মছলন্দপুরের ‘হাড়ভাঙা বুড়ি’
সূত্র: Lalpecha.in | স্থান: ঘোষপুর | বিষয়বস্তু: লোকচিকিৎসা ও গ্রামীণ অর্থনীতি
✤ ভূমিকা
বহুকাল ধরে, বাংলায় লোকবিশ্বাস এবং ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আজও, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাশাপাশি অনেকেই এই অলৌকিক বা ঐতিহ্যবাহী প্রতিকারের উপর নির্ভর করে।
উত্তর চব্বিশ পরগনার মসলন্দপুর গ্রামের ঘোষপুর মাঠপাড়া এলাকার বাসিন্দা 'লক্ষ্মী মণ্ডল' নামে এক বৃদ্ধা মহিলা ''হাড়ভাঙা বুড়িমা'' নামে পরিচিত। প্রায় সকলেই তার আসল নাম ভুলে গেছেন। স্থানীয়দের অনেক জিজ্ঞাসা করার পরেও তার আসল নাম জানা যায়নি, কারণ সবাই তাকে 'হাড়ভাঙা বুড়িমা' বিখ্যাত নামে চেনে। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন যে তিনি ফুঁ দিয়ে এবং তেল মালিশের মাধ্যমে ভাঙা হাড় ঠিক করতে পারেন এবং শরীরের বিভিন্ন ব্যথা ও যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে পারেন।
🚂 কিভাবে পৌঁছাবেন ? আমার সফরের অভিজ্ঞতা ✤
মছলন্দপুরের ‘হাড়ভাঙা বুড়িমা’-র কাছে পৌঁছানো বেশ সহজ, যদি আপনি সঠিক রুটটি জানেন। আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল নাদিয়া জেলার রানাঘাট থেকে। সকাল ৭:২২-এর বনগাঁ লোকাল ধরে ঠিক ৭:৫২ মিনিটে আমি বনগাঁ স্টেশনে পৌঁছাই। এরপর কিছুটা সময় অপেক্ষা করে ৮:০৮-এর বনগাঁ-শিয়ালদহ লোকাল ধরে মাত্র ৩৫ মিনিটের মাথায় অর্থাৎ প্রায় ঘড়িতে তখন ৮:৪৩ মিনিট । আমি মছলন্দপুর স্টেশনে নামলাম।
🛺 স্টেশন থেকে ঘোষপুর যাত্রা
মছলন্দপুর রেলওয়ে স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মের ঠিক পাশেই বাজার, বাজারের মুড়োর দিকে রয়েছে একটি ছোট ভ্যান স্ট্যান্ড। ট্রেন থেকে নামার সাথে সাথেই ভ্যানচালকদের হাঁকডাক কানে আসবে— "হাড়ভাঙা বুড়িমা, হাড়ভাঙা বুড়িমা - বিশেষ করে শনি ও মঙ্গলবার।"
এখান থেকে সাইকেল ভ্যান বা মোটর লাগানো টলি ভ্যানে যাত্রা শুরু হয়। সাধারণত ৪-৫ জন যাত্রী হলে ভ্যান ছেড়ে দেয়।
* যাত্রী কম থাকলে ১০-২০ টাকা বেশি দাবি করতে পারেন, চালকরা।
আপনাকে একদম নামিয়ে দেবে বাড়ীর ঠিক সামনের মোড়ে। সেখান থেকে পঞ্চায়েত তৈরি করা ঢালাই রাস্তা ধরে মাত্র কয়েক পা এগোলেই চোখে পড়বে সেই চেনা দৃশ্য। বাড়ির উঠোনে দেখা যাবে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। সেখানে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে সরিষার তেলের বোতল আর বোতলের গলায় কালো কার (সুতো)।
💡 পরামর্শ: সকালে দ্রুত পৌঁছাতে পারলে ভিড় কিছুটা কম পাওয়া যায়। মছলন্দপুর স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মের পরিবেশটি বেশ জমজমাট এবং যাতায়াতের জন্য ভ্যান সবসময়ই সহজলভ্য।আর, বাড়ি থেকে খাঁটি সরিষার তেল ও কালো-কার(সুতো) নিয়ে আনুন। নাহলে ওই জায়গাথেকে কিনতে হবে।
✤ কে এই ‘হাড় ভাঙা বুড়ি’?
মছলন্দপুর অঞ্চলের লোকমুখে একটি নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়— ‘হাড়ভাঙা বুড়ি’। তার আসল নাম ? আসল নাম প্রায় সবাই ভুলে গেছেন, বুড়ি-মার আসল নাম হলো ‘লক্ষ্মী মণ্ডল’ । আনুমানিক বয়স? সত্তরের কোঠায় পৌঁছালেও অদম্য প্রাণশক্তি নিয়ে তিনি সেবার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। মছলন্দপুরের এক প্রান্তিক পরিবারে তাঁর বসবাস। স্থানীয়রা তাকে ভালোবেসে ‘হাড়ভাঙা বুড়ি’ বলে ডাকেন। তিনি ওপার বাংলা থেকে প্রায় ৪০ বছর (দুই-কুড়ি) আগে এপারে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর ছোট ছেলে শিমুল তাঁর এই বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতিতে ছায়ার মতো সাহায্য করে চলেছেন।
📜 অলৌকিক সেই ভেষজ যাত্রার ইতিহাস
এই চিকিৎসা পদ্ধতির সূত্রপাত কোনো আধুনিক ল্যাবরেটরিতে নয়, বরং এক আধ্যাত্মিক স্বপ্নের মাধ্যমে। বহু বছর আগে তাঁর পরিবারের এক পূর্বপুরুষ স্বপ্নে একটি বিশেষ গুল্মজাতীয় গাছের শিকড় এবং একটি দৈব "মন্ত্র" লাভ করেন। লক্ষ্মী দেবী হলেন সেই প্রাচীন ঐতিহ্যের তৃতীয় প্রজন্ম। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই ভেষজ জ্ঞান তিনি সযত্নে লালন করছেন আর্তমানবতার সেবায়।
✤ অনন্য চিকিৎসা পদ্ধতি ও নিরাময়
বুড়িমার চিকিৎসা পদ্ধতিতে আধুনিক বিজ্ঞানের পাশাপাশি লোকজ বিশ্বাসের এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। তাঁর মূল চিকিৎসা পদ্ধতি দুটি প্রধান স্তরে বিভক্ত:
✨ দৈব শক্তি ও ফুঁ
অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নির্দিষ্ট মন্ত্র পাঠ করে তিনি আক্রান্ত স্থানে ফুঁ দেন। ভক্তদের বিশ্বাস, এই ফুঁ-এর মাধ্যমেই ব্যথার উপশম শুরু হয়।
🌿 ভেষজ তেলের জাদু
রোগীর নিয়ে আসা খাঁটি সরিষার তেলের সাথে তিনি কিছু গোপন ভেষজ উপাদানের সংমিশ্রণ ঘটান। এই তেল মালিশে হাড় ও পেশির জমাট বাঁধা ব্যথা দ্রুত সেরে যায়।
💡 বিশেষত্ব: তিনি কেবল ভেষজ চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ নন। রোগীদের সুরক্ষার স্বার্থে তিনি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের X-ray বা ডাক্তারদের দেওয়া ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট সেবনের পরামর্শও গুরুত্বের সাথে দেন।
*মছলন্দপুরের ‘হাড়ভাঙা বুড়ি’ একটি কালো কার বা ঘুনসী-তে করে বিশেষ ভেষজ গাছের শিকড়, তিনি রোগীর গলায় বা কোমরে পরিয়ে দেন।
📋 চিকিৎসা সেবা ও বিশেষত্ব সমূহ
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণার মছলন্দপুরে অবস্থিত এই চিকিৎসা কেন্দ্রে লক্ষ্মী মণ্ডল (হাড়ভাঙা বুড়ি) দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিম্নলিখিত শারীরিক সমস্যাগুলোর ভেষজ সমাধান প্রদান করছেন:
📢 বিশেষ দ্রষ্টব্য: এছাড়াও তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বিভিন্ন ধরনের ভেষজ চিকিৎসা ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন। লক্ষ্মী দেবীর এই চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল, যা হাড়ের জটিল ব্যথা উপশমে যুগ যুগ ধরে কার্যকরী ভূমিকা রাখছে।
রোগী দেখেন সপ্তাহে দু’দিন—শনিবার ও মঙ্গলবার। বিশেষ করে শনিবারে ভিড় উপচে পড়ে। ভোর ৫টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে রোগী দেখা।
✤ চিকিৎসার বিনিময়ে পারিশ্রমিক?
লক্ষ্মী মণ্ডলের চিকিৎসার দক্ষতা প্রায় নিখুঁত বলে স্থানীয়দের গভীর বিশ্বাস। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো তাঁর পারিশ্রমিক। লোকমুখে প্রচলিত আছে— এই চিকিৎসার দক্ষিণা মাত্র ১৬ আনা, অর্থাৎ এক টাকার সমান। তিনি কখনও সরাসরি কোনো টাকা দাবি করেন না, যা বর্তমান যুগে বিরল।
চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় খাঁটি সরিষার তেল এবং কালো কার (সুতো) আপনি ওখানেই পেয়ে যাবেন। বাড়ির আশেপাশের দোকানগুলোতে বিভিন্ন মাপের তেলের বোতল সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়:
💡 বিশেষ টিপস: সরিষার তেলের পাশাপাশি ভেষজ গাছের মূল বাঁধার জন্য কালো কার (ঘুনসি) অবশ্যই দোকান থেকে চেয়ে নেবেন। ওখানে সব ব্যবস্থা থাকায় আপনাকে বাড়তি কোনো ঝামেলা পোহাতে হবে না।
✤ সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
মছলন্দপুরের ‘হাড়ভাঙা বুড়িমা’র চিকিৎসা কেন্দ্রটি কেবল একটি নিরাময় কেন্দ্র নয়, বরং এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক মিলনস্থল। এখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সমাগম ঘটে। বসিরহাট, হাবরা, বারাসাত থেকে শুরু করে নদীয়া এবং ভিন রাজ্য থেকেও মানুষ ছুটে আসেন এক বুক আশা নিয়ে।
✤ অর্থনীতি ও সামাজিক প্রভাব:
✤ বিশ্বাস বনাম বাস্তবতা
লক্ষ্মী মন্ডলের এই চিকিৎসা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
স্থানীয় জনগণ বলেন: “মাস দুয়েক আগে আমার ভাইয়ের পা মচকে যায়। ডাক্তার দেখানোর আগে বুড়িমার কাছে নিয়ে যাই। উনি তেল মালিশ করে ফুঁ দিলেন। সপ্তাহখানেকেই পা ঠিক হয়ে গেল।”
অন্যদিকে, সচেতন মানুষদের কিছু অংশ বলেন: “এগুলো মনস্তাত্ত্বিক ফল হতে পারে। তবে এই বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে গ্রামবাংলার সংস্কৃতির অংশ।”
অর্থাৎ এটি একদিকে যেমন লোকবিশ্বাসের প্রতিফলন, তেমনই এর কার্যকারিতা বিজ্ঞানের মানদণ্ডে যাচাই করা হয়নি—এ কথা স্মরণ রাখা জরুরি।
✤ পরম্পরা ও ভবিষ্যৎ
লক্ষ্মীদেবীর চার কন্যা ও চার পুত্র। তাঁদের মধ্যে কনিষ্ঠ পুত্র শিমুল বাবু এই চিকিৎসায় মা’কে সাহায্য করেন। তিনি জানান,
“এই শিকড়ের গাছ আমরা কোথাও চাষ করি না। ঠাকুমা বলতেন, চাষ করলে গাছ নিষ্ফলা হবে। তাই জমির পুরনো আল, জঙ্গল বা বাগান থেকে সংগ্রহ করি।”
এই লোকজ ঔষধির কাহিনিতে হিন্দু-মুসলিম ভেদ নেই। দুই সম্প্রদায়ের মানুষ সমান আস্থায় ভিড় করেন বুড়িমার বাড়িতে।
