|
| উঁচু টিলা, ঘন জারুল-হিজল-আকাশমণির অরণ্য। দেবলগড়ের ভূপ্রকৃতি যেন অন্য এক জগতের খোঁজ দেয়। |
📖 সূচিপত্র
নদিয়া জেলার দক্ষিণ প্রান্ত। গাংনাপুর থানার দেবগ্রাম। বাংলার এই সমতল ভূমিতে দাঁড়িয়ে হঠাৎ চোখ আটকে যায় প্রকৃতির এক অন্যমাত্রায়। এ যেন গাঙ্গেয় বদ্বীপের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করে দেখা পেয়ে গেলেন রাঢ় বাংলার টিলা-জঙ্গলের। উঁচু উঁচু টিলা, ঘন জারুল-হিজল-আকাশমণির অরণ্য। প্রথম দর্শনেই যে কাউকে মুগ্ধ করার জন্য এখানকার ভূপ্রকৃতি যথেষ্ট।
কিন্তু এই টিলাগুলো শুধু প্রকৃতির খেয়ালখুশি নয়। এগুলো মানবসভ্যতার এক দীর্ঘ ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। স্থানীয় প্রবীণ এক গ্রামবাসীর কথা আজও কানে বাজে, "ছোটবেলায় চিতাবাঘ আর শেয়ালের ভয় কাটিয়ে আমরা এসে হাজির হতাম এই টিলার মাথায়। দূর থেকে দেখা যেত কালো ধোঁয়া উড়িয়ে কয়লার ইঞ্জিন ট্রেন নিয়ে যেত রানাঘাট স্টেশন থেকে শিয়ালদার দিকে। তখন এই টিলা ছিল আরও অনেক বেশি উঁচু।"
এই উঁচু টিলাগুলো আসলে কী? এর উত্তর খুঁজতে গিয়েই এক প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের সূচনা, যে অভিযান আজও থেমে নেই।
দেবল রাজার গড়: চার কোণের নজরমিনার
|
| চার কোণের নজরমিনার ও বিশাল প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়। |
গ্রামবাসীর মুখে মুখে ফেরে 'দেবল রাজা'র নাম। জানা গেল, এই বিশাল এলাকা জুড়ে ছিল তার গড়। চারকোণে ছিল চারটি বিশাল নজরমিনার, যার একটি আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাকিগুলো মাটিকাটিয়েদের 'উন্নয়ন' ও কালের গ্রাসে প্রায় হারিয়ে গেলেও, একতলা-দোতলা বাড়ির উচ্চতা নিয়ে এখনও টিকে আছে।
তবে আসল চমক অপেক্ষা করছিল গড়ের সীমান্ত প্রাচীর (Rampart) ঘেঁষে। এই মাটির প্রাচীর এতটাই চওড়া যে একে দেওয়াল না বলে বিশাল এক বাঁধ বলাই ভালো। আশপাশের কৃষিজমির মাটির সাথে এর রঙ ও গঠনের বিস্তর ফারাক। ধারণা করা হয়, একসময় এই প্রাচীর ছিল তিরিশ থেকে পঞ্চাশ মিটার চওড়া! এতটাই চওড়া যে, তার ওপর দিয়ে জোড়ায় জোড়ায় সশস্ত্র ঘোড়সওয়ার ছুটে বেড়াতে পারতেন প্রহরায়। চন্দ্রকেতুগড় ও বাণগড়ের মতো প্রাচীন নগরীতেও একই ধরনের নগর পরিকল্পনার নিদর্শন মিলেছে।
অনুসন্ধানের শুরু: হারিয়ে যাওয়া নদী আর স্থানীয় মানুষের হাত ধরে
|
| হারিয়ে যাওয়া নদী আর স্থানীয় মানুষের হাত ধরে গড়ে উঠেছে এই সংগ্রহশালা। |
শীতের এক সকাল। হারিয়ে যাওয়া এক নদীর সন্ধানে পায়ে হেঁটে এগিয়ে চলা। ছোটবেলা থেকে শোনা দেবলগড়ের আনাচে-কানাচে তখন ইতিহাসের গন্ধ মেশানো বাতাস। সুউচ্চ নজরমিনার, গভীর পরিখা, বিশাল জলাশয় আর বিরাট প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ— সব মিলিয়ে এক রহস্যময় আলোছায়ার সৃষ্টি।
তারপর থেকে অজস্রবার আসা। প্রতিবারই চোখে পড়েছে পায়ের তলায় অনাদরে গুঁড়িয়ে যাওয়া হাজার বছরের পুরনো মৃৎপাত্র, টেরাকোটা সিল, অলঙ্কার আর পাথরের নকশাদার চাঁই। চাষীরা লাঙল চালাতে গিয়ে, গৃহস্থরা ঘর তৈরির মাটি কাটতে গিয়ে অমূল্য প্রত্নসম্পদ পেয়েও তা ভেঙে ফেলছেন অবহেলায়। এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখেই মনে হয়েছিল, স্থানীয় মানুষদের না জাগাতে পারলে এত বিশাল এলাকার ইতিহাস রক্ষা করা যাবে না।
২০১৪-১৫ সাল থেকে শুরু হয় মেঠো বৈঠক, চা-মুড়ির আসর। স্থানীয় কৌতূহলী মানুষদের সাথে আলাপ। অবশেষে ২০১৬ সালে গড়ে ওঠে 'দেবগ্রাম দেবলরাজা পুরাতত্ত্ব ও লোকসংস্কৃতি সংঘ'। অবসরপ্রাপ্ত ডাককর্মী চিত্তরঞ্জন বিশ্বাস নিজের ঘর ছেড়ে দিলেন অস্থায়ী সংগ্রহশালা তৈরির জন্য। গ্রামবাসীরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে জড়ো করতে লাগলেন লাঙলের ফালে ওঠা মূর্তি, ভাঙা হাঁড়ি, ধানের গোলার নিচ থেকে পাওয়া পাথরের ব্লক। আজ এই সংঘের হাত ধরেই দেবলগড় পৌঁছে গেছে দূর-দূরান্তের ইতিহাসপ্রেমী থেকে শুরু করে এশিয়াটিক সোসাইটি, রাজ্য পুরাতত্ত্ব দপ্তর এমনকি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের (ASI) দরবারেও।
সময়ের স্তর ভেদ করে: বিভিন্ন যুগের নিদর্শন
|
| বিভিন্ন যুগের নিদর্শন—গুপ্ত, পাল-সেন, সুলতানি ও ঔপনিবেশিক আমলের ছাপ স্পষ্ট। |
দেবলগড় শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের নয়, বরং বিভিন্ন সভ্যতার ক্রমবিকাশের এক জীবন্ত পাঠশালা। এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত নিদর্শনগুলির স্তর ক্রমান্বয় এখানে একাধিক ইতিহাসের অধ্যায়কে চিহ্নিত করে।
ভূ-প্রত্নতত্ত্বের চোখে দেবলগড়
শুধু প্রত্নবস্তু সংগ্রহ নয়, সমগ্র এলাকার ইতিহাস আর ভূগোলকে একসাথে মেলাতে শুরু হয়েছে ভূ-প্রত্নতত্ত্বের (Geo-archeology) চর্চা। এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানকে মূলত পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে—
এখনও অমীমাংসিত রহস্য
প্রশ্নের শেষ নেই। প্রতিটি মাটির ঢিবি, প্রতিটি ভাঙা ইট আমাদের কিছু না কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়।
উপসংহার
দেবলগড় শুধু একটি প্রত্নস্থল নয়, এটি একটি আবেগ। এটি একটি গ্রামীণ গণআন্দোলনের নাম, যেখানে চাষি-মজুর থেকে শুরু করে স্কুলের কিশোর, প্রত্যেকেই ইতিহাসের অংশীদার। আজও সংঘের সদস্যরা উড়িয়ে চলেছেন মাটির ধুলো। গ্রামের বধূরা তুলসী মঞ্চের পাশে জড়ো করে রাখেন লাঙলের তলায় ওঠা টেরাকোটার পুঁতি। কিশোরীরা নদীর ধার থেকে কুড়িয়ে আনে খাপড়া বাটি।
ছোট্ট সংগ্রহশালায় আজ ঠাঁই নেই। ধানের গোলা, শ্যালো মেশিনের তলা, সিঁড়ি হয়ে যাওয়া প্রাচীন ইঁট— সবই এখন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে জড়ো হয়েছে এখানে।
আপনাকে আমন্ত্রণ। ঘুরে আসুন নদিয়ার দেবলগড়। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে দেখুন হাজার বছরের প্রাচীন প্রাচীর। ছুঁয়ে দেখুন নজরমিনারের মাটি। অনুভব করুন কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া এক সভ্যতার স্পন্দন। দেখে আসুন, কীভাবে একদল সাধারণ মানুষ 'ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর' পাগলামিতে নেমে লিখে ফেলছেন ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়।
বাংলার প্রত্নতত্ত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হোক, কুয়াশা সরুক হাজার বছরের। দেবলগড়ে স্বাগতম।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
📍 দেবলগড় কোথায় অবস্থিত এবং যাতায়াতের উপায় কী?
🏺 এখানে কী কী প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গেছে?
📚 প্রধান তথ্যসূত্র
লেখক: ড. বিশ্বজিৎ রায়
