পাল আমলের বিষ্ণু মূর্তি উদ্ধার: হুগলির পাণ্ডুয়ার মণ্ডলাই গ্রামে পুকুর খননের সময় আবিষ্কৃত প্রাচীন কষ্টি পাথরের ভাস্কর্য
পুকুর খননের সেই দৃশ্যটি স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত ছবির ভিত্তিতে উপস্থাপিত।

আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ |

ভেবেছেন কি, আপনার গ্রামের পুকুরপাড়ে হয়তো লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস? শনিবারের সকালে হুগলির পাণ্ডুয়ার মণ্ডলাই গ্রামে ঠিক এমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে গেল। পুকুর সংস্কারের সময় মাটি খুঁড়তেই বেরিয়ে এল পাল আমলের বিষ্ণু মূর্তি—কালো কষ্টি পাথরে খোদাই করা প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু এক অনিন্দ্যসুন্দর ভাস্কর্য। এই আবিষ্কার শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়, এটি আমাদের হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার জীবন্ত দলিল, যা ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে বাধ্য করে।

✍️ আমার অভিজ্ঞতা: লেখালেখির প্রতি আমার গভীর আগ্রহ রয়েছে। সংস্কৃতি বা আঞ্চলিক ঐতিহ্যভিত্তিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে বিশেষ আনন্দ পাই। পশ্চিমবঙ্গের লুপ্তপ্রায় ঐতিহাসিক নিদর্শন ও লোকউৎসব নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে লেখা আমার কাছে অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক।

📜 ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: পাল যুগের শিল্প বৈভব

অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত পাল রাজবংশের শাসনকাল বাংলার ইতিহাসে স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচিত। এই সময় বৌদ্ধ ও হিন্দু শিল্পকলার অসাধারণ বিকাশ ঘটে। পাল আমলের বিষ্ণু মূর্তি তার উজ্জ্বল নিদর্শন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাল যুগের ভাস্কর্যগুলির বৈশিষ্ট্য হল সূক্ষ্ম অলংকরণ, পাথর খোদাইয়ের নিখুঁত কারুকার্য এবং ধর্মীয় প্রতীকায়নের গভীরতা। হুগলির পাণ্ডুয়া অঞ্চলটি প্রাচীনকালে গঙ্গার বাহকের তীরে গড়ে ওঠা বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল, যা পাল শাসকদের আমলে সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছেছিল। এই প্রত্নস্থল থেকে মূর্তি উদ্ধার হওয়া প্রমাণ করে যে, এখানে এককালে হিন্দু মন্দির বা মঠ ছিল, যা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

🌿 উৎপত্তি ও বিবর্তন: মাটির নিচে চাপা পড়া সভ্যতা

মণ্ডলাই গ্রামের প্রবীণরা জানান, এক সময় এখানে অসংখ্য মন্দির ছিল। কালের নিয়মে এবং ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তনের ফলে সেগুলি মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। এই এলাকার পাশ দিয়ে এক সময় প্রবহমান নদী বয়ে যেত। পুকুর খননের সময় মাটি সরাতেই দেখা মেলে সেই প্রাচীন ইতিহাসের। গঠনশৈলী ও উপাদান বিশ্লেষণ করে প্রত্নতাত্ত্বিকরা নিশ্চিত, এটি পাল আমলের শেষ পর্বে (১১শ-১২শ শতক) নির্মিত। কালো কষ্টি পাথর দিয়ে তৈরি এই মূর্তি তখনকার ভাস্কর্যের উচ্চমানের শিল্পনৈপুণ্যের প্রমাণ বহন করে। মূর্তির উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট, যা বাংলায় প্রাপ্ত পাল আমলের মূর্তিগুলির মধ্যে আকারে বড়।

🗣️ লোককথা ও মিথ: গ্রামের মুখে মুখে ফেরা গল্প

মণ্ডলাই গ্রামে মূর্তি উদ্ধারের পর স্থানীয়দের মধ্যে নানা গল্প প্রচার হচ্ছে। কেউ বলেন, স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে এই মূর্তি খুঁজে পাওয়া গেছে। কেউ বলেন, এক সময় এখানে বিরাট মন্দির ছিল, যেখানে প্রতিদিন পূজা হত। মুঘল আমলে মন্দির ভেঙে ফেলা হলে মূর্তি পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। আরেকটি গল্প অনুসারে, নদী ভাঙনের সময় মন্দির ধসে পড়ে এবং সবকিছু মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। সত্য যাই হোক, গ্রামবাসীরা মূর্তিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। তারা বিশ্বাস করেন, এটা তাদের গ্রামের সৌভাগ্য ফিরিয়ে আনবে।

স্থানীয় সার্বজনীন মা মনসা মন্দির যেখানে পাল আমলের বিষ্ণু মূর্তি রাখা হয়েছে
স্থানীয় সার্বজনীন মা মনসা মন্দির

🤝 সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব: গ্রামের ঐক্যের প্রতীক

মূর্তি উদ্ধারের পর পুরো মণ্ডলাই গ্রাম যেন এক পরিবার হয়ে গেছে। স্থানীয় সার্বজনীন মা মনসা মন্দিরে মূর্তিটি রাখা হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত পূজার আয়োজন শুরু হয়েছে। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষ এই আবিষ্কারে আনন্দিত। অনেকে দূরদূরান্ত থেকে মূর্তি দেখতে আসছেন। এই ঘটনা গ্রামের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও নিজস্ব ঐতিহ্যের প্রতি গর্ববোধ জাগিয়েছে। স্থানীয় যুবকরাও এখন মূর্তি সংরক্ষণের জন্য এগিয়ে এসেছেন। এটি প্রমাণ করে, ইতিহাস ও ঐতিহ্য মানুষকে একত্রিত করার অসাধারণ শক্তি রাখে।

🗺️ আঞ্চলিক বৈচিত্র্য: পাণ্ডুয়ার ঐতিহাসিক গুরুত্ব

পাণ্ডুয়া শহরটি প্রাচীনকালে প্রদ্যুম্ন নগর নামে পরিচিত ছিল। কিংবদন্তি অনুসারে পান্ডু বা পান্ডুদাস হিন্দু রাজার নাম থেকে পাণ্ডুয়ার উৎপত্তি। এই অঞ্চল হুগলির অন্যতম প্রাচীন জনপদ ও বাণিজ্যকেন্দ্র। জি.টি. রোডের ধারে শাহ সুফীর সুউচ্চ মিনার ও প্রাচীন বড়ি মসজিদ (বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্তপ্রায়) মুসলিম স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করছে। অন্যদিকে, সম্প্রতি আবিষ্কৃত এই পাল আমলের বিষ্ণু মূর্তি প্রমাণ করে যে এই অঞ্চল হিন্দু-বৌদ্ধ শিল্পকলারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। পাণ্ডুয়া তাই একাধিক সভ্যতার মিশ্রণস্থল।

📡 বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা: ইতিহাসের পুনর্জন্ম

বর্তমানে যখন আমরা আধুনিকতার পেছনে ছুটছি, তখন এই ধরনের আবিষ্কার আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। স্থানীয় প্রশাসন ইতিমধ্যেই প্রত্নতাত্ত্বিকদের মূর্তিটি পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশ ও প্রশাসন পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ছবি ও ভিডিও দেখে বহু মানুষ ছুটে আসছেন মণ্ডলাই গ্রামে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, ইতিহাস চর্চার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ এখনও অটুট। রাজ্য পুরাতত্ত্ব বিভাগ যদি মূর্তিটি অধিগ্রহণ করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে, তবে এটি পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।

🛡️ সংরক্ষণ প্রচেষ্টা: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্ব

মূর্তিটি বর্তমানে স্থানীয়দের তত্ত্বাবধানে থাকলেও, এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে যথাযথ সংরক্ষণ জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খোলা আকাশের নিচে এবং অপরিকল্পিতভাবে রাখলে মূর্তির ক্ষতি হতে পারে। গ্রামবাসীরা চান, মূর্তি তাদের গ্রামেই থাকুক, তবে সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষিত হোক। ইতিমধ্যে স্থানীয় যুব সংগঠনগুলি মূর্তি রক্ষায় কমিটি গঠন করেছে। ডিজিটাল সংরক্ষণের অংশ হিসেবে মূর্তির ৩ডি স্ক্যান করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাস ধরে রাখতে সাহায্য করবে।

🔍 গবেষণামূলক বিশ্লেষণ: মূর্তির শিল্পতাত্ত্বিক মূল্যায়ন

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, মূর্তিটি পাল যুগের শেষ পর্বের (১১শ-১২শ শতক) বৈশিষ্ট্য বহন করে। এটি কালো কষ্টি পাথরে নির্মিত। চতুর্ভুজ বিষ্ণু সাধারণত শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম ধারণ করেন, যা এই মূর্তিতেও লক্ষণীয়। শিল্পতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে জানা যায়, পাল আমলের মূর্তিগুলিতে দেহের ভঙ্গি, অলংকরণ ও আনুপাতিক দৈর্ঘ্য বিশেষ বৈশিষ্ট্যের। এই মূর্তির গঠনশৈলী বিহারের নালন্দা ও পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য পাল স্থাপনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে চূড়ান্ত মতামত জানতে আরও বিশদ গবেষণা প্রয়োজন। তথ্য সূত্র: সার্বজনীন মা মনসা মন্দির সদস্যবৃন্দ, অর্ণব চক্রবর্তীর ওয়াল পোস্ট।

✨ উপসংহার: ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকার দায়িত্ব

মণ্ডলাই গ্রামের এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, আমাদের মাটির নিচে কত অমূল্য ইতিহাস চাপা পড়ে আছে। হুগলির পাণ্ডুয়া অঞ্চল প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুকুর খননের ফলে বেরিয়ে আসা এই পাল আমলের বিষ্ণু মূর্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সভ্যতা হারিয়ে গেলেও তার চিহ্ন থেকে যায় মাটির গভীরে, সঠিক সময়ের অপেক্ষায়। আমাদের দায়িত্ব এই প্রাচীন নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের শেকড়ের সন্ধান পায়। ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না, থাকে মাটির বুকে, মানুষের মনে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: মূর্তিটি ঠিক কোথায় পাওয়া গিয়েছে?
উত্তর: হুগলি জেলার পাণ্ডুয়া ব্লকের মণ্ডলাই গ্রামে একটি পুকুর সংস্কারের সময় এটি উদ্ধার হয়।

প্রশ্ন ২: মূর্তিটি কোন সময়ের?
উত্তর: বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক অনুমান, এটি পাল আমলের (অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী), অর্থাৎ প্রায় ৮০০-৯০০ বছরের পুরনো।

প্রশ্ন ৩: মূর্তির উচ্চতা ও উপাদান কী?
উত্তর: মূর্তির উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট এবং এটি কালো কষ্টি পাথরের তৈরি বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রশ্ন ৪: বর্তমানে মূর্তিটি কোথায় রাখা হয়েছে?
উত্তর: গ্রামবাসীরা মূর্তিটি উদ্ধার করে আপাতত স্থানীয় সার্বজনীন মা মনসা মন্দিরে রেখেছেন এবং সেখানে পুজোর ব্যবস্থা করেছেন।

প্রশ্ন ৫: পাণ্ডুয়ার প্রাচীন নাম কী?
উত্তর: পাণ্ডুয়া শহরটি প্রাচীনকালে 'প্রদ্যুম্ন নগর' নামে পরিচিত ছিল।

প্রশ্ন ৬: প্রত্নতাত্ত্বিকদের ভূমিকা কী?
উত্তর: স্থানীয় প্রশাসন প্রত্নতাত্ত্বিকদের মূর্তিটি পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশ ও প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

📢 আপনার এলাকায় কি এমন কোনো প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ বা ইতিহাস আছে? কমেন্ট বক্সে জানান। কোন মন্দির বা মূর্তির সন্ধান পেলে শেয়ার করুন। বাংলার ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি সম্পর্কে আরও জানতে আমাদের ব্লগের সাথে যুক্ত থাকুন।