দেবলগড় আনুলিয়া প্রত্নক্ষেত্র: হারানো এক রাজধানীর সন্ধানে
কখনও ভেবেছেন, আপনার গ্রামের পাশের জঙ্গলের মাটি কাটলেই বেরিয়ে আসতে পারে হাজার বছরের ইতিহাস? ভূ-প্রত্নবিদ্যার সাক্ষ্যে দেবলগড়-আনুলিয়া আজ সেই অকল্পনীয় সম্ভাবনারই জ্বলন্ত প্রমাণ। শীতের দুপুরে পলাশ ফুলের দিকে নজর দিয়ে শুরু হওয়া এই অভিযান আজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে। পরেশ চন্দ্র দাশগুপ্ত থেকে এশিয়াটিক সোসাইটি—সবাই চিনেছে নদিয়ার এই প্রত্নক্ষেত্রের গুরুত্ব।
📖 যেকোনো অংশে যেতে ক্লিক করুন
শুরুটা যেভাবে: শীতের দুপুর থেকে এক বিস্ময়ের অভিযান
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। শীতের দুপুরে হিজল-জারুল আর পলাশের জঙ্গলের টানে চলে গিয়েছিলাম গাংনাপুর থানার দেবগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েত-এ। নদিয়া জেলার এই অংশে পৌঁছে প্রথমে যা চোখে পড়ল, তা হল উঁচু-নিচু ভূমি আর বিশাল বিশাল মাটির স্তূপ। দেখে মনে হচ্ছিল, এ যেন প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়াল। কিন্তু গ্রীষ্ম শেষ করে যখন বর্ষা এল, তখন সেই ধারণা পাল্টাতে বাধ্য হলাম।
বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাওয়া মাটি থেকে বেরিয়ে পড়েছে রাশি রাশি জিনিস! মাটির পাত্রের টুকরো, পোড়ামাটির মূর্তির অংশ, অচেনা নকশা করা নিদর্শন—সব পড়ে থাকছে অবহেলায়, মানুষের পায়ের তলায় গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। আরও ভয়ংকর দৃশ্য—ট্রাক্টর আর JCB মেশিন দিয়ে বিশালকায় স্থাপত্য নির্মাণকে টুকরো করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নতুন ইট বানানোর জন্য। কে জানে, সেই একটি ইট হয়তো বহন করে নিয়ে যাচ্ছে হাজার বছরের ইতিহাস!
সেখানেই ঠিক করলাম, যা করার এখনই করতে হবে। শুরু হল সেই অঞ্চল চষে বেড়ানো। পার্শ্ববর্তী রানাঘাট থানার চূর্ণী নদীর ধারের আনুলিয়া গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে গাংনাপুরের দেবগ্রাম পঞ্চায়েত—পুরো এলাকা জুড়ে আমার অভিযান।
গ্রামের মানুষই হয়ে উঠলেন ইতিহাসের প্রথম রক্ষক
প্রথম দিকে গ্রামের মানুষজন তাচ্ছিল্যের চোখে দেখত। "এই পুরোনো ইঁট-পাতলা দিয়ে কী হবে?" কিন্তু তাদের বোঝাতে থাকলাম, এই ভাঙা জিনিসগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে কত বড় ইতিহাস। ধীরে ধীরে তাদের সেই উদাসীনতা কেটে গেল। তারাও হয়ে উঠলেন কৌতূহলী। সন্ধ্যের চা-মুড়ি থেকে শুরু করে দুপুরের পেট পুজোর আমন্ত্রণ—সব মিলিয়ে গড়ে উঠল এক আত্মার সম্পর্ক। আঞ্চলিক উপভাষায় তারা বলতে লাগল, "এই তো আমাদের গাঁয়ের মাটি, এত কাল ধরে কী লুকিয়ে ছিল!"
এই সম্পর্ক থেকেই এল বড় পরিবর্তন। ধীরে ধীরে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের মানুষদের সংগঠিত করলাম। গড়ে উঠল 'দেবগ্রাম দেবলরাজা পুরাতত্ত্ব ও লোকসংস্কৃতি সংঘ'। আজ এটি একটি নিবন্ধীকৃত সংস্থা। গ্রামবাসীরা কেউ দিয়েছেন নিজের বাড়ির একটি ঘর, কেউ দিয়েছেন আলমারি। সেই ছোট পরিসরেই তৈরি হয়ে গেল এক আঞ্চলিক পুরাতত্ত্ব সংগ্রহশালা। সাধারণ মানুষের হাতে গড়া এই জাদুঘর আমাদের কাছে আজ সবচেয়ে বড় গর্বের—এ যেন এক লোকসংস্কৃতির জীবন্ত প্রতীক।
প্রথম স্বীকৃতি: পরেশ চন্দ্র দাশগুপ্ত থেকে এশিয়াটিক সোসাইটি
১৯৭০-৭২ সালে এখানে এসেছিলেন প্রখ্যাত প্রত্নবিদ পরেশ চন্দ্র দাশগুপ্ত। সমগ্র বঙ্গের অন্যতম প্রধান সম্ভাবনাময় এই স্থানে উৎখনন প্রয়োজন বলে মনে করেছিলেন তিনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কেটে গেছে দশকের পর দশক। নষ্ট হয়েছে হাজার হাজার অমূল্য প্রত্ননিদর্শন। এরই প্রতিরোধে আমাদের সংগ্রহশালার ভাবনা।
সকলের সমবেত প্রচেষ্টায় আজ দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভাঙার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষ যেমন উদ্যোগী হয়েছেন, উৎসাহী হয়েছেন প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানসমূহ। পরিদর্শনে এসেছেন এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিনিধিরা, রাজ্য পুরাতত্ত্ব দপ্তরের আধিকারিকরা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগ এবং কেন্দ্রীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষেরা। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে প্রত্নক্ষেত্রের স্বীকৃতি দিয়ে একে বাংলার প্রত্ন পর্যটন মানচিত্রে এক নবদিগন্ত রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। জুলাই ২০১৮-এর Monthly Bulletin-এ লেখা হল— "Debagram- A new destination in the Archaeo-tourist Map of West Bengal."
বিশেষজ্ঞদের চোখে দেবলগড়: সভ্যতার স্তরায়ণ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উৎখনন ছাড়া কোনো অঞ্চলের পুরাতাত্ত্বিক যুগবিভাজন ও সভ্যতার বিবর্তন চিত্র উদঘাটন সম্ভব নয়। দেবলগড়-আনুলিয়া জুড়ে এখন তারই অপেক্ষা। বিভিন্ন সময়ে আগত বিশেষজ্ঞরা উদ্ধারকৃত প্রত্নদ্রব্য ও সংগ্রহশালা দেখে এই অঞ্চলের সভ্যতার স্তরায়ণ সম্পর্কে তাদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের মতানুসারে—
- 🗿 দ্বিতীয়-তৃতীয় খ্রিস্টাব্দ: সমগ্র অঞ্চলটিতে সভ্যতার বিকাশের সূত্রপাত ঘটে। এই সময় থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ ঘটে।
- 🪙 গুপ্তযুগ: ব্যবসা-বাণিজ্যের চরম উন্নতি ঘটে। এই ক্ষেত্র থেকে একাধিক দিনারের (স্বর্ণমুদ্রা) উদ্ধার সেই সাক্ষ্যই দেয়।
- 🛕 পাল-সেন রাজত্ব: এই অঞ্চল পৌঁছয় বিকাশের সর্বোচ্চ স্তরে।
- ☪️ সুলতানি যুগ: এই অঞ্চল ছিল উন্নত সভ্যতা কেন্দ্র।
- 🍂 পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতক: এই সময় থেকেই এই অঞ্চল বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে থাকে।
মাটির নিচে চাপা এক ইতিহাসের ভাণ্ডার: কী কী পাওয়া গেছে?
দেবলগড়ের ভিতর ও বাইরে এবং আনুলিয়ায় গঙ্গার পরিত্যক্ত খাতসহ বর্তমানের চূর্ণী নদীর পাড় ধরে চালানো ক্ষেত্র সমীক্ষায় পাওয়া গেছে বিপুল পরিমাণ প্রত্নসামগ্রী।
🏺 মৃৎপাত্রের বিপুল সম্ভার
বহু সংখ্যক মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে, যেগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটিকে বিশেষজ্ঞরা Early historic রূপে শনাক্ত করেছেন। পাত্রগুলির মধ্যে কয়েকটি উজ্জ্বল কৃষ্ণবর্ণের। সমগ্র অঞ্চল জুড়ে নানান নকশাযুক্ত কয়েক হাজার Potsherds পাওয়া গিয়েছে, যা গুপ্তযুগ থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় সভ্যতা পর্যন্ত সময়কালকে প্রতিফলিত করে। এদের মধ্যে গুপ্তযুগের সমসাময়িক Potsherds গুলি অলংকরণে ও উজ্জ্বল গাত্রবর্ণে আজও তুলনাহীন।
☸️ ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের সাক্ষী
আনুলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ও দেবলগড়ে (বিশেষত নলপুকুর ও কেন্দ্রীয় জলাশয় বা দেবলার চারপাশে) পাওয়া গিয়েছে বহু সংখ্যক প্রত্নদ্রব্য যেগুলি অধিকাংশই ধর্ম সম্বন্ধীয়। যেমন:
- উজ্জ্বল ও মসৃণ গাত্রযুক্ত কালো রঙের বৌদ্ধস্তূপের ক্ষুদ্র প্রতিলিপি
- সরু মুখযুক্ত পবিত্র পাত্র (Channel Spouted Sprinkler)
- অষ্টদলপদ্ম চিহ্নযুক্ত একটি প্রাতিষ্ঠানিক সিল—যা এই অঞ্চলে উন্নত বাণিজ্যকেন্দ্রযুক্ত কোনো বৌদ্ধবিহারের অবস্থানকে সূচিত করে।
- পালযুগের উন্নত শিল্পকলার বৈশিষ্ট্যযুক্ত কারুকার্যময় নারী দেহের অলঙ্করণযুক্ত ফুলদানি
- পৃথক প্রকোষ্ঠযুক্ত মীনপুচ্ছ জল-প্রদীপ এবং আনুলিয়া-দেবলগড়ের সব জায়গা থেকেই মীনপুচ্ছ অলঙ্করণের বিভিন্ন আকৃতির মৃৎপাত্র।
🌸 টেরাকোটা শিল্পের জগৎ
উদ্ধারকৃত টেরাকোটা মূর্তিগুলির মধ্যে রয়েছে দণ্ডায়মান বুদ্ধ, শিশুকোলে মা, একক কৃষ্ণ এবং প্রচুর চিরন্তনী মূর্তি। একটি ভগ্ন মৃতফলকে দেখা যায় কোনো বৃহৎ ব্যক্তির সামনে কোনো মানুষ (পশু?) নিবেদিত হচ্ছে। পাওয়া গিয়েছে প্রচুর পরিমাণে টেরাকোটা বিডস (পুঁতি), যেগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি গুপ্তযুগ ও পূর্ববর্তী সময়ের। এছাড়াও মাটির তৈরি লকেট, কানের দুল, নানা আয়তন ও নকশাযুক্ত Sling Ball, হাতির দাঁতের তৈরি লকেট প্রভৃতি। এগুলি সেই সময়ের আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন প্রণালী ও সমৃদ্ধ সমাজের চিত্র আমাদের সামনে উপস্থাপিত করে।
⚱️ ধাতব প্রত্নাবশেষের প্রাচুর্য
প্রত্নক্ষেত্রের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলির মধ্যে একটি হল ধাতব প্রত্নাবশেষের প্রাচুর্য। দেবলপুকুরের পাশের একটি কৃষিজমি সম্প্রসারণের সময় একটি স্থান থেকে এসব উদ্ধার হয়েছিল, যা বহুল পরিমাণে গলন বিদ্যার বিকাশকে সূচিত করে। ধাতব প্রত্নদ্রব্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- ক্ষুদ্র ধাতব বুদ্ধমূর্তি: গুপ্ত পরবর্তী সময়ের এই মূর্তির সর্প শিরোভূষণ ও চন্দ্রায়ন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যযুক্ত। বিশেষজ্ঞরা এটিকে মুচলিন্দ বুদ্ধমূর্তি রূপে সনাক্ত করেছেন।
- ধাতুর প্রদীপ, থালা, গোলাকার প্রসাধন দ্রব্য (আয়নার পশ্চাদপট?), কানের দুল, নেকলেস এবং পূর্ব উল্লেখিত লোহার তরবারির অবশেষ, যা নিতান্তই বিরল ও স্মরণযোগ্য।
🗿 পাল-সেন যুগের দেবদেবীর মূর্তি
দেবলগড়-আনুলিয়া প্রত্নক্ষেত্র থেকে বহুল পরিমাণে পাওয়া গিয়েছে বৃহৎ ও কারুকার্যময় দেবদেবী মূর্তি। এগুলির মধ্যে নির্মাণকাল ও শিল্পসুষমার দিক থেকে উল্লেখযোগ্য একটি ভ্রুকুটি তারা মূর্তি। কালো পাথরের, ত্রিমস্তক যুক্তা, চতুর্ভুজা, সচূড় পৃষ্ঠপটযুক্ত পদ্মাসনে দেবী ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় রয়েছেন। হাতে রয়েছে বজ্র ও নরমুণ্ড শোভিত অস্ত্র খট্টাঙ্গ। মহাযান ও তন্ত্রসাধনার এই অপূর্ব শিল্পসুষমা মন্ডিত মূর্তির নিদর্শন সমগ্র বঙ্গেই দুর্লভ।
আনুলিয়ায় রয়েছে পাল-সেনযুগীয় চতুর্ভুজ বিষ্ণুমূর্তি। গাংনাপুর থানায় রক্ষিত একটি ভগ্ন বিষ্ণুমূর্তি। ব্যাসল্ট শিলা গঠিত এই মূর্তিটির ভগ্নদশা ও বলপ্রয়োগের চিহ্ন আমাদের বহিরাক্রমণের কথা মনে করিয়ে দেয়। ২০১৭ সালে দেবলপুকুর সংস্কারের সময় উদ্ধারকৃত অন্য একটি বিষ্ণুমূর্তি এখন পাশের আইশমালী গ্রামে পূজিত হচ্ছে। অপর একটি মূর্তি পার্শ্ববর্তী বাজিতপুর গ্রামে শিবরূপে পূজিত।
ভূ-প্রত্নবিদ্যার আলোকে দেবলগড়: প্রাচীন নদীপথ ও নগর পরিকল্পনা
দেবলগড় অঞ্চলের বাইরে প্রাচীন মরালী নদীর পরিত্যক্ত খাত (যা আজও হাঙর খাল বা নাস্তার বিল নামে পরিচিত) তার ধারে মিলেছে বিরাট বিরাট মাটির ঢিবি। প্রধানত 'নলপুকুর' ও 'সাগরদীঘি' নামক জলাশয় দুটিকে ঘিরে যে ঢিবিগুলি বৃত্তাকারে রয়েছে তাদের উচ্চতা প্রায় ১০-১২ ফুট। প্রায় ২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই ঢিবিগুলি অরণ্যের মধ্যে থাকায় তেমনভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়নি। এই অঞ্চলটির সমগ্র স্থান জুড়েই পাঁচিল দেখা যায়। এই Structural mound complex টির উৎখনন হলে এই অঞ্চল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে বহু প্রাচীন কোনো স্থাপত্য অংশ, হয়তো কোনো বিশালাকার বৌদ্ধবিহার। এই অঞ্চল থেকে ধর্ম সম্বন্ধীয় বহু তৈজসপত্র ও আনুষাঙ্গিক উপাদান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীলের উদ্ধার এই প্রকার সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করে।
এই complex টি ঘিরে তিনদিকে রয়েছে বিপুল প্রস্থের (২০-৩০ ফুট) Rampart Wall (অপরদিকে নদীই প্রাকৃতিক প্রাচীর)। যদিও এই প্রাচীরের বেধ গড়ের চারপাশে পরিখার ধারে সংযুক্তকারী যে Rampart Wall চলেছে, তা দেখে বোঝা যায় এর ওপর দিয়ে ৮-১০টি ঘোড়সওয়ার প্রহরী পাশাপাশি থেকে সমগ্র গড়ের নজরদারি চালাতে সক্ষম ছিলেন। পরিখার পাশ দিয়ে ওয়াচ টাওয়ারগুলিকে গড়ে ওঠা প্রাচীরের থেকে কম দেখা যায়।
প্রাচীন মৌজা মানচিত্রে একটি রাস্তা দেবপাল রোড নামেই চিহ্নিত। এই প্রকার নগর পরিকল্পনা বাণগড় ও চন্দ্রকেতু গড়ের সাথে মেলে। তারই সঙ্গে বিপুল উদ্যোগে গঠিত সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও একটি সম্ভাবনার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করায়। সেন রাজকবি ধোয়ীর 'পবনদূত' অনুসারে সেন রাজধানী বিজয়পুর ছিল ত্রিবেণীর নিকটবর্তী। ভৌগোলিকভাবে দেবলগড়ের অবস্থান এর সাথে সাযুজ্যপূর্ণ। বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উৎখননের মাধ্যমেই বহুবিধ সম্ভাবনার মধ্য থেকে প্রকৃত সত্যকে তুলে আনা সম্ভব। অপেক্ষা এখন তারই।
🛰️ ভূ-প্রত্নবিদ্যার প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ
ভূ-প্রত্নবিদ্যা (Geoarcheology) বিষয়টির চর্চা বাংলা তথা ভারতে এখনো সীমাবদ্ধ হলেও সমগ্র অঞ্চলের বিশ্লেষণ ও ক্ষেত্রসমীক্ষায় এর প্রয়োগ বহুবিধ উপযোগিতা প্রদান করেছে। প্রাচীন জনপদগুলির অবস্থান বিশ্লেষণে প্রাচীন নদীখাতগুলির অনুসন্ধান করা হয়েছে। আধুনিক উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণের পাশাপাশি আর্দ্রতা বিশ্লেষণ, মৃত্তিকা গঠনের বিশ্লেষণ, ভূমির সামগ্রিক ঢালের বিবর্তনকে সামগ্রিকভাবে অধ্যয়ন করার ফলে ১২০০-১৫০০ বছর আগে বয়ে চলা গঙ্গা ও তার শাখা-প্রশাখা সহ নদী ব্যবস্থাকে মানচিত্রে প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে।
গঙ্গার প্রাচীন, অধুনা পরিত্যক্ত খাতের পাশে উঁচু ঢিবিগুলির মাটির নীচে চাপা পড়ে থাকা উপাদানগুলি আবিষ্কারের মাধ্যমে মধ্যযুগের প্রারম্ভে গড়ে ওঠা এক সভ্যতাকেন্দ্রের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে। প্রাচীন জলজ শামুক প্রভৃতির উপস্থিতির সাক্ষ্য, পলিস্তরগুলির গভীরতা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাচীন নদীখাতগুলির প্রবাহপথ ও সঞ্চরণ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। একই সাথে বর্তমানে প্রবহমান চূর্ণীর ক্ষয়জাত পাহাড়গুলির নিবিড় ক্ষেত্রানুসন্ধান এবং দেবলগড়ের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রাচীন মরালী নদীর পাড় ধরে চলা ক্ষেত্রসমীক্ষার মাধ্যমে বিস্তৃত এই সভ্যতার নানান অজানা বৈশিষ্ট্যকে অনুধাবন করার চেষ্টা করা হয়েছে।
উপসংহার: অপেক্ষা শুধু বৈজ্ঞানিক খননের
এতক্ষণ ধরে, সহৃদয় পাঠকেরা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে পাঠ করলেন প্রত্নক্ষেত্রের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এই সমস্ত বিপুল প্রত্নসাক্ষ্য, যেগুলি বিভিন্ন সময়ে সমগ্র দেবলগড়-আনুলিয়া প্রত্নক্ষেত্র থেকে পাওয়া গেছে, খুব স্পষ্টভাবে আমাদের জানান দেয় বিপুল সম্ভাবনাময় এক প্রত্নস্থলের কথা। নানান প্রমাণে আমরা বুঝতে পারি, কত বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে, কত শতাব্দী ধরে এ সভ্যতা ক্রমশ বিবর্তিত হয়েছে।
যে প্রত্নস্থল থেকে উদ্ধার হয় প্রাক-ইতিহাস যুগের মৃৎপাত্র সম্ভার, যে প্রত্নস্থলের একাধিক স্থানে জলপথের গা বেয়ে আবিষ্কার হয় পানপাত্র বা অ্যাম্ফোরা, যে প্রত্নস্থল থেকে আবিষ্কৃত হয় বিশেষ চিহ্ন উৎকীর্ণ সীল, যে প্রত্নস্থল থেকে আবিষ্কৃত হয় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের স্বর্ণমুদ্রা (Some Historical Aspects of the Inscription of Bengal, P-222), যেখান থেকে উদ্ধার হয় বুদ্ধ-তারা-বিষ্ণুর একাধিক ধাতব ও প্রস্তর ভাস্কর্য—সে প্রত্নস্থল যে অবশ্যই বৈজ্ঞানিক উৎখনন ও সত্য অনুসন্ধানের দাবি রাখে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
এই অঞ্চলের সভ্যতার উৎপত্তি ও বিকাশকে যদি 'গঙ্গারিডি' সভ্যতার সমসাময়িক বলে ধরে নিই, চন্দ্রকেতুগড়কে ধরে নিই ঐ সভ্যতার রাজধানী বা বন্দর শহর রূপে, তবে বুঝতে পারব একই সময়ে সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল প্রাচীন নদীপথ ধরে, এই দেবলগড়-আনুলিয়া অঞ্চল জুড়ে। দেবলগড়-আনুলিয়ার সমগ্র প্রত্নক্ষেত্র জুড়ে, ভূ-পুরাতত্ত্বের আলোকে এই অনাবিষ্কৃত সত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়।
সভ্যতার সেই ঊষালগ্নে সভ্যতার বিস্তার ঘটেছে। গঙ্গার প্রাচীন প্রবাহপথ, ইচ্ছামতি-মরালীকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছিল নৌ-বাণিজ্য, বিস্তার ঘটেছিল ব্যবসা বাণিজ্যের। তাই এত পানপাত্রের অবস্থান, তাই কুষাণযুগীয় মৃৎপাত্র সম্ভারের অবস্থান, গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রার অবস্থান। গুপ্তযুগ ও পরবর্তীকালে যে এই অঞ্চলে সভ্যতা ক্রমোন্নত হয়ে উঠেছিল তার প্রমাণ উন্নত মৃৎপাত্র সম্ভার, একাধিক গড়েয়া প্রভৃতি। পরবর্তীকালের পাল-সেন যুগের নানা প্রত্ন প্রমাণ পেরিয়ে আমরা হাজির হই শেষ পর্যন্ত মধ্যযুগীয় সভ্যতার স্তরে। এই বিপুল সময় ধরে একই অঞ্চলে সভ্যতার বিবর্তন ও স্তরচিহ্ন সমূহের উদ্ধার বঙ্গের ইতিহাসে একান্তই উল্লেখযোগ্য।
উদ্ধার হওয়া অজস্র প্রত্ননিদর্শন আজ প্রদর্শিত হচ্ছে গাংনাপুরের 'দেবগ্রাম দেবলরাজা পুরাতত্ত্ব ও লোকসংস্কৃতি সংঘ'-এর প্রদর্শনশালায়। এগুলি আমাদের বিস্ময়ে হতবাক করে। বিস্তীর্ণ এই সময়ে কী ভূমিকা ছিল এই স্থলের? গ্রন্থের পরবর্তী অংশে আমরা খোঁজ করেছি এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তরের। প্রত্ন নিদর্শনগুলির সাক্ষ্যকে মেনে নেওয়ার সাথে সাথে অন্যান্য লিখিত প্রমাণের সাহায্যে আমরা চেষ্টা করেছি এক বৈজ্ঞানিক সত্যে প্রতিষ্ঠিত হতে। আসুন আমরা পরের পর্বে হাজির হই সত্য প্রতিষ্ঠার সেই সংঘাতময় পথে। শেষ পর্যন্ত ভূ-প্রত্নবিদ্যার সাক্ষ্যে দেবলগড়-আনুলিয়া আমাদের জানান দেয়, বাংলার মাটিতে আরও কত অজানা ইতিহাস লুকিয়ে!
দেবলগড়-আনুলিয়া প্রত্নক্ষেত্র
হারানো এক রাজধানীর সন্ধানে
লেখক: ড. বিশ্বজিৎ রায়। প্রকাশিত সেপ্টেম্বর, ২০২১ -এ। (বইটি সংগ্রহ করতে: নিচে ক্লিক করুন ✅)
🔎 সম্পর্কিত উচ্চ-সন্ধান কীওয়ার্ড
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. দেবলগড়-আনুলিয়া কোথায় অবস্থিত?
এটি নদিয়া জেলার গাংনাপুর থানার দেবগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েত এবং রানাঘাট থানার আনুলিয়া গ্রাম পঞ্চায়েত জুড়ে বিস্তৃত।
২. এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী আবিষ্কার হয়েছে?
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের স্বর্ণমুদ্রা, মুচলিন্দ বুদ্ধমূর্তি, ভ্রুকুটি তারা মূর্তি, অষ্টদলপদ্ম চিহ্নযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক সীল, এবং বিশাল প্রতিরক্ষা প্রাচীরসহ একটি নগর পরিকল্পনার ধ্বংসাবশেষ। এছাড়া হাজার হাজার মৃৎপাত্রের টুকরো ও টেরাকোটা ভাস্কর্য।
৩. এই অঞ্চলের সভ্যতা কত পুরনো?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয়-তৃতীয় খ্রিস্টাব্দে সভ্যতার সূত্রপাত, গুপ্তযুগে বাণিজ্যের চরম উন্নতি, পাল-সেন যুগে সর্বোচ্চ বিকাশ এবং পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে বিলুপ্তি ঘটে।
৪. এখানে কি কোনো জাদুঘর আছে?
হ্যাঁ, স্থানীয় উদ্যোগে গড়ে উঠেছে 'দেবগ্রাম দেবলরাজা পুরাতত্ত্ব ও লোকসংস্কৃতি সংঘ'-এর আঞ্চলিক পুরাতত্ত্ব সংগ্রহশালা। গ্রামবাসীদের দান করা জিনিস ও উদ্ধারকৃত নিদর্শন এখানে সংরক্ষিত।
৫. ভূ-প্রত্নবিদ্যা কীভাবে এখানে প্রয়োগ করা হয়েছে?
উপগ্রহচিত্র, মৃত্তিকা বিশ্লেষণ ও প্রাচীন জলজ শামুকের সাক্ষ্য ব্যবহার করে ১২০০-১৫০০ বছর আগের গঙ্গা ও মরালী নদীর গতিপথ চিহ্নিত করা হয়েছে, যা সভ্যতার বিস্তার বুঝতে সাহায্য করেছে।
🤔 আপনার কী মত?
এই প্রত্নক্ষেত্র কি সেন রাজধানী বিজয়পুরের সন্ধান দিতে পারে? নাকি এর চেয়েও প্রাচীন কিছু লুকিয়ে আছে? মন্তব্যে জানান।
পরের পর্বে আসছে 'সত্য প্রতিষ্ঠার সংঘাতময় পথ' — লিখিত প্রমাণ বনাম প্রত্নসাক্ষ্য।
📚 আরও পড়ুন (শীঘ্রই):
- → চন্দ্রকেতুগড় ও গঙ্গারিডি সভ্যতা: এক তুলনামূলক পর্যালোচনা
- → Debal Raja Archeological Museum
- → দেবলগড়: বাংলার বুকে হারিয়ে যাওয়া এক প্রাচীন নগরীর সন্ধানে
Suggested Labels: ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভূ-প্রত্নবিদ্যা, বাংলার সভ্যতা
📚 সূত্র
- ড.রায়, দেবলগড় আনুলিয়া প্রত্নক্ষেত্র(হারানো এক রাজধানীর সন্ধানে)
🔍 এই নিবন্ধটি ভূ-প্রত্নবিদ্যার সাম্প্রতিক তথ্য ও এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নাল (২০১৮)-এর ভিত্তিতে হালনাগাদ করা হয়েছে। ডিজিটাল আর্কাইভের মাধ্যমে প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রচেষ্টা অব্যাহত। প্রকাশিত Lalpecha Heritage Network-এ।
