন্দিরের বিগ্রহ ও গর্ভগৃহ

মালদহের ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী মা হ্যান্টা কালী মন্দির: ইতিহাস ও মাহাত্ম্য

মালদহ জেলার আধ্যাত্মিক মানচিত্রে মা হ্যান্টা কালী মন্দির কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং হাজারো মানুষের পরম আস্থার এক ঠিকানা। সম্প্রতি দেশের প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে মালদহের দুই দেবী—মা হ্যান্টা কালী ও মা মনস্কামনা দেবীর নাম উঠে আসায় এই মন্দিরটি নতুন করে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

দুঃখের বিষয় হলো, খোদ পশ্চিমবঙ্গের অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষও এই মহাশক্তিশালী কালীপীঠের মাহাত্ম্য সম্পর্কে এখনো অবগত নন। অনেক সময় 'হ্যান্টা' নামটি শুনে অনেকে না বুঝে বিদ্রূপ বা কটাক্ষ করেন। কিন্তু এই বিদ্রূপ আসলে আমাদের শিকড়, লোকসংস্কৃতি এবং ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতারই পরিচয়। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত—যে কারণই থাক না কেন, ভক্তির কাছে এজাতীয় অবজ্ঞা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।

তবে বিতর্ক সরিয়ে রেখে যদি আমরা এই মন্দিরের আধ্যাত্মিক গভীরতায় প্রবেশ করি, তবে এক অনন্য অনুভূতির দেখা মেলে। আমার এক ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুর বাড়ি এই মন্দির সংলগ্ন এলাকায়। তার শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা এই দেবীর চরণে। তার মুখ থেকেই শুনেছি, ১৯৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই মন্দিরটি কীভাবে মালদহবাসীর ভরসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মা এখানে অত্যন্ত 'জাগ্রত'। মানুষ যখন জীবনের কঠিন সময়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন মায়ের কাছে এসে করা প্রতিটি আকুল প্রার্থনা বা 'মানত' বিফলে যায় না। লৌকিক বিশ্বাস আর আধ্যাত্মিকতার এই অপূর্ব মিলনই মা হ্যান্টা কালীর প্রকৃত শক্তি।

আজকের এই ভ্রমণে আমরা কোনো বিতর্কে নয়, বরং আপনাদের নিয়ে যাব সেই পবিত্র ভূমিতে—যেখানে লোকবিশ্বাস আর ইতিহাস মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য শক্তিক্ষেত্র। চলুন জেনে নিই, মালদহ শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত সেই মহিমাঘেরা মা হ্যান্টা কালীর মন্দিরের আসল কাহিনী।

মন্দিরের ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য

হ্যান্টা কালী মন্দির এতটাই প্রাচীন যে এর সূচনাকাল সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক তথ্য আজ আর পাওয়া যায় না। লোকমুখে প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই শক্তিপীঠ বহু যুগ ধরেই ভক্তদের আরাধনার কেন্দ্র। তবে ভারতের স্বাধীনতার বছর ১৯৪৭ সালে মন্দিরটি নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সুশৃঙ্খল রীতিতে দেবীপূজা শুরু হয়—যা বর্তমান মন্দির পরম্পরার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তার আগে মালদহের চাঁচলের রাজা শরৎচন্দ্র এই পুজোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। মালদহের ইংরেজবাজার পুরসভার চার নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যেই পড়ে হ্যান্টা কালীর মন্দির।

মালদা শহরের নিকটবর্তী অঞ্চল, বিশেষত ইংরেজবাজারের গঙ্গাবাগ এলাকায় অবস্থিত মা শ্রীশ্রী হ্যান্টা কালী-যিনি লোকমুখে দশমহা মহাকালী নামেও পরিচিত- এই শক্তিদেবীপীঠটি আজও ভক্তদের গভীর আস্থার কেন্দ্রবিন্দু।

  • প্রতিষ্ঠা: মালদহের PWD মোড় সংলগ্ন এলাকায় ১৯৪৭ সালে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • পূজা পদ্ধতি: কলকাতার বিখ্যাত ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির মতো এখানেও সম্পূর্ণ তান্ত্রিক মতে দেবী আরাধনা করা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী এখানে অত্যন্ত জাগ্রত।
  • দেবীর স্বরূপ: এখানে মূলত চণ্ডী দেবীর আরাধনা করা হয়। মালদহ শহরের অন্যতম প্রাচীন কালী মন্দির হিসেবে এটি সুপরিচিত।
  • উৎসব: প্রতি বছর বৈশাখী পূর্ণিমায় এখানে বিশাল মেলা বসে। পশ্চিমবঙ্গ ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যের বহু ভক্ত এই মেলায় সমবেত হন।

প্রেক্ষাপট: প্রধানমন্ত্রী ও হ্যান্টা কালী প্রসঙ্গ

সম্প্রতি মালদহে বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের উদ্বোধন ও জনসভা চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর ভাষণে "জয় মা হ্যান্টা কালী" ধ্বনি উচ্চারণ করেন। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানাবিধ আলোচনা বা ট্রোলিং হলেও, স্থানীয় ইতিহাস ও বাস্তব তথ্য বলছে যে—মা হ্যান্টা কালী কোনো কাল্পনিক নাম নয়। মালদহের NH-34 সংলগ্ন হ্যান্টা কালী মোড় এলাকায় এই মন্দিরটি দীর্ঘকাল ধরে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে এবং এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের এক গভীর বিশ্বাসের জায়গা।

কীভাবে যাবেন মা হ্যান্টা কালী মন্দিরে

মা শ্রীশ্রী হ্যান্টা কালী বা দশমহা মহাকালী মন্দিরটি মালদা শহরের অদূরে, ইংরেজবাজার সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। মালদা টাউন থেকে ইংরেজবাজারের দিকে এগোলে জাতীয় সড়ক NH-12 (পুরনো NH-34) বরাবর পৌঁছতে হবে হ্যান্টা কালী মোড়। এই মোড়ের একেবারে পাশেই, সিঙ্গাতলা এলাকায় অবস্থিত মা হ্যান্টা কালী মন্দির।

সম্পূর্ণ ঠিকানা:
মা হ্যান্টা কালী মন্দির
NH-12 (পুরনো NH-34),
হ্যান্টা কালী মোড়, সিঙ্গাতলা,
মালদহ – ৭৩২১০৩

অন্যদিকে, যারা মালদার আরেক জনপ্রিয় শক্তিপীঠ মা মনস্কামনা মন্দির দর্শন করতে চান, তাঁদের যেতে হবে ৪২০ মোড়, মনস্কামনা রোড এলাকায়।

মা মনস্কামনা মন্দিরের ঠিকানা:
৪২০ মোড়, মনস্কামনা রোড,
মালদহ

এই দুই শক্তিপীঠই মালদার আধ্যাত্মিক মানচিত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এবং সারা বছরই ভক্তসমাগমে মুখরিত থাকে।

© চিত্রস্বত্ব: এই নিবন্ধে ব্যবহৃত আলোকচিত্রসমূহ মালদহ নিবাসী শিউলি বন্দ্যোপাধ্যায়ের (ইঞ্জিনিয়ার) ব্যক্তিগত সৌজন্যে প্রাপ্ত। জনস্বার্থে এবং গবেষণামূলক কাজে ব্যবহারের জন্য এগুলো অনুমতিপ্রাপ্ত। অনুমতি ব্যতিরেকে বাণিজ্যিক ব্যবহার বা পুনঃপ্রকাশ আইনত নিষিদ্ধ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to ensure you get the best experience on our website. Learn More
Ok, Go it!