বাহান্ন পাগল: নশিরকুলি ও বাগাদাঙ্গার নীল পুজো – একটি ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক উৎসব

RAJU BISWAS
0
চৈত্র মাসে নীল পূজা বাহান্ন পাগল উৎসবের দৃশ্য
চৈত্র মাসে নীল পূজা "বাহান্ন পাগল": লুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক দিকসমূহ।

লালপেঁচা 🟥 ইন ডেস্ক | বাংলার লোকসংস্কৃতিতে শিব বা নীল পূজার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হলো "বাহান্ন পাগল" উৎসব। এটি নদীয়া জেলার নাশেরকুলি ও বাঘাডাঙ্গা গ্রামের ‘জেলে-দাস’ সম্প্রদায়ের মধ্যে পালিত একটি প্রাচীন লোকাচার। চৈত্র মাসের মধ্যভাগ থেকে শুরু হয়ে নীল ষষ্ঠীর দিন পর্যন্ত নানা আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় কর্মসূচির মাধ্যমে এই উৎসব সম্পন্ন হয়।

বিষয় বিবরণ
উৎসবের নাম বাহান্ন পাগল (নীল পূজা)
প্রধান স্থান নাশেরকুলি ও বাঘাডাঙ্গা (নদীয়া)
পালনকারী সম্প্রদায় জেলে-দাস সম্প্রদায়
উৎসবের সময় চৈত্র মাসের মাঝামাঝি থেকে নীল ষষ্ঠী
বিশেষ আকর্ষণ শিব-দুর্গা সাজ ও মুখোশ নৃত্য

📜 বাহান্ন পাগল উৎসবের ইতিহাস

‘বাহান্ন পাগল’ উৎসবের উৎপত্তি পূর্ববঙ্গের নোয়াখালীর জিরতলী গ্রামে। সেখানে দাস-জেলে সম্প্রদায়ভুক্ত অর্ধশতটি পরিবারের মধ্যে পালিত হলেও, ভারত-বিভাগের পর সম্প্রদায়টি ছিন্নমূল হয়ে নদিয়া, বর্ধমান, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দুস্তান-পাকিস্তান ভাগের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার নাশেরকুলি ও বাঘাডাঙ্গা গ্রামে এই অনুষ্ঠানটি পুনরায় সংগঠিত হয়ে পালিত হচ্ছে। আজ পুরো গ্রাম জাতপাত উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভুলে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে, এই আনন্দে সকলে সামিল হয়।

নদীয়ার লোক সংস্কৃতি ও প্রধান আচার-অনুষ্ঠান

সন্ন্যাসীদের শিব দুর্গা গঙ্গা রূপে সজ্জা
শিব, দুর্গা ও গঙ্গার রূপে সজ্জিত পুরুষ সন্ন্যাসীরা।
  • 🧩 সন্ন্যাস গ্রহণ:
    চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে চুল, দাড়ি ও নখ ছেঁটে, নদী বা পুকুরে স্নান করে আত্মশুদ্ধি সাধন করা হয়। শনিবার অথবা মঙ্গলবার বার 'বান', 'বড়শি', ও 'ত্রিশূল' পুজোর মাধ্যমে শুরু হয় সন্ন্যাস গ্রহণের পর্ব। সন্ন্যাসীরা দিনে ফলমূল এবং সূর্যাস্তের পর নিরামিষ আহার করেন ও কঠোর নিয়ম মেনে চলেন।
  • 🧩 নীল ষষ্ঠী পূজা:
    প্রধান পূজার দিন শিব, দুর্গা ও গঙ্গার রূপে পুরুষ সন্ন্যাসীরা সাজেন এবং ঢাক, কাঁসর ও অন্যান্য বাদক যন্ত্রের ছন্দে বিশেষ নৃত্যানুষ্ঠানে সামিল হন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সন্ন্যাসীরা গ্রামে প্রত্যেকটি বাড়িতে মুষ্টিভিক্ষা বা টাকা-পয়সা সংগ্রহ করেন এবং শিব, দুর্গা, পার্বতীর সঙ্গে 'বাহান্ন পাগল' অর্থাৎ সমাজের প্রতিচ্ছবিতে সেজে পুরো গ্রাম পরিভ্রমণ করেন।
  • 🧩 দেবত্ব আরোপ:
    শিব, দুর্গা ও গঙ্গার রূপে যে মানুষদের পূজা করা হয়, তাঁদের ঈশ্বররূপে গণ্য করা হয়। শিবরূপী ব্যক্তির চরণ স্পর্শ করে ছোট-বড় সকলেই আশীর্বাদ গ্রহণ করেন। গৃহস্থের বাড়িতে গেলে তাঁদের পূজিত করা হয়, এবং এই পূজার পৌরোহিত্য করেন ‘বালা সন্ন্যাসী’। প্রসাদ হিসেবে দুধ ও কলা প্রদান করা হয়। যাঁরা এই রূপে পূজিত হন, তাঁদের মূলত দাস-জেলে সম্প্রদায়ভুক্ত হতে হয় এবং বৈষ্ণব মতাদর্শ অনুযায়ী গুরু-মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়া আবশ্যক।
বাহান্ন পাগল উৎসবের সামাজিক চরিত্রের সাজগোজ
সামাজিক চরিত্রের সাজগোজ ও সন্ন্যাসীদের মিথস্ক্রিয়া।

🧩 অন্যদিকে, বাহান্ন পাগলের সজনীরা যেকোনো জাতিগোষ্ঠীর হতে পারেন। নিরামিষ আহার গ্রহণ করে তাঁরাও এই আচার-অনুষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন। তবে বাহান্ন পাগলের মূল অংশগ্রহণকারীরা সকলেই পুরুষ। নারীদের ‘বাহান্ন পাগল সজনী’ রূপে এই আচার-অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশগ্রহণের অনুমতি নেই, তবে তাঁরা পূজার কাজে সাহায্য করতে পারেন।

  • 🧩 বাহান্ন পাগল নৃত্য:
    গ্রামে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এই নৃত্যে অংশ নেন, যেখানে নানা সামাজিক চরিত্রের সাজগোজ থাকে, যেমন ডাক্তার, পুলিশ, মুচি, চোর, মাতাল ইত্যাদি। সূর্যাস্তের পর শুরু হয় মূল পূজা। কারো মানস বা মনের ইচ্ছা পূর্ণ হলে, তার বাড়িতে রাতের 'নীল পূজা' অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রসাদ ভোজন হয়।
  • 🧩 হাজরা পূজা ও ভোজ:
    নীল পূজাও প্রসাদ গ্রহণের পর, মধ্যরাতে ফাঁকা মাঠে শুরু হয় শিব ও কালির মুখোশ নৃত্য। সেখানেই অনুষ্ঠিত হয় হাজরা পূজা। এরপর হয় ভোজের আয়োজন। সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরকে নিবেদন করা হয় আট রকমের ভাজা এবং শোল মাছ পোড়া। সকাল হওয়ার আগে সন্ন্যাসীরা মাঠ থেকে বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নেন।
বাঘাডাঙ্গা গ্রামের বাহান্ন পাগল মেলা
বাহান্ন পাগল মেলা ও উৎসবের প্রাঙ্গণ।

🧩 পয়লা বৈশাখের মিলন মেলা:
নববর্ষের সন্ধ্যায় বাঘাডাঙ্গার কালী মন্দির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় 'পয়লা বৈশাখী মিলন মেলা'। এই মেলায় ‘বাহান্ন পাগল’ উৎসবের শিল্পীদের পারিশ্রমিক হিসেবে ‘দক্ষিণা’ প্রদান করা হয়। এই দক্ষিণার অর্থ তাঁরা মেলার বিভিন্ন দোকানে কেনাকাটায় ব্যয় করেন। বিশেষত পাঁপড়, আইসক্রিম, নাগরদোলা এবং অন্যান্য বিনোদনের মাধ্যমে তাঁরা মেলার আনন্দ উপভোগ করেন। এই আনন্দঘন অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই ‘বাহান্ন পাগল’ উৎসব তার পূর্ণতা অর্জন করে।

নববর্ষের মিলন মেলায় সন্ন্যাসীরা
নববর্ষের মিলন মেলায় সন্ন্যাসীদের আনন্দঘন উপস্থিতি ও দক্ষিণা গ্রহণ।

সামাজিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সংকট

🧩 সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব: এটি শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি একটি সামাজিক নাট্য ও লোকনাট্যের রূপ। এতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে এবং এটি শ্রেণিগত বৈষম্য দূর করে ঐক্যের বার্তা দেয়। পুরুষরা দেবতার সাজ ধারণ করেন, আর নারীরা পূজা ও অতিথি আপ্যায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

🧩 সংকট ও ভবিষ্যৎ: বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে উৎসবের প্রতি আগ্রহ কমে আসছে, এবং সাজ-পরিচ্ছদ ও লোকবল সংকট দেখা দিয়েছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সরকারি-সামাজিক সহযোগিতা ছাড়া এই ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে যেতে পারে। তাই সংরক্ষণ খুব জরুরি।

উপসংহার: বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল

"বাহান্ন পাগল" উৎসব কেবল চৈত্র মাসের একটি লৌকিক আচার নয়, এটি নদীয়ার নাশেরকুলি ও বাঘাডাঙ্গা গ্রামের মানুষের হৃদস্পন্দন। পূর্ববঙ্গের নোয়াখালী জেলার জিরতলী থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব আজ এপার বাংলার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ লোকসংস্কৃতির মাইলফলক

🎭 আধ্যাত্মিকতা: শিব-দুর্গার বিগ্রহে দেবত্ব আরোপ এবং সন্ন্যাসীদের কঠোর আত্মশুদ্ধি এই উৎসবের প্রাণ।
🤝 সামাজিক ঐক্য: সমাজের প্রতিটি স্তর—ডাক্তার থেকে মুচি—সবাই এখানে এক ছাদের তলায় উৎসবে মাতেন।
🎨 শৈল্পিক রূপ: মুখোশ নৃত্য এবং পৌরাণিক সাজসজ্জা আমাদের লোকশিল্পের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।

আধুনিক সভ্যতার দ্রুত পরিবর্তনশীল ধারায় যখন অনেক প্রাচীন ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, তখন এই লুপ্তপ্রায় উৎসবকে টিকিয়ে রাখা আমাদের পরম কর্তব্য। সন্ন্যাসীদের সেই আদিম ঢাকের আওয়াজ আর বৈশাখী মিলন মেলার জৌলুস আজও প্রমাণ করে যে, বাঙালির শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।

" বাহান্ন পাগল একটি জীবন্ত মহাকাব্য, যা ধর্ম, সংস্কৃতি, সমাজ ও ইতিহাসকে একই সূত্রে গেঁথেছে। বাঙালির এই অনন্য পরিচয় রক্ষা করতে আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই হবে আগামী দিনের সার্থকতা। "

আপনি কি কখনও নদীয়ার এই ঐতিহাসিক বাহান্ন পাগল মেলায় গিয়েছেন?

আপনার অভিজ্ঞতা কমেন্ট বক্সে আমাদের সাথে শেয়ার করুন! 📢

আমাদের সাথে জুড়ে থাকুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to ensure you get the best experience on our website. Learn More
Ok, Go it!