![]() |
| নতুন বছরে পুরুলিয়ার ছৌ নাচ: বীর-রসের উৎসব |
ছৌ নাচের জনপ্রিয়তা ও ভৌগোলিক বিস্তার
![]() |
| পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়া ও ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য —পুরুলিয়ার ছৌ-নাচ গবেষণার ঐতিহাসিক মুহূর্ত।ছবি: পুরুলিয়া আর্কাইভ ডিজিটাল সংগ্রহশালা। |
ছৌ শব্দের উৎপত্তি ও ইতিহাসের বিবর্তন
ছৌ নৃত্যের নামের উৎপত্তি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য রয়েছে। ড. পশুপতি প্রসাদ মাহাতো ও ড. সুধীর করণ-এর মতে এই নাচের নাম “ছো”। অন্যদিকে বিভূতিভূষণ দাশগুপ্ত ও ড. বঙ্কিমচন্দ্র মাহাতো মনে করেন, এই নাচের নাম “ছ”। পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র অধ্যাপক ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য সর্বপ্রথম “ছ” বা “ছো”-এর পরিবর্তে “ছৌ” শব্দটি ব্যবহার করেন।বিদেশে এই নাচের প্রদর্শনের ব্যবস্থা করার পর থেকেই নৃত্যটি “ছৌ নাচ” নামেই সর্বাধিক পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
'ছৌ' শব্দের উৎপত্তি নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিভিন্ন মতবাদ আছে। ডঃ ভট্টাচার্য মনে করেন, এটি সংস্কৃত 'সং' (Saṅga) শব্দ থেকে এসেছে। 'সং' মানে হলো একজন মানুষ যখন অন্য কোনো চরিত্রের রূপ ধারণ করে (বিশেষ করে বিদূষক বা সঙ)। মুখোশের মাধ্যমে নিজের পরিচয় পরিবর্তন করাই হলো এর মূল বৈশিষ্ট্য।
আবার অনেক গবেষক মনে করেন, 'ছায়া' (Shadow) শব্দ থেকে ছৌ এসেছে। কারণ এই নাচে নর্তকের অঙ্গভঙ্গি অনেকটা ছায়া-পুতুল নাচের ছন্দের মতো। অন্য একটি জনপ্রিয় মত হলো 'ছাউনি' (Military Camp)। পুরুলিয়ার রাঢ় অঞ্চলের বীর যোদ্ধারা যুদ্ধের প্রস্তুতির সময় যে রণ-নৃত্য অভ্যাস করতেন, তা থেকেই আজকের এই ছৌ নাচের উদ্ভব।
![]() |
| ছৌ-নাচ শিল্পী পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং-মুড়া |
ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য: ছৌ নাচের বিশ্বভ্রমণের কারিগর
পুরুলিয়ার ছৌ আজ বিশ্ববন্দিত, কিন্তু এর পেছনের মূল কারিগর ছিলেন ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য। ১৯৬১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে একটি ফিল্ড-ট্রিপে গিয়ে তিনি বাঘমুন্ডি ব্লকের একটি গ্রামে এই নাচের সন্ধান পান। তিনি লক্ষ্য করেন:
বিস্মৃত শিল্প: এই অপূর্ব শিল্পটি তখন শুধু গ্রাম্য উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছিল।
গবেষণামূলক পদক্ষেপ: তিনি ইংরেজি জার্নালে এই নাচ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি শুরু করেন।
দিল্লির মঞ্চে প্রথম পদার্পণ: ১৯৬৮ সালে সংগীত নাটক একাডেমির উদ্যোগে ৪০ জন শিল্পীকে নিয়ে তিনি দিল্লিতে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। সেই প্রথম বাইরের দুনিয়া এই বীর-রসাত্মক নাচের শক্তি অনুভব করে।
একাডেমিক স্বীকৃতি: তাঁর প্রচেষ্টায় রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নাচকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
![]() |
| পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়া, পুরুলিয়ার ছৌ-নাচের কিংবদন্তি শিল্পী |
নৃতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট ও জনজাতির অবদান
পুরুলিয়ার ছৌ নাচের সঙ্গে সেই অঞ্চলের ভূমিপুত্রদের গভীর সংযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মুড়া (Mura) এবং ভূমিজ (Bhumij) সম্প্রদায়ের মানুষরা এই নাচের প্রধান ধারক ও বাহক।
ওস্তাদের ভূমিকা: মুড়া সম্প্রদায়ের ওস্তাদরা বংশপরম্পরায় প্রায় ৫-৬ প্রজন্ম ধরে এই নাচের শিক্ষা দিয়ে আসছেন। এটি তাদের কাছে কেবল জীবিকা নয়, এক পবিত্র ধর্মীয় আচার।
ব্রাহ্মণ্য প্রভাব ও হিন্দু পুরাণ: ছৌ নাচ মূলত একটি আদিবাসী নৃত্য হলেও, পরবর্তীকালে বাঘমুন্ডি ও চোরদা-র রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এতে হিন্দু ধর্মের প্রভাব যুক্ত হয়। রামায়ণ, মহাভারত এবং পুরাণের বিভিন্ন কাহিনী এই নাচের থিম বা বিষয়বস্তু হিসেবে যুক্ত হয়।
![]() |
| পুরুলিয়ার ছৌ-নাচের মুখোশ নির্মাণ ও লোকশিল্পের রঙিন জগৎ। |
পুরুলিয়ার ছৌ নাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর মুখোশ। মুখোশ ছাড়া এই নাচের প্রাণপ্রতিষ্ঠা অসম্ভব।
রিয়ালিস্টিক মুখভঙ্গি: উড়িষ্যার সরাইকেল্লা ছৌ-তে মুখোশগুলো প্রতীকী বা 'সিম্বলিক' হলেও পুরুলিয়ার মুখোশগুলো অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। গণেশের শুঁড় থেকে শুরু করে অসুরের ভয়ংকর চেহারা—সবই খুব নিখুঁত।
চারিদা গ্রাম: বাঘমুন্ডি ব্লকের চারিদা গ্রাম হলো ছৌ মুখোশের আঁতুড়ঘর। এখানকার সূত্রধর শিল্পীরা মাটি, কাগজের মণ্ড এবং কাপড় দিয়ে এই ওজনদার কিন্তু অপূর্ব মুখোশ তৈরি করেন।
সজ্জা: এই মুখোশগুলোতে পুঁতি, জরি এবং শোলার কাজ থাকে যা রাতের আলোয় দর্শকদের মুগ্ধ করে।
![]() |
শৈলী ও কারিগরি, বীর-রসের প্রকাশ |
শৈলী ও কারিগরি: বীর-রসের প্রকাশ
ছৌ নাচ কোনো সাধারণ নাচ নয়, এটি একটি 'নৃত্য-নাট্য' (Dance-Drama)। এর কিছু বিশেষ টেকনিক্যাল দিক রয়েছে:
তাণ্ডব নৃত্য: ছৌ মূলত পুরুষদের নাচ এবং এতে 'তাণ্ডব' বা বীর-রসাত্মক অঙ্গভঙ্গি প্রধান। শিল্পীদের প্রচণ্ড শক্তি এবং লাফের (Jump) মাধ্যমে যুদ্ধ বা বীরত্ব প্রদর্শন করতে হয়।
পায়ের কাজ (Footwork): যেহেতু মুখ মুখোশ দিয়ে ঢাকা থাকে, তাই শিল্পীরা মুখের অভিব্যক্তি দেখাতে পারেন না। এর বদলে তাদের পায়ের সূক্ষ্ম কাজ এবং শরীরের কম্পনের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করতে হয়। একে গবেষকরা 'কাইনেটিক সাজেশন' (Kinetic Suggestion) বলেন।
গণেশ বন্দনা: প্রতিটি পালার শুরু হয় গণেশের বন্দনা দিয়ে। গণেশের মূর্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে অনেক সময় নর্তক একটি কৃত্রিম পেট (Pot-belly) ব্যবহার করেন।
হাতে রুমাল ও মুদ্রা: ভারতনাট্যম বা কত্থকের মতো এতে 'হস্ত মুদ্রা' নেই। তার বদলে শিল্পীরা অনেক সময় হাতে রুমাল ধরে শরীরী ভাষাকে আরও জোরালো করেন।
সরাইকেল্লা ও ময়ূরভঞ্জ ছৌ-এর সঙ্গে পার্থক্য
অনেকেই সব ছৌ নাচকে এক মনে করেন, কিন্তু গবেষণায় এর তিনটি স্পষ্ট ধারা পাওয়া যায়: | বৈশিষ্ট্য | পুরুলিয়া ছৌ | সরাইকেল্লা ছৌ | ময়ূরভঞ্জ ছৌ | | :--- | :--- | :--- | :--- | | মুখোশ | অত্যন্ত ভারী ও বাস্তবসম্মত | প্রতীকী ও স্বপ্নিল | কোনো মুখোশ ব্যবহৃত হয় না | | চরিত্র | বীর-রসাত্মক ও নাটকীয় | গীতিধর্মী ও একক নাচ | যুদ্ধ-কৌশল ভিত্তিক | | মূল শক্তি | সাধারণ মানুষের দলীয় নাচ | রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা | সামরিক প্রশিক্ষণের বিবর্তন |
![]() |
| রাতের আসরে ঢোলের তালে পুরুলিয়ার ছৌ-নাচ। |
বাদ্যযন্ত্র ও সংগীতের মূর্ছনা
ছৌ নাচের প্রাণস্পন্দন হলো এর বাদ্যযন্ত্র। ধামসা, ঢোল এবং শানাই—এই তিনের সংমিশ্রণে এক উন্মাদনাময় পরিবেশ তৈরি হয়।
ধামসা: এটি একটি বিশাল রণ-বাদ্য, যা নাচের গতি বাড়াতে সাহায্য করে।
শানাই: শানাইয়ের সুরের মাধ্যমেই কাহিনীর ট্র্যাজেডি বা আনন্দ প্রকাশ পায়। যদিও এই নাচে কোনো গান গাওয়া হয় না, তবুও বাজনার ছন্দই পুরো গল্পটি দর্শকদের চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলে।
বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
ইউনেস্কো (UNESCO) ছৌ নাচকে 'Intangible Cultural Heritage of Humanity' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমান যুগে পর্যটন এবং ইন্টারনেটের কল্যাণে ছৌ শিল্পীরা দেশ-বিদেশে খ্যাতি পাচ্ছেন। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, পেশাদারিত্বের চাপে অনেক সময় নাচের আদি বা 'পিওর' ফর্মটি বদলে যাচ্ছে। লোকসংস্কৃতির এই অমূল্য সম্পদকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি স্তরে আরও গবেষণা ও শিল্পীদের সঠিক সাম্মানিক দেওয়া জরুরি।
![]() |
| জেলা বিজ্ঞান কেন্দ্র, পুরুলিয়া |
উপসংহার: লাল মাটির টান ও অবিনশ্বর লোকগাথা
![]() |
| পুরুলিয়া ভ্রমণ — পশ্চিমবঙ্গের প্রাকৃতিক ও লোকসংস্কৃতির ভূখণ্ড |
আপনি কি পুরুলিয়ার ছৌ নাচ সরাসরি দেখার পরিকল্পনা করছেন? অথবা এই মুখোশ শিল্পীদের জীবন সম্পর্কে আরও জানতে চান? কমেন্টে আমাদের জানান!
তথ্যসূত্র:
Chhau Dance of Purulia – Dr. Asutosh Bhattacharyya (First Ed. 1960/61).
ক্ষেত্রসমীক্ষা ও লোকসংস্কৃতি চর্চা পত্রিকা।









