📰 Lalpecha Heritage Network-এর সঙ্গে থাকুন: গুগল নিউজ ফলো করুন

Published on Lalpecha Heritage Network | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

দীনবন্ধু মিত্র: বাংলা নাটকের প্রথম বাস্তববাদী রূপকার, নীলদর্পণ ও হাস্যরসের সম্রাট

উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্য যখন নবজাগরণের স্পন্দনে প্রকম্পিত, তখন একদিকে যেমন মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রতিভা বাংলা কাব্যে নবীন প্রাণের সঞ্চার করছিল, অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাসের জগৎকে সমৃদ্ধ করে তুলছিলেন। এই দুই ধারার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আরেকজন প্রতিভাবান সাহিত্যিক বাংলা নাট্যসাহিত্যে বাস্তবতার এমন এক শক্ত ভিত গড়ে দেন, যা চিরন্তন ও কালজয়ী। তিনি হলেন দীনবন্ধু মিত্র। নাট্যকার হিসাবে তার পরিচয় সর্বজনবিদিত হলেও, একজন মানবতাবাদী, পোস্টমাস্টার এবং সমাজের নিপীড়িত মানুষের সুখ-দুঃখের বিশ্বস্ত চিত্রকর হিসাবেও তার ভূমিকা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যিনি 'নীলদর্পণ'-এর মতো একটি ঐতিহাসিক নাটক লিখে ইংরেজ শাসক ও নীলকরদের অত্যাচারের মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন, তিনিই আবার 'সধবার একাদশী'-র মতো প্রহসন লিখে হাস্যরসের এক অমলিন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। আসুন, বাংলা সাহিত্যের এই অনন্য প্রতিভার জীবন ও সৃষ্টিকর্মের গভীরে ডুব দেওয়া যাক।

দীনবন্ধু মিত্রের জন্মস্থান চৌবেড়িয়া গ্রাম নদীয়া পশ্চিমবঙ্গ
দীনবন্ধু মিত্রের জন্মস্থান, তৎকালীন নদীয়া জেলার এখন উত্তর ২৪ পরগণা জেলার চৌবেড়িয়া গ্রামে

দীনবন্ধু মিত্রের জীবনী: জন্ম থেকে কর্মজীবন

জন্ম ও পরিবার

দীনবন্ধু মিত্রের জন্ম ১২৩৬ বঙ্গাব্দের (আনুমানিক ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দ) ২৫ বৈশাখ অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চৌবেড়িয়া গ্রামে। তার পিতার নাম কালাচাদ মিত্র। চৌবেড়িয়া গ্রামটি যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত। ছোটবেলা থেকেই দীনবন্ধু ছিলেন মেধাবী। তার শৈশব সম্পর্কে বিশেষ তথ্য পাওয়া না গেলেও, প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় তিনি কলকাতায় এসে ইংরেজি শিক্ষা অর্জন করেন এবং কিছুদিন আটকপারা স্কুলে শিক্ষকতাও করেছিলেন। বাল্যকাল থেকেই তার সাহিত্যের প্রতি বিশেষ অনুরাগ ছিল।

শিক্ষা ও সাহিত্য জীবনের সূচনা

কলকাতায় এসে তিনি যখন শিক্ষকতা করছেন, সেই সময় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ ও 'প্রভাকর' পত্রিকার সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সান্নিধ্যে আসেন। ঈশ্বর গুপ্ত ছিলেন তৎকালীন নবীন লেখকদের পৃষ্ঠপোষক। দীনবন্ধুও তার কাছে লেখালেখির প্রেরণা ও দীক্ষা লাভ করেন। বলা যায়, দীনবন্ধু মিত্র কোন পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন না, তবে তার সাহিত্যিক বিকাশে 'প্রভাকর' পত্রিকা ও ঈশ্বর গুপ্তর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। দীনবন্ধুর প্রথম প্রকাশিত রচনা ‘মানব-চরিত’ নামক একটি কবিতা, যা ‘সাধুরঞ্জন’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। ঈশ্বর গুপ্তর প্রভাব তার পরবর্তী সাহিত্যকর্মেও দেখা যায়, বিশেষ করে হাস্যরসের প্রয়োগে।

কর্মজীবন

দীনবন্ধু মিত্র চাকরি জীবন শুরু করেন ডাক বিভাগে। প্রথমে তিনি ঢাকা বিভাগের কাঁচড়াপাড়া, নদীয়া প্রভৃতি অঞ্চলে কাজ করেন। তার কর্মদক্ষতা ছিল অত্যন্ত উঁচু মানের। ডাক বিভাগের চাকরি সূত্রেই তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখার সুযোগ পান। কাছাড়, লুশাই প্রভৃতি দুর্গম এলাকাতেও তাকে ডাক ব্যবস্থা উন্নত করতে যেতে হয়। এই বিস্তৃত ভ্রমণ ও বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মেলামেশাই তাকে বাংলার সমাজ ও মানুষের জীবনযাত্রার গভীর অভিজ্ঞতা দান করে। চাকরি জীবনের শেষদিকে তিনি হাওড়া ভিআইপি রোডে নিযুক্ত হন এবং ‘রায়বাহাদুর’ দীনবন্ধু মিত্রের উপাধি লাভ করেন। ১২৮০ বঙ্গাব্দের (১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে) ১ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। দীনবন্ধু মিত্র জন্ম মৃত্যু (১৮২৯-১৮৭৩) এই সময়কালেই তার সাহিত্যকর্ম রচিত হয়।

দীনবন্ধু মিত্রের নাটক সমূহ: বৈচিত্র্যে ভরা এক নাট্যভাণ্ডার

দীনবন্ধু মিত্রের নাটক সমূহ নিয়ে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদর্শনী
বাংলা বিভাগ, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত প্রদর্শনী (ন্যাশনাল থিয়েটার ও সাহিত্য সংগ্রহশালা)

দীনবন্ধু মিত্র বাংলা নাট্যজগতে এক নতুন ধারা প্রবর্তন করেন। তার নাটকগুলোকে মোটামুটিভাবে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: সামাজিক-বাস্তবধর্মী নাটক, প্রহসন ও পৌরাণিক বা রোমান্টিক নাটক।

দীনবন্ধু মিত্রের প্রথম নাটক ও অন্যান্য নাটক

দীনবন্ধু মিত্রের প্রথম নাটক হল ‘নীলদর্পণ’ (১৮৬০)। এটি শুধু তার প্রথম নাটকই নয়, বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী রচনা। এরপর তিনি একে একে রচনা করেন:

(১৮৭২ সালে শ্যামবাজার নাট্যসমাজ মঞ্চস্থ করে ‘নীলদর্পণ’। এই নাটকের ব্যাপক সাফল্য ও প্রশংসা এনে দেয় সাধারণ মানুষের মধ্যে নাটককে। ১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর ন্যাশনাল থিয়েটারে ‘নীলদর্পণ’ নাটক মঞ্চস্থ হয়। ন্যাশনাল থিয়েটারের ঠিকানা — মধুসূদন সান্যালের বাড়িতে, ৬৫ নং আপার চিৎপুর রোডে। টিকিট — আট আনা (প্রথম শ্রেণী) ও এক টাকা।)

  • নবীন তপস্বিনী (১৮৬৩): এটি একটি সামাজিক নাটক। এই নাটকে একটি সতী নারীর করুণ কাহিনী চিত্রিত হয়েছে। নাটকটিতে রমণীমোহন ও বিষাদলতার মতো চরিত্র সৃষ্টি করেছেন দীনবন্ধু।
  • বিয়ে পাগলা বুড়ো (১৮৬৬): এটি একটি প্রহসন। সমাজের কিছু নির্দিষ্ট মানসিকতার লোককে নিপুণভাবে ব্যঙ্গ করা হয়েছে এতে।
  • সধবার একাদশী (১৮৬৬): দীনবন্ধু মিত্রের শ্রেষ্ঠ নাটক হিসেবে বহুল স্বীকৃত। এটি একটি প্রহসন হলেও, নব্য ইংরেজি শিক্ষার কুফল ও নব্যশিক্ষিত যুবকদের চারিত্রিক অধঃপতনের এক মর্মস্পর্শী ও হাস্যরসাত্মক চিত্র এতে ফুটে উঠেছে। নিমচাঁদ দত্ত বা 'নিমটাদ' এই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র।
  • লীলাবতী (১৮৬৭): এই নাটকটি রোমান্টিক প্রণয়ধর্মী। সংস্কৃত ও ইংরেজি নাটকের আদর্শে রচিত এই নাটকে প্রেম ও কর্তব্যের দ্বন্দ্ব দেখানো হয়েছে।
  • জামাই বারিক (১৮৭২): সমাজের প্রচলিত জামাইষষ্ঠী প্রথা ও ঘরজামাইয়ের দুর্দশা এই প্রহসনের উপজীব্য।
  • কমলে কামিনী (১৮৭৩): এটি দীনবন্ধুর শেষ রচিত নাটক। পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে লেখা এই নাটকে কল্পনা ও বাস্তবের মিশ্রণ ঘটেছে।

এছাড়াও ‘বিরহ বিলাপ’ নামে একটি কাব্য এবং ‘ধর্মঠাকুর’ ও ‘যুগলাঙ্গুরীয়’ নামে দুটি গল্প তিনি লিখেছিলেন।

বিশেষ আলোচনা: নীলদর্পণ নাটক – এক ঐতিহাসিক দলিল

প্রেক্ষাপট ও রচনাকাহিনি

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বাংলায় নীলচাষ একটি বড় শিল্প ছিল। ইংরেজ নীলকর সাহেবরা অত্যাচার, বেআইনি চুক্তি ও নানাবিধ প্ররোচনার মাধ্যমে কৃষকদের জোর করে নীলচাষে বাধ্য করত। দীনবন্ধু মিত্র ডাক বিভাগের চাকরি সূত্রে নদীয়া, ঢাকা প্রভৃতি অঞ্চলে নীলকরদের এই বর্বর অত্যাচার প্রত্যক্ষ করেন। এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ এবং কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশার কথা দেশবাসীকে জানাতেই তিনি দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটক রচনা করেন।

নীলদর্পণ অভিনয় সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন
নীলদর্পণ অভিনয় সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন

সামাজিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

‘নীলদর্পণ’ নাটকটি ১৮৬০ সালে প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া ফেলে দেয়। নাটকে নীলকর উড সাহেব, তার দোসর ও স্থানীয় আমিন-জমিদারদের অত্যাচারের নির্মম চিত্র ফুটে ওঠে। তোরাপ, ক্ষেত্রমণি, সাধুচরণ, গোলকনাথের মতো চরিত্রগুলো বাংলার দরিদ্র কৃষকের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। নাটকের শেষে উড সাহেব তোরাপের হাত কেটে দেয়, ক্ষেত্রমণি ধর্ষিত হয়ে আত্মহত্যা করে— এই দৃশ্যগুলো পাঠকের মনে গভীর রেখাপাত করে।

নাটকটি প্রকাশের পর ইংরেজ সরকার তা বাজেয়াপ্ত করার চেষ্টা চালায়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। এই অনুবাদ গ্রন্থ ইংল্যান্ডে পাঠানো হলে সেখানকার সংবাদমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এর ফলে লং সাহেব (মি. লং) নামে এক পাদ্রিকে জরিমানা ও সামান্য কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটক শুধু একটি নাটক নয়, এটি নীলবিদ্রোহের পটভূমি রচনাকারী একটি ঐতিহাসিক দলিল। ‘আঙ্কল টমস কেবিন’-এর মতো এটিও একটি শোষিত মানুষের কাহিনী, যা সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

ন্যাশনাল থিয়েটার ১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল
ন্যাশনাল থিয়েটার ১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

প্রহসন ও সাহিত্যধারা: হাস্যরসের সম্রাট

দীনবন্ধু মিত্র গুরুতর ও বাস্তবধর্মী নাটক যেমন লিখেছেন, তেমনি প্রহসন রচনায়ও তার জুড়ি মেলা ভার। ‘সধবার একাদশী’, ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো’, ‘জামাই বারিক’ তার প্রহসনের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি কখনো কৌলীন্য প্রথার কুফল, কখনো নব্যশিক্ষিত বাবু সংস্কৃতি, আবার কখনো সামাজিক রীতিনীতির অপপ্রয়োগকে ব্যঙ্গের ছুরিকাঘাতে জর্জরিত করেছেন। তার প্রহসনের সবচেয়ে বড় শক্তি হল চরিত্র সৃষ্টি। নিমচাঁদ দত্ত (নিমটাদ) বাংলা সাহিত্যের একটি অমর সৃষ্টি। তার হাস্যরস ছিল প্রাণের সঙ্গে মিশে থাকা। তার চরিত্রগুলো যেমন হাসায়, তেমনি তাদের করুণ পরিণতি পাঠকের মনেও দাগ কাটে। দীনবন্ধু মিত্রের ছদ্মনাম হিসেবে কোনো নাম পাওয়া না গেলেও, তিনি তার চরিত্রগুলোর মুখে সমাজের নানা অসঙ্গতি ফুটিয়ে তুলেছেন।

সম্পাদকীয় জীবন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

সাধারণ একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, দীনবন্ধু মিত্র কোন পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। বস্তুতপক্ষে, তিনি নিজে কখনো কোনো পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন না। তবে ঈশ্বর গুপ্তের ‘প্রভাকর’ ও ‘সাধুরঞ্জন’ পত্রিকার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন এবং সেখানেই তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। তিনি ‘নবীন তপস্বিনী’ নাটকটি কৃষ্ণনগর থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে তার অধিকাংশ গ্রন্থ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়।

দীনবন্ধু মিত্রের মায়ের নাম সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তার জীবনীকার ললিতচন্দ্র মিত্র তার জীবনীগ্রন্থে শুধু পিতার নাম কালাচাদ মিত্র উল্লেখ করেছেন।

সমসাময়িক সাহিত্যিকদের সঙ্গে তুলনা ও মূল্যায়ন

দীনবন্ধু মিত্রের আসল নাম দীনবন্ধু মিত্রই ছিল, কোনো ছদ্মনাম নয়। তিনি তার প্রকৃত নামেই খ্যাতি অর্জন করেন। বাংলা নাটকের বিকাশে তার অবদান ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও রামনারায়ণ তর্করত্নের মধ্যে তাকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান দিয়েছে।

  • ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত: দীনবন্ধুর হাস্যরসের পূর্বসূরি ছিলেন ঈশ্বর গুপ্ত। তবে ঈশ্বর গুপ্তের রস ব্যঙ্গাত্মক ও তীক্ষ্ণ ছিল, যেখানে দীনবন্ধুর রস ছিল প্রাণবন্ত ও মর্মস্পর্শী।
  • মাইকেল মধুসূদন দত্ত: মধুসূদন বাংলা নাটকে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও রোমান্টিক নাটকের প্রবর্তন করেন। কিন্তু তার নাটক ছিল উচ্চকিত ও আদর্শবাদী। দীনবন্ধু তার বিপরীতে বাস্তবজীবনের কাছাকাছি এসে সাধারণ মানুষের নাটক লিখেছেন।
  • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: বঙ্কিমচন্দ্র দীনবন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সমালোচক ছিলেন। তিনি দীনবন্ধুর বাস্তবমুখী প্রতিভার উচ্চ প্রশংসা করেন। বঙ্কিমের মতে, দীনবন্ধু বাংলার বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জীবন ও ভাষাকে যেভাবে নাটকে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ। তিনি দীনবন্ধুর হাস্যরসের শক্তিকে স্বীকার করলেও তার কাব্যিক সৌন্দর্য ও গাম্ভীর্যের অভাবের কথা উল্লেখ করেন।

উপসংহার ও চূড়ান্ত মূল্যায়ন

দীনবন্ধু মিত্র বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন বাস্তবধর্মী নাটকের পথিকৃৎ হিসেবে। তার দীনবন্ধু মিত্রের নাটক সমূহ বাংলার সমাজ ও মানুষের জীবন্ত দলিল। তিনি প্রমাণ করেছেন, সাহিত্যের উপাদান শুধু রাজা-রানী বা দেব-দেবী নয়, সাধারণ কৃষক, নিপীড়িত প্রজা, মাতাল নিমচাঁদ বা জামাই বারিকরাও সাহিত্যের প্রধান চরিত্র হতে পারে। তার ‘নীলদর্পণ’ শুধু একটি নাটক নয়, এটি নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদগীতি। তার প্রহসনগুলো আমাদের হাসাতে হাসাতেই সমাজের গভীর সত্যকে জানান দেয়। বাংলা নাট্যসাহিত্যে তিনিই প্রথম সার্থক বাস্তবতার ছোঁয়া আনেন। তাই দীনবন্ধু মিত্রের জীবনী ও তার সাহিত্যকর্ম চিরকাল গবেষক ও পাঠকদের আকৃষ্ট করবে। তিনি যে শুধু বাংলা নাটকের নয়, বাংলার সামাজিক ইতিহাসেরও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

ভ্রমণ মানেই শুধু পথচলা নয় — একটু ইতিহাস ছোঁয়া, একটু স্মৃতির গন্ধ, আর একটু মাটির টান। এমনই এক অনুভূতির ভ্রমণ হতে পারে বাংলার মহান নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র-এর জন্মভিটে দেখা।

🚉 ট্রেনযাত্রা: রানাঘাট থেকে গোপালনগর

সকালের নরম আলোয় Ranaghat Junction থেকে বনগাঁ লাইনের লোকাল ট্রেনে চেপে বসুন। আপনার গন্তব্য শান্ত স্টেশন Gopalnagar। জানালার ধারের সবুজে ঘেরা দৃশ্য আপনার মন ভরিয়ে দেবে।

App

RailOne App

কাগজের টিকিটের ঝামেলা এড়াতে এই অ্যাপে UPI দিয়ে টিকিট কাটুন। সতর্কতা: বিনা টিকিটে ভ্রমণ দণ্ডনীয় অপরাধ।

📥 ডাউনলোড করুন

🎫 ট্রেনের ভাড়া ও সময়:

  • রানাঘাট ↔ গোপালনগর: ১০ টাকা
  • বনগাঁ ↔ গোপালনগর: ৫ টাকা
  • রানাঘাট-বনগাঁ ডাউন ট্রেন: ১৯টি

🏡 গন্তব্য: চৌবেড়িয়া গ্রাম

গোপালনগর স্টেশনে নামার পর ভ্যান বা টোটো ধরে আপনাকে পৌঁছাতে হবে টালিখোলা বা কালীবাড়ি মোড়। সেখান থেকে অটো বা বাস সহজেই পাওয়া যায়, পৌঁছে যান Chouberia গ্রামে। এখানেই রয়েছে দীনবন্ধু মিত্রের স্মৃতিমাখা ভিটে। 💰 স্থানীয় অটোরিকশা ভাড়া: প্রায় ২০ টাকা | বাস: ১২ টাকা।

এরপরই আপনি পৌঁছে যাবেন শান্ত সবুজে ঘেরা Chouberia গ্রামে। যেখানে নীলদর্পণ-খ্যাত দীনবন্ধু মিত্রের স্মৃতি আজও মাটির গন্ধে মিশে আছে। কখনো সময় পেলে, একদিনের জন্য হলেও এই পথটা ঘুরে দেখুন। ইতিহাসের ছোঁয়া আপনার মন ভালো করে দেবেই।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-উত্তর (FAQ)

১. দীনবন্ধু মিত্রের প্রথম নাটকের নাম কী?

দীনবন্ধু মিত্রের প্রথম নাটকের নাম ‘নীলদর্পণ’ (১৮৬০)।

২. দীনবন্ধু মিত্রের জন্ম ও মৃত্যু সাল কত?

তিনি আনুমানিক ১৮২৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৭৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

৩. দীনবন্ধু মিত্রের আসল নাম কী ছিল?

দীনবন্ধু মিত্রের আসল নাম দীনবন্ধু মিত্রই ছিল। এটি কোনো ছদ্মনাম নয়।

৪. দীনবন্ধু মিত্রের শ্রেষ্ঠ নাটক কোনটি?

তিনি বহু নাটক রচনা করলেও, সাধারণত 'সধবার একাদশী' -কে তার শ্রেষ্ঠ নাটক হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে ঐতিহাসিক গুরুত্বের বিচারে 'নীলদর্পণ' সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য।

৫. দীনবন্ধু মিত্র কোন পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন?

দীনবন্ধু মিত্র কোন পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন না। তিনি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'প্রভাকর' ও 'সাধুরঞ্জন' পত্রিকায় লেখালেখি করতেন এবং তার প্রথম কবিতা 'সাধুরঞ্জন' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

৬. দীনবন্ধু মিত্রের উপাধি কী ছিল?

তিনি ডাক বিভাগে কাজ করার সময় 'রায়বাহাদুর' উপাধি লাভ করেছিলেন।

৭. দীনবন্ধু মিত্রের উল্লেখযোগ্য প্রহসন কোনগুলি?

তার উল্লেখযোগ্য প্রহসনগুলি হল: 'সধবার একাদশী', 'বিয়ে পাগলা বুড়ো' ও 'জামাই বারিক'।

৮. 'নীলদর্পণ' নাটকটি কেন বিখ্যাত?

'নীলদর্পণ' ইংরেজ নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লেখা প্রথম বাস্তবধর্মী নাটক। এটি প্রকাশের পর ইংরেজ সরকার ও নীলকরদের অত্যাচারের মুখোশ খুলে যায় এবং নীলবিদ্রোহের পটভূমি রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

📱 আরও ঐতিহাসিক প্রতিবেদনের জন্য যোগ দিন

হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করুন

🔍 সংশ্লিষ্ট উচ্চ-সন্ধানমূলক প্রশ্নসমূহ

  • দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ কে করেন?
  • দীনবন্ধু মিত্র রায়বাহাদুর উপাধি পান কবে?
  • দীনবন্ধু মিত্রের প্রথম প্রকাশিত কবিতা কোনটি?
  • নীলদর্পণ নাটকের পটভূমি কী?
  • দীনবন্ধু মিত্রের শিক্ষাগুরু কে ছিলেন?
  • দীনবন্ধু মিত্রের প্রহসন কয়টি ও কী কী?
  • দীনবন্ধু মিত্রের উপন্যাসের নাম কি?
  • দীনবন্ধু মিত্রের শেষ নাটকের নাম কী?
  • দীনবন্ধু মিত্রের বাড়ি কোথায়?
  • নীলদর্পণ নাটক প্রথম মঞ্চস্থ হয় কবে?

📚 তথ্যসূত্র

  • ললিতচন্দ্র মিত্র প্রণীত "দীনবন্ধু মিত্রের জীবনী" (কলকাতা, দীনধাম, ১১১৬ বঙ্গাব্দ)।
  • ২০১৫.২৯১২০৭. Dinabandhu-jivani.pdf (প্রদত্ত গবেষণা নথি)।
  • ২০১৫.২৯৯০০৮. Dinabandhu-Mitra_text.pdf (প্রদত্ত গবেষণা নথি)।
  • তথ্য সংগ্রহ: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ, ক্ষেত্রসমীক্ষণ ও প্রামাণ্য লোকসূত্র।