গঙ্গারিডাই: প্রাচীন বঙ্গের শক্তিশালী সাম্রাজ্যের পূর্ণ ইতিহাস
📑 সূচিপত্র
- ১. ভূমিকা
- ২. নামের উৎস ও ব্যুৎপত্তি
- ৩. গ্রীক-রোমান লেখকদের বর্ণনা
- ৪. ভৌগোলিক অবস্থান
- ৫. রাজধানী ও প্রধান নগরী
- ৬. শাসনব্যবস্থা ও রাজবংশ
- ৭. নন্দ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক
- ৮. সামরিক শক্তি ও আলেকজান্ডার
- ৯. অর্থনীতি ও বাণিজ্য
- ১০. সংস্কৃতি ও সভ্যতা
- ১১. সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে তুলনা
- ১২. বিলুপ্তির কারণ
- ১৩. FAQs
- ১৪. উপসংহার
🪔 ভূমিকা
ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে অনেক শক্তিশালী রাজ্যের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। কিন্তু এমন একটি রাজ্য ছিল, যা গ্রীক ও রোমান ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় বারবার উচ্চারিত হয়েছিল, অথচ ভারতীয় সাহিত্যে তার কোনো সরাসরি উল্লেখ পাওয়া যায় না—সেই রাজ্যের নাম গঙ্গারিডাই (Gangaridai)।
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত গ্রীক ও লাতিন লেখকদের বিবরণে গঙ্গারিডাই একটি পরাক্রমশালী জাতি ও রাজ্য হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ভারত অভিযানের সময় এই রাজ্যের সামরিক শক্তির খবর পেয়েই তিনি আর পূর্ব দিকে অগ্রসর হননি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—গঙ্গারিডাই আসলে কোথায় ছিল? কারা ছিল এই জাতি? তাদের রাজধানী কোথায় ছিল? আর কেনই বা ভারতীয় ইতিহাসের মূল স্রোতে তাদের নাম এত কম শোনা যায়?
এই প্রবন্ধে প্রাচীন গ্রীক-রোমান বিবরণ, আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণা এবং ভৌগোলিক প্রমাণের ভিত্তিতে গঙ্গারিডাই সাম্রাজ্যের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরা হবে।
📜 গঙ্গারিডাই নামের উৎস ও ব্যুৎপত্তি
গঙ্গারিডাই শব্দটি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। প্রদত্ত পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী, বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ডক্টর নীহাররঞ্জন রায়-এর মতে, গঙ্গারিডাই নামটি "গঙ্গারাষ্ট্র" শব্দ থেকে এসেছে। প্রাকৃত ভাষায় "গঙ্গারাষ্ট্র" থেকে "গঙ্গারাস" এবং তা থেকেই গ্রীকরা "গঙ্গারিডাই" শব্দটি তৈরি করে।
অন্যদিকে, ভাষাবিদ আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, "গঙ্গারিডাই" শব্দটি "গঙ্গারিদ্য" বা "গঙ্গারাধ" শব্দের গ্রীক অপভ্রংশ। সংস্কৃত "গঙ্গারাধ" অর্থ "গঙ্গার অধিপতি" বা "গঙ্গার উপকূলের অধিবাসী"। বিনয় ঘোষ তাঁর "পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে গঙ্গারিডাই সংস্কৃত "গঙ্গারাপ্ত", "গঙ্গারাচ" বা "গঙ্গান্দয়" নামের গ্রীক বিকৃতি।
মজার ব্যাপার হলো, রাঢ় বা রাড় শব্দটির সঙ্গেও এই নামের যোগসূত্র খুঁজে পান অনেক গবেষক। রামপ্রসাদ চন্দর মতে, গঙ্গারিডাই রাজ্য শুধু রাঢ় দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এই রাজ্য বিস্তৃত ছিল।
🏛️ গ্রীক-রোমান লেখকদের বর্ণনা
গঙ্গারিডাই সম্পর্কে আমাদের জানার প্রধান উৎস হলো গ্রীক ও রোমান লেখকদের বিবরণ। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত বিভিন্ন লেখক এই শক্তিশালী জাতির কথা লিপিবদ্ধ করেছেন।
ডিওডোরাস সিকুলাস (খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক)
ডিওডোরাস তাঁর "Bibliotheke" গ্রন্থে লিখেছেন, “এই নদী (গঙ্গা) উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে পতিত হয়েছে, যা গঙ্গারিডাই জাতির পূর্ব সীমা গঠন করেছে। এই জাতির কাছে বিশাল আকৃতির হাতির বিশাল বাহিনী রয়েছে। এই কারণে বিদেশী কোনো রাজা কখনও তাদের দেশ জয় করতে পারেনি।” তিনি আরও জানান যে আলেকজান্ডার যখন গঙ্গা নদীর তীরে পৌঁছে জানতে পারেন যে গঙ্গারিডাইদের কাছে চার হাজার সুপ্রশিক্ষিত যুদ্ধহাতি রয়েছে, তখন তিনি সেখানে আক্রমণ করার আশা ছেড়ে দেন।
কুইন্টাস কার্টিয়াস রুফাস (খ্রিস্টীয় প্রথম শতক)
রোমান ঐতিহাসিক কার্টিয়াস জানান, গঙ্গারিডাই ও প্রাসী (প্রাচ্য) জাতি গঙ্গার দূর তীরে বাস করত। তাদের রাজা অগ্রাম্মেস (Aggrammes)-এর ছিল ২০,০০০ অশ্বারোহী, ২০০,০০০ পদাতিক, ২০০০ রথ এবং ৩০০০-৪০০০ হাতি।
প্লিনি (খ্রিস্টীয় প্রথম শতক)
প্লিনি তাঁর "Naturalis Historia" গ্রন্থে গঙ্গারিডাই ও ক্যালিঙ্গেদের মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত দেন। প্লিনির মতে, গঙ্গারিডাম ক্যালিঙ্গারাম রেজিয়া (Gangaridum Calingarum Regia)—গঙ্গারিডাই ও ক্যালিঙ্গাদের একটি যৌথ রাজধানী ছিল, যার নাম পার্থালিস (Parthalis)।
প্লুটার্ক
প্লুটার্কের বিবরণে জানা যায় যে আলেকজান্ডার যখন জানতে পারেন গঙ্গারিডাই ও প্রাসীদের কাছে ৮০,০০০ অশ্বারোহী, ২০০,০০০ পদাতিক, ৮০০০ রথ এবং ৬০০০ হাতি রয়েছে, তখন তাঁর সৈন্যরা আরও পূর্বে অগ্রসর হতে অস্বীকার করে।
🗺️ গঙ্গারিডাই-এর ভৌগোলিক অবস্থান
বইয়ের একাধিক স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে যে গঙ্গারিডাই রাজ্য গঙ্গার পশ্চিম তীরে অবস্থিত ছিল। ডিওডোরাসের বর্ণনায় গঙ্গা এই জাতির পূর্ব সীমা বলে উল্লেখিত হয়েছে। অর্থাৎ গঙ্গার পশ্চিমে অবস্থিত ভূখণ্ডই ছিল গঙ্গারিডাইদের আবাসভূমি।
গবেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, গঙ্গারিডাই মূলত রাঢ় দেশের অধিবাসী। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া, বর্ধমান ও মেদিনীপুর জেলার পশ্চিমাংশ—এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলই প্রাচীন রাঢ় দেশ নামে পরিচিত ছিল। জৈন গ্রন্থ "আচারাঙ্গ সূত্রে" (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক) রাঢ় দেশের উল্লেখ পাওয়া যায়।
ডক্টর দীনেশচন্দ্র সরকার, ডক্টর নীহাররঞ্জন রায় প্রমুখ ঐতিহাসিকের মতে, গঙ্গারিডাই রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল—রাঢ় দেশ (পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চল), তাম্রলিপ্ত (বর্তমানে তমলুক), দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গের বিস্তীর্ণ অংশ ও সুতানুটি অঞ্চল।
বইটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়—গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর সঙ্গমস্থল থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা যে স্থানে কুমারী নদীর মাধ্যমে সমুদ্রে পতিত হতো, সেই অঞ্চলও গঙ্গারিডাই রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সব মিলিয়ে, গঙ্গারিডাই রাজ্য বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, ঝাড়খণ্ডের কিছু অংশ, বিহারের দক্ষিণ-পূর্বাংশ ও ওড়িশার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল বলে অনুমান করা হয়।
🏰 রাজধানী ও প্রধান নগরী
পার্থালিস (Parthalis)
প্লিনির বর্ণনায় গঙ্গারিডাই-ক্যালিঙ্গাদের রাজধানীর নাম পার্থালিস (Parthalis) বা পাথালিস (Pathalis) বলে উল্লেখ আছে। আধুনিক গবেষকরা এই পার্থালিসকে বর্ধমান অঞ্চলের সঙ্গে শনাক্ত করেছেন। অনেকের মতে, এটি ছিল পুষ্করিণী বা পুষ্করিণ নামক স্থান, যা বর্ধমানের কাছেই অবস্থিত।
গঙ্গে (Gange)
"পেরিপ্লাস অফ দ্য ইরিথ্রিয়ান সি" গ্রন্থের অজ্ঞাতনামা গ্রীক নাবিক গঙ্গা নদীর তীরে গঙ্গে (Gange) নামে একটি বন্দর নগরীর কথা উল্লেখ করেছেন। এই নগরী থেকে মসলিন, সূক্ষ্ম কাপড় ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানি হতো। এই গঙ্গে নগরীকে অনেকে সপ্তগ্রাম, সাতগাঁও বা হুগলির সপ্তগ্রাম অঞ্চলের সঙ্গে শনাক্ত করেন। আবার কেউ কেউ একে গঙ্গাসাগর বা কাকদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত বলে মনে করেন।
তাম্রলিপ্ত (Tamralipta)
গঙ্গারিডাই রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগরী ও বন্দর ছিল তাম্রলিপ্ত। মহাভারত, পুরাণ ও বৌদ্ধ সাহিত্যে এই নগরীর বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। তাম্রলিপ্ত ছিল প্রাচীন ভারতের অন্যতম প্রধান সমুদ্রবন্দর। এখান থেকে শ্রীলঙ্কা, জাভা, সুমাত্রা, চীন ও অন্যান্য দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশে বাণিজ্য চলত। হিউয়েন সাঙ সপ্তম শতকে যখন ভারতে আসেন, তখনও তিনি তাম্রলিপ্ত বন্দরের উল্লেখ করেছেন।
পুণ্ড্রনগর
কেউ কেউ মনে করেন, গঙ্গারিডাই রাজ্যের রাজধানী ছিল পুণ্ড্রনগর (বর্তমান বগুড়া, বাংলাদেশ)। কিন্তু এই মত খুব বেশি গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ গঙ্গারিডাই রাজ্য পুণ্ড্রবর্ধনের চেয়ে অনেক বেশি পশ্চিমে অবস্থিত ছিল বলে গ্রীক বিবরণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।
👑 শাসনব্যবস্থা ও রাজবংশ
ডিওডোরাসের বিবরণ অনুযায়ী, গঙ্গারিডাইদের রাজা ছিলেন নির্বাচিত এবং তিনি তাঁর প্রজাদের কাছে প্রীতিভাজন ছিলেন। এই তথ্য থেকে অনুমান করা যায় যে গঙ্গারিডাইদের শাসনব্যবস্থা ছিল অনেকটা গণতান্ত্রিক বা প্রজাতান্ত্রিক ধাঁচের।
মেগাস্থিনিস ও অন্যান্য গ্রীক লেখকদের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে গঙ্গারিডাই ও প্রাসীদের রাজা ছিলেন জান্ড্রামেস (Xandrames) বা অগ্রাম্মেস (Aggrammes)। এই নামটি "উগ্রসেন" শব্দের গ্রীক অপভ্রংশ বলে মনে করা হয়। সিংহলী পালি গ্রন্থ "দীপবংশে" মহাপদ্ম নন্দকে উগ্রসেন বলা হয়েছে। অতএব, এই জান্ড্রামেস আসলে মহাপদ্ম নন্দ ছাড়া আর কেউ নন।
ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর "বাংলাদেশের ইতিহাস" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় গঙ্গারিডাই ও প্রাসীদের রাজা ছিলেন মহাপদ্ম নন্দ। তিনি বঙ্গ থেকে উঠে এসে পাটলিপুত্রে রাজধানী স্থাপন করেন। নন্দ রাজারা ছিলেন গঙ্গারিডাই বংশোদ্ভূত।” রমাপ্রসাদ চন্দও তাঁর "গৌড়রাজমালা" গ্রন্থে এই মত সমর্থন করেছেন।
🤝 নন্দ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক
ডক্টর হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী, ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ ঐতিহাসিক মনে করেন, গঙ্গারিডাই ও প্রাসী (প্রাচ্য) ছিল নন্দ সাম্রাজ্যেরই দুটি অংশ। গ্রীকরা একে দুটি ভিন্ন নামে উল্লেখ করলেও, বাস্তবে এটি একটি মাত্র সাম্রাজ্য ছিল। এই মত অনুযায়ী, নন্দ সাম্রাজ্যের পশ্চিম অংশ (মগধ) ছিল প্রাসী এবং পূর্ব-দক্ষিণ অংশ (গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ) ছিল গঙ্গারিডাই। নন্দ রাজারা একই সঙ্গে উভয় অঞ্চলের অধিপতি ছিলেন।
অপর একটি মত অনুযায়ী, গঙ্গারিডাই ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য, যা মগধের নন্দ সাম্রাজ্যের মিত্র ছিল। রমাপ্রসাদ চন্দের মতে, “গঙ্গারিডাই রাজ্য যে শুধু রাঢ় দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়। গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে এই রাজ্য বিস্তৃত ছিল এবং এটি নন্দ সাম্রাজ্যের সঙ্গে একীভূত অবস্থায় ছিল। কিন্তু আভ্যন্তরীণভাবে এর স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় ছিল।”
⚔️ সামরিক শক্তি ও আলেকজান্ডারের মুখোমুখি
গঙ্গারিডাইদের সামরিক শক্তি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ। বিভিন্ন গ্রীক সূত্রে সৈন্যবাহিনীর বিবরণ পাওয়া যায়—ডিওডোরাসের মতে ২,০০,০০০ পদাতিক, ২০,০০০ রথ ও ৪,০০০ হাতি; প্লিনির মতে ৬,০০,০০০ পদাতিক ও ৯,০০০ হাতি; প্লুটার্কের মতে ৮০,০০০ অশ্বারোহী, ২,০০,০০০ পদাতিক ও ৬,০০০ হাতি। এই সংখ্যার তারতম্য থাকলেও, সব সূত্রেই একটি বিষয় স্পষ্ট—গঙ্গারিডাইদের হস্তীবাহিনী ছিল বিশাল ও অপ্রতিরোধ্য।
খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে আলেকজান্ডার যখন বিপাশা নদীর (বর্তমান বিয়াস) তীরে পৌঁছান, তখন তিনি জানতে পারেন যে আরও পূর্বে গঙ্গারিডাই ও প্রাসীদের বিশাল সাম্রাজ্য অবস্থিত। ডিওডোরাস লিখেছেন, “আলেকজান্ডার যখন তাঁর সমস্ত সৈন্য নিয়ে গঙ্গা নদীর তীরে পৌঁছান এবং অন্যান্য ভারতীয়দের পরাজিত করেন, তখন তিনি গঙ্গারিডাইদের আক্রমণের আশা ছেড়ে দেন যখন জানতে পারেন যে তাদের কাছে যুদ্ধের জন্য সুপ্রশিক্ষিত চার হাজার হাতি রয়েছে।”
প্লুটার্ক আরও নাটকীয়ভাবে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, “গঙ্গারিডাই ও প্রাসীদের রাজার ৮০,০০০ অশ্বারোহী, ২,০০,০০০ পদাতিক, ৮,০০০ রথ ও ৬,০০০ হাতি রয়েছে জানতে পেরে আলেকজান্ডারের সৈন্যরা আর পূর্বে অগ্রসর হতে অস্বীকার করে। আলেকজান্ডার তাঁর তাঁবুতে তিন দিন একা কাটান, তারপর সেনাপতিদের সঙ্গে পরামর্শ করে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।”
💰 অর্থনীতি ও বাণিজ্য
গঙ্গারিডাই রাজ্যের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল কৃষি, বাণিজ্য ও খনিজ সম্পদ। গাঙ্গেয় সমভূমির উর্বর পলিমাটি কৃষির জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল। ধান ছিল প্রধান ফসল। বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে তাম্রলিপ্ত অঞ্চলে ধানের প্রচুর চাষ হতো এবং তা বিদেশে রপ্তানি করা হতো।
প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল তাম্রলিপ্ত, গঙ্গে ও সপ্তগ্রাম। তাম্রলিপ্ত থেকে শ্রীলঙ্কা, জাভা, সুমাত্রা, মালয় উপদ্বীপ ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চলত। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে ছিল—মসলিন ও সূক্ষ্ম বস্ত্র, রেশম, হাতির দাঁত, সুগন্ধি দ্রব্য (জটামাংসী, তেজপাতা), মশলা, স্বর্ণ ও রৌপ্য।
গঙ্গারিডাই রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল (বর্তমান ঝাড়খণ্ড ও বাঁকুড়া অঞ্চল) খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ছিল—লৌহ আকরিক, তামা, স্বর্ণ (সুবর্ণরেখা নদীর নাম থেকে বোঝা যায়) ও রূপা। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও এই অঞ্চলের খনিজ সম্পদের উল্লেখ আছে।
🎭 সংস্কৃতি ও সভ্যতা
গঙ্গারিডাই অঞ্চলের প্রধান ভাষা ছিল মাগধী প্রাকৃত। বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই অঞ্চলের ভাষা পরবর্তীকালে বাংলা, ওড়িয়া ও অসমীয়া ভাষার জন্ম দেয়। এখানে প্রচলিত ধর্মগুলোর মধ্যে ছিল—প্রাক-আর্য ধর্ম (প্রকৃতি পূজা, শিব ও কালীর উপাসনা), জৈন ধর্ম (মহাবীরের সময় থেকেই) এবং বৌদ্ধ ধর্ম (মৌর্য যুগে)। বইটিতে বলা হয়েছে যে মহাবীর নিজেই রাঢ় ও তাম্রলিপ্ত অঞ্চলে ধর্ম প্রচার করেছিলেন।
গঙ্গারিডাই অঞ্চলের সমাজ ছিল বহুস্তরবিশিষ্ট ও বৈচিত্র্যময়। এখানে বিভিন্ন জাতি ও উপজাতির বসবাস ছিল—পুণ্ড্র, বঙ্গ, রাঢ়ীয়, তাম্রলিপ্ত এবং আদিবাসী সম্প্রদায় (সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওরাওঁ প্রমুখ)। তাম্রলিপ্তের খনন কাজে প্রাপ্ত পুরাবস্তু থেকে বোঝা যায় যে এখানে ইটের তৈরি দোতলা বাড়ি, পাকা রাস্তা ও উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা ছিল।
🌊 গঙ্গারিডাই বনাম সিন্ধু সভ্যতা
বইটিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তুলনা করা হয়েছে—গঙ্গারিডাই সভ্যতার সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার (হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো) সাদৃশ্য নিয়ে। গবেষকরা মনে করেন, সিন্ধু সভ্যতার পতনের কিছু পরে গাঙ্গেয় সভ্যতার উত্থান ঘটলেও, এই দুই সভ্যতার মধ্যে সময়গত ব্যবধান খুব বেশি নয়। গঙ্গারিডাই অঞ্চলে প্রাপ্ত কিছু পুরাবস্তুর (মৃৎপাত্রের নকশা, তামার অস্ত্র, পোড়ামাটির মূর্তি) সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার পুরাবস্তুর সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
ডক্টর রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, গাঙ্গেয় সভ্যতা ছিল সিন্ধু সভ্যতারই পূর্বাঞ্চলীয় সম্প্রসারণ। তবে গঙ্গারিডাই সভ্যতার কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যও ছিল—নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা (সিন্ধু সভ্যতা ছিল মূলত সিন্ধু নদকেন্দ্রিক, কিন্তু গঙ্গারিডাই সভ্যতা ছিল গঙ্গা ও তার উপনদীকেন্দ্রিক), সমুদ্র বাণিজ্য (সিন্ধু সভ্যতার চেয়ে বেশি বিস্তৃত) এবং হস্তী শক্তি (হাতির ব্যবহার ও প্রশিক্ষণে অদ্বিতীয়)। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, বাঁকুড়া ও মুর্শিদাবাদে সাম্প্রতিক খনন কাজে সিন্ধু সভ্যতার সমসাময়িক কিছু পুরাবস্তু পাওয়া গেছে।
🍂 বিলুপ্তির কারণ
গঙ্গারিডাই নামটি খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের পর থেকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়। এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। খ্রিস্টপূর্ব ৩২১ অব্দে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নন্দ রাজবংশকে পরাজিত করে মগধের সিংহাসন দখল করেন। এরপর গঙ্গারিডাই রাজ্যও ধীরে ধীরে মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে কালিঙ্গের রাজা খারবেল পরাক্রমশালী হয়ে ওঠেন। তাঁর হাতিগুম্ফা শিলালিপি থেকে জানা যায় যে তিনি মগধ ও রাঢ় অঞ্চল জয় করেন। এর ফলে গঙ্গারিডাই রাজ্যের স্বাধীন অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়।
গঙ্গা ও তার উপনদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে বাণিজ্যকেন্দ্র ও নগরগুলোর গুরুত্ব হ্রাস পায়। তাম্রলিপ্ত বন্দরের ধীরে ধীরে পতন ঘটে এবং নতুন বন্দর (সপ্তগ্রাম) গুরুত্ব পায়। সম্ভবত গঙ্গারিডাই নামটি ধীরে ধীরে বঙ্গ, গৌড় বা রাঢ় নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। পাল যুগে (অষ্টম-দ্বাদশ শতক) গৌড় ও বঙ্গ নামই বেশি প্রচলিত ছিল। গঙ্গারিডাই জাতি ধীরে ধীরে অন্যান্য জাতির সঙ্গে মিশে যায়। বইটিতে বলা হয়েছে, “গঙ্গারিডাই যখন একটি জাতিতে পরিণত হয়, তখন থেকেই খ্রিস্টীয় তৃতীয়/চতুর্থ শতক থেকে গঙ্গারিডাই আত্মপ্রকাশ করে। আগেকার গঙ্গারিডাই ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে আত্মপ্রকাশ করে নবীন বাঙালি জাতি।”
পাঠকদের জিজ্ঞাসা (FAQs)
প্রশ্ন ১: গঙ্গারিডাই কী—জাতি নাকি ভৌগোলিক অঞ্চল?
উত্তর: গঙ্গারিডাই ছিল একাধিক জাতির সমন্বয়ে গঠিত একটি জনগোষ্ঠী এবং তাদের অধিকৃত ভৌগোলিক অঞ্চল। গ্রীক বিবরণে একে জাতি হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে, আবার রাজ্য হিসেবেও।
প্রশ্ন ২: গঙ্গারিডাই শব্দের উৎস কী?
উত্তর: গঙ্গারিডাই শব্দটি সম্ভবত সংস্কৃত গঙ্গারাষ্ট্র, গঙ্গারাধ বা গঙ্গারাচ থেকে গ্রীক অপভ্রংশের মাধ্যমে এসেছে। এর অর্থ গঙ্গার উপকূলের অধিবাসী বা গঙ্গারাষ্ট্রের অধিবাসী।
প্রশ্ন ৩: গঙ্গারিডাই রাজ্যের রাজধানী কোথায় ছিল?
উত্তর: প্লিনির বিবরণ অনুযায়ী গঙ্গারিডাই-ক্যালিঙ্গাদের রাজধানী ছিল পার্থালিস (পাথালিস)। আধুনিক গবেষকরা একে বর্ধমান বা পুষ্করিণী অঞ্চলের সঙ্গে শনাক্ত করেন। এছাড়াও গঙ্গে ও তাম্রলিপ্ত গুরুত্বপূর্ণ নগরী ও বন্দর ছিল।
প্রশ্ন ৪: আলেকজান্ডার কেন গঙ্গারিডাই আক্রমণ করেননি?
উত্তর: আলেকজান্ডার যখন জানতে পারেন গঙ্গারিডাইদের কাছে ৩০০০-৬০০০ প্রশিক্ষিত যুদ্ধহাতি এবং বিশাল সৈন্যবাহিনী রয়েছে, তখন তাঁর সৈন্যরা আর পূর্বে অগ্রসর হতে অস্বীকার করে। বাধ্য হয়ে আলেকজান্ডার ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
প্রশ্ন ৫: গঙ্গারিডাই ও নন্দ সাম্রাজ্যের মধ্যে সম্পর্ক কী?
উত্তর: গবেষকদের মতে, গঙ্গারিডাই ছিল নন্দ সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ একটি অংশ। মহাপদ্ম নন্দ নিজে ছিলেন গঙ্গারিডাই রাজবংশের সদস্য। তিনি পুণ্ড্রবর্ধন থেকে উঠে এসে মগধ জয় করেন এবং পাটলিপুত্রে রাজধানী স্থাপন করেন।
🔚 উপসংহার
গঙ্গারিডাই প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের একটি বিশেষ অধ্যায়। গ্রীক ও রোমান ঐতিহাসিকদের বিস্ময় ও শ্রদ্ধার পাত্র এই জাতি ভারতীয় ইতিহাসের মূল ধারায় তেমন গুরুত্ব না পেলেও, তাদের শক্তি, ঐশ্বর্য ও সভ্যতার স্বীকৃতি মেলে বিদেশী সূত্রেই। গঙ্গারিডাই মূলত গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীন অধিবাসী, যারা রাঢ়, তাম্রলিপ্ত ও সুতানুটি অঞ্চলে বাস করত। তাদের রাজধানী ছিল পার্থালিস (বর্ধমান অঞ্চল) এবং প্রধান বন্দর ছিল তাম্রলিপ্ত (তমলুক)।
তাদের বিশাল হস্তীবাহিনী ও সামরিক শক্তি এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে স্বয়ং আলেকজান্ডারও তাদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস পাননি। মহাপদ্ম নন্দের মতো সম্রাট এই অঞ্চল থেকেই উঠে এসে মগধ জয় করে বিশাল নন্দ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। কালক্রমে গঙ্গারিডাই নামটি বিলুপ্ত হয়ে গেলেও, তাদের রক্ত ও সংস্কৃতি বাঙালি জাতির মধ্যে মিশে আছে। আজকের বাঙালির শস্যশ্যামলা ভূমি, নদীকেন্দ্রিক জীবন, বাণিজ্যপ্রিয়তা ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের ধারা—সবই গঙ্গারিডাইদের কাছ থেকে পাওয়া উত্তরাধিকার। গঙ্গারিডাই শুধু একটি হারানো জাতি নয়, তারা প্রাচীন বাঙালির গৌরবের প্রতীক।
