যোগ্যাদ্যা হলেন বাংলার একজন প্রাচীন লোকদেবী এবং ৫১টি শক্তিপীঠের অন্যতম প্রধান দেবী। তাঁর প্রধান মন্দিরটি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট ব্লকের কাছে ক্ষীরগ্রাম গ্রামে অবস্থিত। এই মন্দিরটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কালী মন্দির।
এছাড়াও, হুগলি জেলার অন্যতম প্রধান গ্রামদেবতা ষণ্ডেশ্বর জীউ-এর মন্দির চত্বরেও উত্তর দিকে একটি যোগাদ্যা দুর্গামন্দির রয়েছে, যা এই দেবীর জনপ্রিয়তা ও বিস্তারকে প্রতিফলিত করে।
বর্ধমান, ক্ষীরগ্রাম একটি শক্তিশালী সিদ্ধপীঠ এবং শক্তিপীঠ হিসেবে সম্মানিত, যেখানে দেবী যোগ্যাদ্যা অত্যন্ত ভক্তি সহকারে পূজা করা হয়। শতাব্দী প্রাচীন কিংবদন্তি এবং ঐশ্বরিক অলৌকিকতায় সমৃদ্ধ, এই স্থানটি বাঙালি আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধারণ করে।
যোগাদ্যা মাতা মন্দিরের বিবরণ ও ইতিহাস
মা যোগ্যাদ্যা মন্দিরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য অতুলনীয়। মহিরাবন নামক রাক্ষসের মৃত্যুর পর, দেবী মহামায়া, ঐশ্বরিক নির্দেশ অনুসরণ করে, হনুমানকে ভদ্রকালীকে ক্ষীরগ্রামে নিয়ে আসার জন্য নিযুক্ত করেছিলেন, যেখানে তিনি শ্রী শ্রী যোগ্যাদ্যা মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। পরবর্তীকালে, ভগবান বিশ্বকর্মা গ্রামের কেন্দ্রস্থলে একটি সুন্দর মন্দির নির্মাণ করেন, যা দুর্ভাগ্যবশত সময়ের সাথে সাথে ধ্বংস হয়ে যায়।
ইতিহাসের মোড় ঘুরে পরবর্তীতে রাজা হরি দত্ত এই মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন। তবে সময়ের নিষ্ঠুরতায় কালাপাহাড় বাহিনীর আক্রমণে মন্দিরটি আবারও ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। অবশেষে, ১২৪৮ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমানের রাজা কীর্তিচন্দ্র বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করেন, যা আজ এক ঐশ্বরিক শক্তি এবং স্থাপত্য মহিমার আলোকবর্তিকা হিসেবে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।
দশভুজা যোগাদ্যা মায়ের মূর্তি ও শিল্পী নবীনচন্দ্র ভাস্কর
বাংলার লোকগাথার পাতায় ১২৮৪ সালের আগের এক বিষণ্ণ অধ্যায় লুকিয়ে আছে। তখন ক্ষীরগ্রামের মন্দিরে পূজিত হতো দেবী দশভুজার মূল কোস্তিপাথর বা পাথরের মূর্তি। কিন্তু মহাকালের নিয়মে এই প্রাচীন মূর্তির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের পুরোহিতদের রীতিনীতি অনুযায়ী, খণ্ডিত বা ক্ষতিগ্রস্ত দেবতার পূজা করা শাস্ত্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ। তাই অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে এবং গভীর শ্রদ্ধার সাথে সেই আদি মূর্তিটিকে ক্ষীর দিঘির (বৃহৎ পুকুর) পবিত্র অতল জলে বিসর্জন দেওয়া হয়।
মায়ের সেই শূন্য সিংহাসন পূর্ণ করতে এগিয়ে এলেন রাজা কীর্তিচন্দ্র। তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায় ভাস্কর সম্প্রদায়ের এক প্রবাদপ্রতিম শিল্পী, নবীন চন্দ্র ভান্ডারী-কে দায়িত্ব দেওয়া হলো মা যোগ্যাদ্যার একটি নতুন পাথরের মূর্তি নির্মাণের। নবীন চন্দ্র তখন তাঁর জাদুকরী ভাস্কর্যের জন্য সারা বাংলায় সমাদৃত। এর আগেই তিনি ১২৫৯ বাংলা বর্ষে মা ব্রহ্মময়ী এবং ১২৬২ সালে দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণীর জগদ্বিখ্যাত মূর্তি নির্মাণ করে নিজের শিল্পের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিলেন।
অবশেষে ১২৮৪ খ্রিস্টাব্দে সেই অসাধারণ দশভুজা মূর্তিটি ক্ষীরগ্রাম মন্দিরে পবিত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মূর্তির অপূর্ব সৌন্দর্য আর ঐশ্বরিক তেজ দেখে স্বয়ং বর্ধমানের মহারাজা বিস্মিত হন। শিল্পীর এই অমর সৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে তিনি নবীনচন্দ্রকে "ভাস্কর" (মাস্টার ভাস্কর) উপাধিতে ভূষিত করেন।
পৌরাণিক প্রেক্ষাপট
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, দেবী সতীর ডান পায়ের বুড়ো আঙুল এখানেই পতিত হয়েছিল। সেই প্রাচীন কাল থেকেই এই পবিত্র স্থানটি এক জাগ্রত শক্তিপীঠ হিসেবে পূজিত হয়ে আসছে। মন্দিরটি ক্ষীরদিঘি নামক এক বিশাল পুকুরের মাঝখানে অবস্থিত। এক অদ্ভুত অলৌকিকতা হলো—মা যোগাদ্যার এই পাথরের মূর্তিটি বছরের বেশিরভাগ সময়জুড়েই সেই স্নিগ্ধ জলের তলায় নিমজ্জিত অবস্থায় থাকে।
স্থাপত্য ও শৈল্পিক উৎকর্ষতা
মা যোগাদ্যা মূর্তিটি একটি প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর স্থাপিত, যা পবিত্রতা 🌼 ও ঐশ্বরিক করুণার ✨ প্রতীক। এই মূর্তির গঠনশৈলী শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন এবং ভাস্কর নবীনচন্দ্র ভাস্করের নিখুঁত নৈপুণ্যের সাক্ষ্য বহন করে।
- 🔹 মূর্তির উচ্চতা: ২ ফুট ১০ ইঞ্চি
- 🔹 প্রস্থ: ১ ফুট ৮ ইঞ্চি
- 🔹 পদ্মের ব্যাস: ২.৫ ইঞ্চি
- 🔹 হুল (ভিত্তির পুরুত্ব): ৪.৫ ইঞ্চি
এই নিখুঁত মূর্তিটি যেন একটি জীবন্ত ছায়া—দর্শনার্থীর চোখে পড়ামাত্র এক অপার্থিব অনুভূতির সৃষ্টি হয়। প্রতিমার অসাধারণ কারুশিল্প এশিয়ায় অতুলনীয়। ভাস্করের দক্ষতা প্রতিটি বিবরণে স্পষ্ট, যা মূর্তিটিকে ভারতীয় শিল্প ও আধ্যাত্মিকতার এক অমূল্য ধন করে তোলে।
আধ্যাত্মিক গুরুত্ব এবং আচার-অনুষ্ঠান
শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস তাঁর ধর্মীয় গ্রন্থে মা যোগ্যা সম্পর্কে বিশদভাবে লিখেছেন, ক্ষীরগ্রামকে "গুপ্তকাশী" হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রতি বছর, বৈশাখ মাসের ৩১তম দিনে (এপ্রিল-মে), মূর্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষীর দীঘির ভেতরের মন্দির থেকে বের করে একটি সিংহাসনে স্থাপন করা হয়। জ্যেষ্ঠ মাসের ৪র্থ দিনে, দেবীকে জনসাধারণের দর্শনের জন্য ক্ষীর দীঘির তীরে ফিরিয়ে আনা হয়, তারপরে হোম ও বলিদানের মাধ্যমে পূজা করা হয় এবং অবশেষে মধ্যরাতে জলে নিমজ্জিত করা হয়।
🚗 কীভাবে পৌঁছাবেন মা যোগাদ্যার পবিত্র ধাম, ক্ষীরগ্রামে?
পূর্ব বর্ধমানের নির্জন ও শান্ত গ্রাম ক্ষীরগ্রাম। এখানে পৌঁছানোর যাত্রাটি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি সহজ। আপনি ট্রেন, বাস কিংবা নিজস্ব গাড়িতে করে বাংলার এই প্রাচীন শক্তিপীঠে আসতে পারেন।
🚆 রেলপথে যাত্রা (Train Journey)
- কৈচর স্টেশন (নিকটতম): কাটোয়া-বর্ধমান লাইনের কৈচর স্টেশন থেকে ক্ষীরগ্রামের দূরত্ব মাত্র ৪ কিমি।
- কাটোয়া জংশন: ক্ষীরগ্রাম থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২২ কিমি। স্টেশন থেকে বাস বা প্রাইভেট গাড়ি পাওয়া যায়।
- বর্ধমান জংশন: যারা একটু দূর থেকে আসছেন, তারা বর্ধমানে নামতে পারেন (দূরত্ব প্রায় ৪০ কিমি)।
🚌 বাস ও সড়কপথ (Road Journey)
সড়কপথে ক্ষীরগ্রাম পৌঁছানো বেশ আরামদায়ক। বর্ধমান, কাটোয়া বা মঙ্গলকোট থেকে নিয়মিত লোকাল বাস এই রুটে চলাচল করে। নিজস্ব গাড়িতে আসলে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে বর্ধমান পেরিয়ে কৈচর-মঙ্গলকোট রোড ধরলে সরাসরি পৌঁছে যাবেন।
🕰️ ভ্রমণের সেরা সময়
সেরা সময় হলো বৈশাখ সংক্রান্তি। এছাড়া শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) ভ্রমণের জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক।
