সত্যনারায়ণ সত্যপীর: বাংলার লোকদেবতার সমন্বয়, উৎপত্তি এবং পূজার নিয়ম

RAJU BISWAS
0

সত্যনারায়ণ বা সত্যপীর পূজার্চনা উপাসনা ভারতের বিভিন্ন অংশে অনেক অনেক হিন্দু ও মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রচলিত আছে বহু শতাব্দী হতে। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা প্রদেশের প্রায় সর্বত্র এবং পাঞ্জাবের জলন্ধর ও দাক্ষিণাত্যের মহীশূর অঞ্চলে এর প্রাধান্য লক্ষিত হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও উৎপত্তি

জানা যায়-মহাভারতে সত্যনারায়ণের অনুরূপ দেবতা-সত্যবিনায়ক এবং স্কন্দ পুরাণের রেবাখণ্ডে সত্যনারায়ণ দেবতার উল্লেখ কিছু কিছু আছে। বাংলার মুসলমান সমাজের উপাস্য-সত্যপীর ও ভক্ত সত্যনারায়ণ অনুরূপ দেবতা 'সত্যদেব' বাংলার নাথ যোগী জাতির উপাস্য देवताओं অন্যতম।

সমন্বয় ও অভিন্নতা

মহারাষ্ট্রের প্রায় প্রত্যেক হিন্দুর গৃহে সত্যবিনায়ক দেবতার পূজা হয়ে থাকে। কিন্তু মহাভারতে বর্ণিত সত্যবিনায়ক বা স্কন্দ পুরাণে উল্লিখিত সত্যনারায়ণ পূজার্চনা বা পূজার বিধি-বিধান ভক্তজনের ধারণা-বিশ্বাসের সঙ্গে বর্তমানকালে (বা গত কয়েক শতাব্দী হতে) ব্যাপক প্রচলিত সত্যনারায়ণ পূজার্চনায় পার্থক্য দেখা যায় এবং শাস্ত্রীয় অপেক্ষা যে সকল লোকায়ত বা শাস্ত্রেতর বিধানের প্রাধান্য লক্ষিত হয়, সেগুলি থেকে ধারণা আসে যে, সত্যনারায়ণ পূর্ণ ভাবে শাস্ত্রীয় দেবতা বা প্রাচীন যুগীয় না হতেও পারেন।

একেবারে অনুরূপ মুসলমান সমাজের সত্যপীরে বেলায় একই মন্তব্য করা যেতে পারে। লোকায়ত বিধানে এবং ভিন্ন পরিবেশে পূজিত বা উপাসিত হলেও সত্যনারায়ণ ও সত্যপীর মূলত একই উপাস্য বহু গবেষক সেরূপ মন্তব্য করেছেন। দুই সমাজের দুই উপাসিত দেবতার সমন্বয় বা অভিন্নতার এবং উৎপত্তির বিষয় এ প্রবন্ধে অন্যতম আলোচ্য।

লৌকিক দেবতা বিষয়ে কোন কোন গবেষক মন্তব্য করেছেন-সত্যনারায়ণ পূজা আদি মধ্য যুগে পরিকল্পিত হয় এবং এদেশে হিন্দু সমাজের মধ্যে প্রচলিত থাকে; পরে ভারতে মুসলমান অধিকারের পর, সে পূজার্চনা পল্লীর ধর্মান্তরিত মুসলমান সমাজের লোকেরা, জন্মগত বা বংশগত সংস্কারের প্রভাবে গ্রহণ করেন, কিন্তু তাঁরা, অত্যধিক নিষ্ঠাবান মোল্লা মৌলভির আপত্তির বা বিরক্তির আশঙ্কায় সত্যনারায়ণের 'নারায়ণ' পরিবর্তে 'পীর' শব্দ যুক্ত করে সত্যপীর নাম করে নেন, ফলে জনপদ সমাজে সকল শ্রেণীর মুসলমানের সত্যপীর উপাসনায় কোন শংকা থাকে না। তবে এটা অনুমান মাত্র।

মধ্যযুগের সাহিত্যে সত্যপীর ও সত্যনারায়ণ

মধ্য যুগে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কবিদের রচিত সত্যনারায়ণ বা সত্যপীরের মাহাত্ম্য বিষয়ক কাব্য বা পাঁচালীগুলির মধ্যে সত্যনারায়ণ ও সত্যপীর অভিন্ন বলে প্রচার থাকে। এ সকল দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে ধারণা হতে পারে-সত্যনারায়ণ ও সত্যপীর আদিতে যাই থাকুন বর্তমানে গত কয়েক শতাব্দী বা মধ্যযুগ হতে হিন্দু ও মুসলমানদের একটি সমন্বিত দেবতা।

(নিষ্ঠাবান উচ্চ বর্ণের হিন্দু সমাজে শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ পুরোহিত দ্বারা সত্যনারায়ণের (বিষ্ণুর) শালগ্রাম প্রতীকে এবং সংস্কৃত ভাষায় রচিত ধ্যান মন্ত্রে পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, পুরোহিতরা প্রচার করেন-বিষ্ণু ও সত্যনারায়ণ অভিন্ন, কিন্তু পুজার নৈবেদ্যের মধ্যে শিরনি ও পাঁচটি মোকাম এবং প্রতীকের আসনের উপর একটি ক্ষুদ্রাকৃতি লৌহ অস্ত্র রাখা আবশ্যিক রীতি বা বিধান দেখা যায়। হিন্দুদের কোনও শাস্ত্রীয় বা লৌকিক দেবতার পূজায় শিরনি বা মোকাম নৈবেদ্য রূপে থাকে না বা দেবতার মূর্তি-প্রতীকের আসনের উপর কোন অস্ত্রও রাখার রীতি নেই। উপাস্যের উদ্দেশ্যে শিরনি বা মোকাম উৎসর্গ করা সম্পূর্ণ মুসলমানি প্রথা। 'শিরনি' ও 'মোকাম' দুটিই ফারসী শব্দ।)

শঙ্কর আচার্যের পুঁথি থেকে উদ্ধৃতি:

"একদা বৈকুণ্ঠ ধামে চিন্তে নারায়ণ।
মর্ত্যেতে কলহ সকল ধর্মের কারণ।
সকল আপদের সেরা ধর্মের কলহ।
পৃথিবী ভাসিয়ে যায় রক্ত অহরহ।
মিলাতে সকল ধর্ম কামনা আমার।
সত্যপীর রূপে আমি হব অবতার।
ফকিরের বেশে আমি ধরায় যাইব।
নরধর্ম রীতি শিক্ষা প্রচার করিব।
কেহ বা ডাকিবে মোরে সত্যপীর বলি।
পীর আর নারায়ণ একই সকলি।"

অষ্টাদশ শতকের 'শিবায়ন' রচয়িতা-কর্ণগড় রাজসভার বিখ্যাত পণ্ডিত-রামেশ্বর ভট্টাচার্য তাঁর কাব্যের নাম দিয়েছিলেন 'সত্যনারায়ণের কথা', সেখানে তিনি বলেছেন-

"সত্য সত্য সত্যপীর সর্ব সিদ্ধিদাতা।
বাঞ্ছা বড় বাড়িল বর্ণিব এব কথা।"
"জয় জয় সত্যপীর, সনাতন দস্তগীর।
দেব দেব জগতের নাথ।"
"কে জানে তোমার তত্ত্ব, তুমি রজঃ তমঃ সত্ব-
তোমার চরণে প্রণিপাত।।"

ধর্মীয় সমন্বয়ের কারণ ও সমাজতত্ত্ব

রাজকবি-রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র লিখেছেন- "ফকির শরীর ধরি, হরি হৈলা অবতরি, এক বৃক্ষতলে কৈল স্থান।" কবি কৃষ্ণহরি দাস তাঁর কাব্যে বলেছেন- সত্যনারায়ণ মালঞ্চা নামক স্থানের রাজকন্যার গর্ভে জন্মেছিলেন।

"হাসিয়া কহিছে সত্যনারায়ণ।
নাম নিলে জাতি নষ্ট করে কোন জন॥
এক ব্রহ্ম ভিন্ন আর দুই ব্রহ্ম নাই।
সংসারের কথা (ধাতা) এক নিরঞ্জন গোঁসাই ।।
সেই নিরঞ্জন নাম বিশমোল্লা হয়।
বিষ্ণু আর বিশমোল্লা কভু ভিন্ন নয়।"

এই সকল শিক্ষিত ব্রাহ্মণ কবিদের রচনা থেকে ধারণা করা যায় যে, মধ্যযুগে হিন্দু সমাজেও বিশ্বাস ছিল-সত্যনারায়ণ ও সত্যপীর অভিন্ন বা সমন্বিত দেবতা। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ যোড়শ শতকের মুসলমান কবি ফয়েজুল্লাহ এবং ওয়াজিদ আলির কাব্যেও অনুরূপ বিশ্বাস দেখা যায়।

উপাসনার লোকায়ত রূপ

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের পল্লীতে সত্যপীরের উপাসক এক শ্রেণীর মুসলমান ফকির দেখা যায় যাঁরা হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মঙ্গলের উদ্দেশ্যে দরগায় সত্যপীরের আরাধনা করে থাকেন। পল্লীর সকল ধর্মের ও বর্ণের ভক্তরা পীরের দরগায় পূজা হাজোত দেন। হিন্দু গৃহে অনুষ্ঠিত সত্যনারায়ণ পূজার নৈবেদ্য-শিরনি, খানদানী মুসলমানরা অনেকে গ্রহণ করেন।

সমন্বয়ের প্রধান কারণসমূহ:

  1. সুফীবাদ ও দরবেশদের প্রচার।
  2. শ্রীচৈতন্যদেবের জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে প্রেমধর্ম।
  3. সুলতান হুশেন শাহের হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে মিলন প্রচেষ্টা।
  4. বাদশাহ আকবরের 'দীন-ই-ইলাহী'।
  5. সমাজতাত্ত্বিক কারণ: দীর্ঘকাল একত্রে বসবাসের ফলে আচরণ ও চিন্তার সমন্বয় (Synchronism of diffusion)।

প্রতীক ও পূজা বিধান

দেবদেবীর মূর্তি-পূজক হিন্দুসমাজেও সত্যনারায়ণের বিশিষ্ট কোন মূর্তি দেখা যায় না। বর্ণহিন্দু সমাজে শালগ্রাম শিলা পূজিত হলেও, অনুন্নত পল্লী সমাজে লোহার সরু শিক লাল কাপড়ে জড়িয়ে গদার মতো প্রতীক ব্যবহার করা হয়। ডোম পুরোহিতরা অনেক সময় মাটির ভাঁড় বা পিতলের কলসীতে সিঁদুর মাখিয়ে প্রতীক তৈরি করেন। অন্যদিকে, সত্যপীরের দরগায় একটি পিঁড়ির উপর মাটির ক্ষুদ্র স্তূপ এবং একটি ক্ষুদ্র লৌহ অস্ত্র বা ছোরা রাখা হয়।

উপসংহারে বলা যায়, সত্যনারায়ণ ও সত্যপীর পূজা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাংলার হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব মিলনের স্মারক।

×

Quick Inquiry

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to ensure you get the best experience on our website. Learn More
Ok, Go it!