Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Test link

Search Suggest

মানিক পীর: বাংলার পশুরক্ষক লৌকিক দেবতা ও রাউতারা দরগার প্রাচীন ইতিহাস

বাংলার লোকদেবতা মানিক পীরের ইতিহাস, লোককথা ও হাওড়ার রাউতারা দরগার প্রাচীন কাহিনী জানুন। পশুরক্ষক পীর ও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির .
মানিক পীর বাংলার লোকবিশ্বাস
মানিক পীর-বাংলার পশুরক্ষক লৌকিক দেবতা 

বাংলার লোকবিশ্বাস ও পল্লীজীবনের ইতিহাসে মানিক পীর এক বিশেষ শক্তির অধিকারী দেবতা। মানুষ বিশ্বাস করে—তিনি পশুরক্ষক, রোগনাশক ও আশীর্বাদদাতা। আবার অন্যদিকে, অবিশ্বাসীদের প্রতি রুষ্ট হলে শাস্তিও প্রদান করেন।

📜 মানিক পীরের প্রথম পরিচয় – লোককথার আলোয়ে

"মানিক—পীর—ভবনদীর পারে যাবার না"। 'না' অর্থাৎ নৌকা, মানিক পীর মুক্তিকামীদের বাহনস্বরূপ। সাংসারিক বা সামাজিক বিষয়ে তিনি ভক্তদের বহু রূপে উপকার করেন, কিন্তু অবিশ্বাসীদের অমঙ্গলও করেন, পল্লীর পরিব্রাজক ফকিররা গেয়ে থাকে—

'সুবুদ্ধি গোয়ালার মেয়ে কুবুদ্ধি ঘটিল।
বাছালিতে দুগ্ধ রাখি পীরকে ভাঁড়াইল-'

গোয়ালার মেয়েটি বুদ্ধিমতী কিন্তু গ্রহের ফেরে কুবুদ্ধি হল। ফকির বেশি পীর তার কাছে দুধ চাইতে মিথ্যা বললে-'দুধ নেই'। সে জানত না ওই ফকির যে-সে নয়-স্বয়ং মানিক পীর।

"মাথায় রঙ্গিন টুপি ব্যেধের জাম্বিল।
হাতে লয়ে আসাবাড়ি ফেরে মানিক পীর।।"

মানিক পীরের এক হাতে আসাদণ্ড অপর হাতে ব্যাধির জাম্বিল, অর্থাৎ পাত্র। সে পাত্র বহুবিধ রোগের বীজাণুপূর্ণ। তিনি ক্রুদ্ধ হলে ওই বীজগুলি দ্বারা নিমেষের মধ্যে বহু জীব ধ্বংস করতে পারেন। গোয়ালার মেয়ের উপর ক্রুদ্ধ হয়ে মানিক পীর চলে যেতেই দেখা গেল তার গোয়ালের সব গরু বাছুর মরে গেছে। গোয়ালা-পাড়ার মধ্যে মহা আতঙ্কের সৃষ্টি হল। সবাই-এমনকি বৃদ্ধ মোড়লও, ছুটল ওই ফকিরের উদ্দেশ্যে। কিছু দূরে নদীর তীরে ফকিরকে পেয়ে সবাই তার পায়ে লুটিয়ে পড়ল। পীর-আশুতোষ, অল্পেই তাঁর রাগ পড়ে গেল। মৃত গরু বাছুরদের বাঁচিয়ে দিলেন, আত্ম পরিচয়ও দিলেন। গোয়ালারা তাঁকে ভক্তি শ্রদ্ধা করতে শুরু করলে-জগতে মানিক পীরের পূজা হাজোত প্রবর্তন হল।

📖 জহুরানামা ও মর্ত্যে মানিক পীরের আগমন

পশুরক্ষক দেবতা মানিক পীরের খ্যাতি বহুকাল অবধি আছে। মধ্যযুগে পল্লী কবিদের রচিত তাঁর মাহাত্ম্য গান বা কাব্য কেচ্ছায় সন্ধান পাওয়া যায়। মানিক পীরে জহুরানামা কয়েকটি মুদ্রিতও হয়েছে। জহুরানামাগুলি মঙ্গলকাব্য জাতীয় রচনা, এতে 'স্বর্গখণ্ড', 'মর্ত্যখণ্ড'ও আছে। বেহেস্তের সভায় বসে খোদা একদিন জাহির করলেন—

"-সেই জনে দিব আমি দুনিয়ার ভার-
কলিকালে মানিক হবে অবতার"

মর্তে বাদশা কন্যা দুধবিবি মহাভক্তিমতী। একদিন নদীতে স্নান করতে গিয়ে তীরে ঝোপের মধ্যে দেখলেন, একটি সুন্দর বালক, শিশু বললেই হয়। তাকে দেখে বাদশাজাদির কেমন মায়া হল। তার কাছে গিয়ে পরিচয় জিজ্ঞাসা করতে বালকটি আধ আধ স্বরে বললে—

"মানিক দেয়ান বলে শুন বলি মাই,
দুনিয়াতে ফিরি আমি মা বাপ নাঞি"

দুধবিবির চোখে জল এলো তিনি বালকটিকে ঘরে এনে পালন করলেন। এই মানিক পরবর্তীকালে পশুরক্ষক দেবতা-মানিক পীর বলে খ্যাত হলেন। হিন্দু মুসলমান তাঁকে সমান ভক্তি করতে লাগলেন। কালক্রমে ইনি বাংলা দেশের বিভিন্ন জেলার হিন্দু-মুসলমানদের একটি লৌকিক দেবতায় উন্নীত হয়েছেন। চব্বিশ পরগণা, খুলনা (বর্তমানে বাংলাদেশে) হুগলী, নদীয়া প্রভৃতি জেলায় মানিক পীরের থান বা দরগা দেখা যায়, তবে প্রথমোক্ত জেলার পূর্ব ও দক্ষিণ অঞ্চলে এখনও এঁর প্রাধান্য আছে। ওই দুই অঞ্চলে মানিক পীর অপর লৌকিক হিন্দু দেবতার সঙ্গে এক থানে অবস্থানও করেন, পৃথক দরগা ত আছেই।

🏺 মানিক পীরের স্বরূপ ও পূজা পদ্ধতি

মানিক পীরের মূর্তি বিরল, এঁর প্রতীক-সমাধি বা ক্ষুদ্র স্তূপই বেশি ক্ষেত্রে দেখা যায়। পূর্ণ বা মনুষ্যাকৃতি মূর্তি লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, সামান্য দু' এক স্থানে এঁর পূর্ণ মূর্তি আছে। নতুন মূর্তি আর কেউ গঠন করে না মনে হয়, কিছুকাল পরে এঁর পূর্ণ মূর্তি আর দেখা যাবে না। মানিক পীরের আকৃতি অতি সুন্দর, দেহের বর্ণ শ্বেত (দু' এক পল্লীতে মেঘের মতও আছে)। মাথায় বারী চুলের ওপর ছোট তাজ বা পাগড়ী, চোখ দুটি বিশাল। পোশাক পরিচ্ছদ কোন কোন স্থানে হিন্দু পৌরাণিক দেবতার মত। দু' এক পল্লীতে কালো রংয়ের আলখাল্লা টুপিও দেখা যায়, তবে উভয় স্থানেই এঁর এক হাতে আসাদণ্ড অপর হাতে তস্বী বা জপমালা থাকে।

মানিক পীরের পূজা হাজোতের কর্তা-মুন্সী বা খাদেম সব ক্ষেত্রেই মুসলমান ফকিররাই হন। মুন্সীরা পল্লী সমাজে বেশ সম্মান পান হিন্দু পুরোহিতদের মতই। এঁদের স্পর্শ করা নৈবেদ্য বা সির্নি বর্ণহিন্দুরাও সভক্তিতে গ্রহণ করেন। সির্নি দু' প্রকার হয়— ফল-মূল, মিষ্টান্ন, এলাচদানা প্রভৃতি এবং আটা-ময়দা বা চালের গুঁড়া, দুধ (বা ক্ষীর), গুড়, কলা মিশ্রিত করেও সির্নি করা হয়। ধনী ভক্তরা আতর কিংবা গোলাপজল কেউ কেউ দেন। মুন্সী পীরের সামনে ধর্মশাস্ত্র থেকে দু'একটি বয়েত আবৃত্তি করে হাজোত উৎসর্গ করেন। শিক্ষিত ফকিররা হাজোত অন্তে 'জহুরানামা' ও অন্য শাস্ত্রীয় কেতাব পাঠ করেন।

মানিক পীরের হাজোত কোন কোন স্থানে বৃহস্পতিবার, কোন স্থানে শনি-মঙ্গলবারেও হয়। বিশেষ বা সমারোহের সঙ্গে গ্রামগতভাবেও মানিক পীরের হাজোত অনুষ্ঠিত হয়। দেশে গো-মড়ক দেখা দিলে পল্লীর হিন্দু-মুসলমান গৃহস্থরা সকলে বারোয়ারীভাবে পূজা-হাজত দেয়। চাষীরা মানিক পীরকে খুবই ভক্তি করে, গরু দুধ দেওয়া আরম্ভ করলে প্রথম দিনের দুধ মানিক পীরের দরগায় দিয়ে আসে।

🛡️ ওঝাগিরি ও গ্রামবন্ধন প্রথা

মানিক পীরের সেবক ফকিররা গৃহপালিত পশুর রোগ নিরাময়ের জন্যে বহুপ্রকার টোটকা দাওয়াই-জলপড়া, তেলপড়া ইত্যাদি দিয়ে থাকেন। দেশে মহামারী বা গো-মড়ক প্রাদুর্ভূত হলে তাঁরা ওঝা-গিরি করেন, মন্ত্র-তন্ত্র ঝাড়ফুঁক দ্বারা গ্রামবন্ধন করেন। ওঝা-ফকিররা গ্রামবন্ধনকল্পে অনেক সময় চারটি বাঁশের খুঁটি মন্ত্রপূত ক'রে পল্লীর চারদিকে পুঁতে দেন। কোন কোন ফকির কয়েকটি ছোট ছোট সরায় লাল কালিতে বয়েৎ লিখে গ্রামের সর্বত্র বিশেষ করে পথের তেমাথায় বাঁশের খুঁটিতে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে দেন। মানিক পীরের 'দোহাই' ও 'ফুলী' জাহির করেন। পল্লীবাসীদের বিশ্বাস, ফকিরদের এই প্রক্রিয়ার জন্য তারা ও তাদের গৃহপালিত পশুপক্ষী মহামারী বা মড়কের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাবে।

🕌 মানিক পীরের দরগা, রাউতারা (হাওড়া) সারণি 🗺️

বিভাগ বিবরণ
অবস্থানহাওড়া জেলা, আমতা ২ নং ব্লক, রাউতারা গ্রাম।
গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানারাউতারা বাসস্ট্যান্ডের সামান্য দক্ষিণে রাস্তার ওপর অবস্থিত।
যাতায়াতহাওড়া স্টেশনের বাসস্ট্যান্ড থেকে ঝিকিরার বাস ধরে রাউতারা পর্যন্ত।
সময়প্রায় ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট।
নির্মাণ কাল১৭৯৭ খ্রীষ্টাব্দ (দু'শ বছরেরও বেশি প্রাচীন)।
স্থাপত্যদোচালা বা একবাংলা রীতির।
অভিমুখপূর্বমুখী।
প্রতিষ্ঠাতাএক সভ্রান্ত হিন্দু কর্তৃক নির্মিত।
বার্ষিক উৎসব২রা বৈশাখ পীরের বাৎসরিক উৎসব ও মেলা বসে।
শিক্ষণীয় দিকএকটি হিন্দু পরিবার দরগাটি চমৎকারভাবে রক্ষা করে চলেছেন।

মানিক পীর (বা অন্য পীর গাজীরা) মুসলমান ধর্মীদের আরাধ্য হবে এটা স্বাভাবিক কিন্তু তিনি হিন্দুদের পূজ্য হলেন কি করে? শাসক শ্রেণির সাথে সম্পর্কের কারণে লোকে ভয় পেত ঠিকই, কিন্তু ভক্তি করার কারণ ভিন্ন। প্রধান কারণ, পীর গাজীরা লোকধর্মের বিরুদ্ধে ছিলেন না। তারা প্রচলিত ধর্মকর্মে নরবলির বিশেষ বিরুদ্ধে ছিলেন। এছাড়া তারা অলৌকিক শক্তির অধিকারী এবং কবিরাজী বা হাকিমী চিকিৎসায় দক্ষ ছিলেন। মানিক পীর পশুপক্ষীর রোগ মুক্ত করতে পারতেন বলেই সাধারণ মানুষের কাছে ভক্তি শ্রদ্ধার পাত্র এবং লৌকিক দেবতায় উন্নীত হন।

🕌 মানিক পীর: বাংলার লৌকিক দেবতা সংক্রান্ত তথ্য সারণি

বিভাগ বিবরণ
মূল পরিচয়পশুরক্ষক, রোগনাশক এবং আশীর্বাদদাতা লৌকিক দেবতা।
সাহিত্যে উল্লেখমধ্যযুগের 'জহুরানামা' বা কাব্য কেচ্ছা।
উৎপত্তিদুধবিবির পালিত পুত্ররূপে পরিচিতি।
পূজিত অঞ্চলচব্বিশ পরগণা, খুলনা, হুগলী, নদীয়া।
আকৃতিশ্বেত বর্ণ, বিশাল চোখ, মাথায় তাজ, এক হাতে আসাদণ্ড ও অন্য হাতে তসবী।
পূজা পদ্ধতিহাজোত (পূজা), সির্নি নিবেদন।
সেবকদের কাজপশুর রোগ নিরাময়ে টোটকা ও গ্রামবন্ধন।

শেষ কথা

মানিক পীর কেবল একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন, বরং তিনি বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীক। হাজার বছর ধরে গ্রামবাংলার হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ যেভাবে তাঁকে ভক্তি ও শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছেন, তা আমাদের লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। বিশেষ করে পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল গ্রামীণ সমাজে তাঁর প্রভাব আজও অনস্বীকার্য।

রাউতারা গ্রামের মতো প্রাচীন দরগাগুলো আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আধুনিক সভ্যতার ভিড়ে আমাদের এই শিকড়ের কাহিনীগুলো হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়। আশা করি, আজকের এই গবেষণাধর্মী নিবন্ধটি আপনাদের মানিক পীরের প্রকৃত স্বরূপ এবং বাংলার লোকজীবন সম্পর্কে নতুন কিছু জানতে সাহায্য করেছে। বাংলার আরও এমন অজানা লোকবিশ্বাস ও ইতিহাস জানতে আমাদের সাথেই থাকুন।

আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন

বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ইতিহাস বিষয়ক আরও তথ্যের জন্য আমাদের ফলো করুন:

Our Digital Platforms LalPecha.in: Bengali stories on local news, folk culture, and rural life. IndiaTravelGuide: English guide to Indian culture, festivals, and customs. LOKLOGY: YouTube storytel…

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন